পেট্রোল বোমা হামলার শিকার মানুষদের ঘুরে দাঁড়ানো

- Author, শাহনাজ পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ঢাকার মিরপুরে বর্ধন বাড়ি এলাকায় বাড়িতে বিছানায় শুয়েছিলেন ইডেন কলেজের ছাত্রী সাথী আক্তার।
এক পায়ে হাঁটুর নিচ থেকে ব্যান্ডেজ বাঁধা। অন্য পায়ে সবে ব্যান্ডেজ খোলা হয়েছে।
চামড়া নেই, চোখে পড়ছে শুধু লাল মাংস।
বলছিলেন, “হটাৎ দেখি পুরো বাস আগুনে লাল হয়ে গেলো। কীভাবে যে বাস থেকে নামলাম জানিনা। রাজনীতির সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। তারপরও আমাদের ওপর কেন এই হামলা বুঝতে পারছি না।”
গত ১৮ জানুয়ারি পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করে বাড়ি ফিরছিলেন সাথী।
সংসদ ভবন এলাকায় হটাৎ বাসে এসে পড়লো পেট্রোল বোমা।
ঝলসে গেছে দু পা। এর পর থেকেই বিছানায়।
ঢাকার আর এক মাথায় হাজারীবাগের অলিগলি পার হয়ে খুঁজে পেলাম পেট্রোল বোমা হামলার আর এক শিকার পৃথ্বীরাজ চক্রবর্তীকে।
২০ জানুয়ারি গাজীপুরে বোনের বাসা থেকে ঢাকা ফিরছিলেন।
আগুনে পুড়ে ডান হাতের আঙুল কুঁকড়ে গেছে।
বলছিলেন, এই হাত তিনি আবার কবে ব্যবহার করতে পারবেন সে নিয়ে তার মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে।
পৃথ্বীরাজকে দ্রুত হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বাড়তি রোগীর চাপ থাকায়।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় পেট্রোল বোমার ব্যবহার ইদানীং প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে।
দগ্ধ হয়ে রোজই রোগী আসছে ঢাকা মেডিকেল অথবা অন্যান্য জেলার বড় হাসপাতাল গুলোতে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাক্টিভ সার্জারি বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল কালাম বলছেন, পেট্রোল বোমা হামলার শিকার মানুষদের যখন হাসপাতাল থেকে ছুটি মেলে, তখন শুরু হয় শারীরিক পুনর্বাসনের আর এক দীর্ঘ সংগ্রাম।
ড. কালাম বলছেন এই ধরনের হামলায় প্রচুর রোগী আসছেন মুখ, হাত ও শ্বাসনালীর পোড়া নিয়ে।
যাদের শারীরিক পুনর্বাসন আরো দীর্ঘ মেয়াদি।
তিনি বলছিলেন, “শ্বাসনালী মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুখ মানুষের সুখ-দু:খের অভিব্যক্তির জন্য দরকার,আর হাত মানুষের কর্মক্ষমতার অন্যতম প্রধান অঙ্গ। অন্যান্য পুড়ে যাওয়ার রোগীদের তুলনায় এই রোগীদের সেরে উঠতে বাড়তি সময় লাগে।”
পেট্রোল বোমা হামলার অনেক রোগীর প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর চামড়া পুন:স্থাপন দরকার পড়ছে।
কারোর নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকেরই দরকার পড়ে লম্বা ফিজিও থেরাপি।
লোমকূপের মতো সূক্ষ্ম এর চিকিৎসা। তাই তা ব্যাপক ব্যয়বহুলও বটে।
ঢাকা মেডিকেলের তথ্যমতে পুড়ে যাওয়া এই রোগীদের বেশিরভাগের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে।
খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রোগীদের পরিবার প্রতি দশ লক্ষ টাকা করে সঞ্চয়পত্র দেয়ার কথা বলা হচ্ছে।
কিন্তু কোন কারণ ছাড়াই ভয়াবহ আক্রমণের শিকার মানুষগুলোর মনের ক্ষত সারিয়ে তোলা, সেটি কতটা হচ্ছে?

বর্ধনবাড়ির সাথী আক্তার বলছিলেন “ঘটনার পর থেকে সবসময় অস্থির লাগে। ঘরে হটাত কোন শব্দ হলেই ভয় লাগে। জীবনে কোনদিন বোধহয় আর বাসে চড়তে পারবো না।”
পৃথ্বীরাজ বলছিলেন, “রাতে ঘুমের মধ্যে লাফিয়ে উঠি। মনে হয় ঐ বুঝি আবার কেউ হামলা করছে।”
মুখ পুড়ে যাওয়া অনেকেই নিজের বিকৃত চেহারা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছেন না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছয় তলায় রিলিজের অপেক্ষায় ছিলেন একই পরিবারের দুজন।
পরিবারের তিনজন মিলে ঢাকার কাজিপাড়ায় অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন ডিসেম্বরের ২৯ তারিখ হরতালের আগের সয়।
কেউ কারো সেবা দেয়ার অবস্থায় নেই। মা শামসুন্নাহারের মুখ ও হাত পুড়ে গেছে।
বলছিলেন মুখের দিকে এখন আর তাকাতে পারেন না।
“জীবনে কোনদিন মুখে একটা কিছু ওঠে নি। আর এখন আমি এভাবে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার। নিজের মুখের দিকে তাকালে মন খারাপ হয়ে যায়”
পেট্রোল বোমা হামলার শিকার বেচে যাওয়া এই সব মানুষদের বেশিরভাগই ট্রমায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
তাদের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাউন্সেলিং-এর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিশেষ সেল তৈরি করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স এই মানুষদের কাউন্সেলিং সেবা দিচ্ছে।
ঢাকায় সংস্থাটির একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ফারহানা নাজনীন বলছেন তারা ট্রমা সংক্রান্ত বেশ কিছু লক্ষণ এসব মানুষদের মধ্যে দেখতে পেয়েছেন।
তিনি বলছিলেন, তাদের দেখা ৫৮ শতাংশ পেট্রোল বোমার শিকার রোগীদের মধ্যে ট্রমা সংক্রান্ত বেশ কিছু লক্ষণ দেখেছেন।
পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার ঘটনার অনেক পরেও দেখা দিতে পারে, বলছিলেন তিনি।
“শুরুতে শারীরিক কষ্টের কারণে বিষয়টা নজরে পড়ে না। কিন্তু অনেক পরে সেটা দেখা দিতে পারে। সেটা যে হতে পারে এবং তার যে চিকিৎসা দরকার প্রথম বিষয় হলো সেটা বুঝতে পারা।”
মিজ নাজনীন বলছেন, দীর্ঘ কাউন্সেলিং-এ এসব মানুষের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব তবে তা সময়ের ব্যাপার।
সেক্ষেত্রে সেবাদানকারী পরিবারের সদস্যদেরও মানসিক সহায়তা দরকার।
এধরনের সেবা দিতে ঢাকা মেডিকেলে পেট্রোল বোমা হামলার শিকার রোগীদের তালিকা রাখা হচ্ছে।
বাড়ি বাড়ি চিকিৎসা দেবার চিন্তা চলছে।
কিন্তু তা চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত বর্ধনবাড়ির সাথী আক্তার এখন রাত কাটাচ্ছেন দু:স্বপ্ন দেখে।
হাজারীবাগের পৃথ্বীরাজ ভয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন।
আর শামসুন্নাহার এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে সামনে কঠিন সময়ের।








