পশ্চিমা জোট নেটোর সাথে রাশিয়ার বিরোধের কারণ কী?

ছবির উৎস, AFP
- Author, লরেন্স পিটার
- Role, বিবিসি নিউজ
ইউক্রেনের সংঘাত পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোর সাথে রাশিয়ার সম্পর্কে অবনতি ঘটিয়েছে, এবং পুনরায় ঠাণ্ডা লড়াই ফিরে আসার আশংকা তৈরি করেছে।
আফগানিস্তানে সহযোগিতা এবং জলদস্যু মোকাবেলায় এক সাথে কাজ করা সত্ত্বেও সম্পর্ক বেশ কয়েক বছর ধরে খারাপের দিকে যাচ্ছিলো।
নেটো অভিযোগ করছে, যে রাশিয়া ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহযোগিতা করার জন্য তার সেনাবাহিনীকে পাঠিয়েছে।
কেউ কেউ এটাকে ‘গোপন আক্রমণ’ বলে বর্ণনা করেছে।
রাশিয়া অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ইউক্রেনের পশ্চিমাপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের অভিযোগ এনেছে।
তবে রাশিয়ার সাথে নেটোর বর্তমান শীতল সম্পর্কের জন্য অন্যান্য বিষয়ও দায়ী।

ছবির উৎস, BBC World Service
নব্বই দশকের শুরুতে কম্যুনিজমের পতনের পর পূর্ব এবং মধ্য ইউরোপের দেশগুলো নেটোতে যোগ দেবার জন্য তোরজোড় শুরু করে দেয়।
ভবিষ্যতে রাশিয়া থেকে কোন আগ্রাসন নিরুৎসাহিত করার জন্য এবং পশ্চিমা মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্য দেখাবার জন্য তারা নেটোর সদস্য হতে চায়।
বার্লিন প্রাচীরের পতনের প্রায় ১০ বছর পর নেটো তিনটি প্রাক্তন সোভিয়েত মিত্র দেশকে সদস্যপদ দেয়: চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ড।
সোভিয়েত সামরিক জোট ওয়ারশো প্যাক্টের আরো কয়েকটি দেশ যোগ দেয় ২০০৪ সালে: বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া এবং স্লোভেনিয়া।
একই সময়ে, বলটিক সাগর উপকূলের তিনটি প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র, এস্তোনিয়া, লাতভিয়া এবং লিথুয়েনিয়াও নেটোর সদস্যপদ লাভ করে।
বলটিক প্রজাতন্ত্রগুলোকে নেটোর সদস্যপদ দেওয়াটা রাশিয়াকে সবচেয়ে বেশি নাখোশ করে।
এই তিনটি দেশ এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল এবং মস্কো তাদের ‘নিকট বিদেশ’ হিসেবে গণ্য করে।

ছবির উৎস, Twitter.Poroshenko
ওয়েলস-এ অনুষ্ঠিত নেটো শীর্ষ বৈঠকে ফিনল্যান্ড নেটোর সাথে একটি ‘স্বাগতিক দেশ’ চুক্তি সাক্ষর করবে।
ফিনল্যান্ড যদিও নেটোর সদস্য নয়, এই চুক্তির ফলে নেটো বাহিনী ঐ দেশে যাতায়াত এবং অন্যান্য সুবিধা পাবে। রাশিয়ার সাথে ফিনল্যান্ডের যত লম্বা সীমান্ত আছে, কোন নেটো সদস্য-দেশের সেরকম সীমান্ত নেই।
ফিনল্যান্ডের প্রতিবেশী সুইডেনও একই চুক্তি সই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে তার কোন তারিখ এখনো ঠিক হয়নি।
আরেকটি প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র, জর্জিয়াকে ভবিষ্যতে সদস্যপদ দেওয়া হবে বলে নেটো ২০০৮ সালে প্রতিশ্রুতি দেয়, যেটা মস্কো উসকানি হিসেবে দেখে।
অগাস্ট মাসে ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী আর্সেনি ইয়াতসেনুক বলেন, তিনি দেশের সংসদকে অনুরোধ করবেন যাতে তারা নেটোর সদস্য হবার পথ সুগম করার জন্য আইন প্রণয়ন করেন।
নেটোতে অংশগ্রহণের বিষয়টি ইউক্রেনের প্রাক্তন রাশিয়া-বান্ধব রাষ্ট্রপতি ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ নাকচ করেছিলেন। মিঃ ইয়ানুকোভিচ গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানী কিয়েভে সহিংস প্রতিবাদের মুখে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

ছবির উৎস, Getty
আমেরিকার তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়াকে উদ্বিগ্ন করে।
নেটো বলছে, এই ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা একেবারেই আত্মরক্ষামূলক, রাশিয়ার প্রতি কোন হুমকি নয়।
তারা বলছে, এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভবিষ্যতে কোন দস্যু রাষ্ট্র থেকে কোন হুমকির মোকাবেলা করা। এখানে, পশ্চিমা দেশগুলো ইরান এবং উত্তর কোরিয়াকে হুমকি হিসেবে দেখে।
এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করতে রাশিয়া নেটোর সাথে সমতার ভিত্তিতে কাজ করতে চেয়েছিল, কিন্তু সেটা আর হয়নি।
নেটো এখন নিজেই ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং রাডার ব্যবস্থা রোমানিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র এবং পোল্যান্ডে মোতায়েন করছে।
নেটোর সাথে সম্পর্কে আরেকটা আঘাত আসে ২০০৮ সালে, জর্জিয়ার সাথে রাশিয়ার সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের সময়।

ছবির উৎস, BBC World Service
রাশিয়া জর্জিয়ার দুটি বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল – দক্ষিণ ওসেটিয়া এবং আবখাযিয়াকে সমর্থন করছিল। যখন জর্জিয়ার সেনাবাহিনী দক্ষিণ ওসেটিয়া পুনর্দখল করার চেষ্টা করে, রাশিয়ার সেনাবাহিনী জর্জিয়ার বাহিনীকে বিধ্বস্ত করে।
রাশিয়ার বাহিনী পুরোপুরি জর্জিয়ায় ঢুকে পরে এবং এক পর্যায়ে রাজধানী তিবলিসির কাছে চলে আসে। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার পদক্ষেপকে বাড়াবাড়ি বলে নিন্দা করে।
পরবর্তীতে রাশিয়া দক্ষিণ ওসেটিয়া এবং আবখাযিয়াকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সেখানে এখনো সংঘাত বিরাজ করছে, যদিও সেটা স্থগিত।
এই দুটো অঞ্চলের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়।
সার্বিয়ার সাথে রাশিয়ার সখ্যতা দীর্ঘদিনের, এবং কসোভো প্রশ্নে মস্কো বরাবরই বেলগ্রেডকে সমর্থন করে আসছে।
সার্বিয়া কখনোই কসোভোর স্বাধীনতা মেনে নেয়নি।
কসোভো ১৯৯৯ সালে নেটোর সহায়তায় বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। অনেক দেশই ২০০৮ সালে কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেয়নি।
কসোভোর সংখ্যাগরিষ্ঠ আলবেনীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করলে সার্ব বাহিনীর সাথে সংঘাতের শুরু হয়।
সার্ব বাহিনীর আচরণের ফলে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝর বয়ে যায়।
যখন হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যেতে শুরু করে তখন নেটো সামরিক পদক্ষেপ নেয়।
অভিযানের সময় নেটো বাহিনী কসোভোর রাজধানী প্রিসটিনায় রুশ সৈন্যদের সাথে মুখোমুখি অবস্থানে চলে গিয়েছিল, কিন্তু পরিস্থিতি বেশ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল।

ছবির উৎস, AFP
রাশিয়া ২০০৭ সালে ইউরোপে সামরিক বাহিনী সংক্রান্ত চুক্তি সিএফই-তে তার অংশগ্রহণ সাময়িকভাবে থামিয়ে দেয়।
নির্দিষ্ট কতগুলো অঞ্চলে সামরিক সরঞ্জামের সংখ্যা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে পশ্চিমা দেশগুলো এবং তৎকালীন ওয়ারশো জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ১৯৯০ সালে এই চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ওয়ারশো জোটের বিলুপ্তির পর এই চুক্তি ১৯৯৯ সালে নতুন করে সাজানো হয়, যেটাতে নেটোর নতুন সদস্যদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়।
তবে, চুক্তির নতুন দিকগুলো রাশিয়া মেনে নিলেও, নেটো সেগুলো অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের দাবী ছিল, রাশিয়াকে প্রথমে জর্জিয়া এবং মলডোভা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
এখন রাশিয়ার সীমান্তের কাছে পূর্ব ইউরোপে কয়েক হাজার সৈন্যের ‘র্যাপিড রেসপন্স ফোর্স’ মোতায়েন করার পরিকল্পনা ঘোষণ করেছে নেটো।
এই বাহিনীতে নেটো সদস্য দেশগুলোর সেনা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করবে, যাদেরকে ৪৮ ঘণ্টার নোটিসে মোতায়েন করা যাবে।
এই ধরনের বাহিনী সিএফই চুক্তিকে দুর্বল করে দেবে, যদিও নেটো দাবী করছে এই বাহিনীর কোন স্থায়ী ঘাঁটি থাকবে না।








