শিশু চুরি নিয়ে মায়েরা আতঙ্কে

- Author, আফরোজা নীলা
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
টাকা পয়সা বা সোনা রুপা চুরি নয়। হাসপাতাল থেকে চুরি হয়ে যাচ্ছে খোদ নবজাতক শিশু। গত সপ্তাহে বাংলাদেশের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এরকম এক নবজাতক শিশু চুরি হওয়ার পর হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই ঘটনায় কাজ করছে তদন্ত কমিটি কিন্তু এখনও তারা কোনো ধরনের ক্লু খুঁজে পাচ্ছে না।
কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা লেবার ওয়ার্ডের নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কি আশ্বস্ত হতে পারছেন প্রসুতি মাতা ও তার পরিবারের সদস্যরা?
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দোতালার এই ২১৩ নাম্বার ওয়ার্ডেই রুনা আক্তারের যমজ শিশুর একটি চুরি হয় গত বৃহস্পতিবার ভোরে, যার কোন হদিস এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। নবজাতক যমজ দুই শিশুর একটিকে হারিয়ে মা রুনা আক্তার অনেকটাই হতবিহ্বল।
শিশুটির খোঁজে তার বাবা কাওসার হোসেন ও নানী গুলেনুর বেগম থানা আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার ছুটছেন। গুলেনুর বেগম বলছিলেন ঘটনার আগের দিন বুধবার জন্ম নেয়া যমজ শিশু দুটিকে ওয়ার্ডে নিয়ে আসার পর থেকেই তারা এক মহিলাকে ওয়ার্ডে ঘুরতে দেখেন, তারপর প্রশ্ন করে জানেন যে ওই মহিলার ভাবী আছেন অন্য ওয়ার্ডে এবং তারা ১৫দিন থাকবেন।
বৃহস্পতিবার সকালের দিকে শিশু দুটি কান্না শুরু করলে ওই মহিলা একজনকে কোলে নেয় বলে জানান গুলেনুর বেগম। তিনি সরল মনে ভেবেছিলেন যে শিশুটিকে নিয়ে ওই মহিলা কোথায় বা যাবেন! কিছু পরে রুনা আক্তার তার বাচ্চার কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি খোঁজাখুঁজি করে দেখেন ওই মহিলাও নেই শিশুও নেই।
তবে এই ওয়ার্ডের অন্যান্য রোগী ও আত্মীয়দের অনেকের অভিমত এই চুরির জন্য পরিবারের অসচেতনতা দায়ী। যদিও তারা হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ গাইনী ও শিশু বিভাগসহ এই হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগের গেইটের সামনে আছে সিসিটিভি ক্যামেরা, প্রতিটি ওয়ার্ডের সামনে আছে নিরাপত্তাকর্মী। তবুও সম্প্রতি বাচ্চা চুরির যে ঘটনাটি ঘটেছে তা যেন এখানকার মায়েদের মনে এক আতঙ্ক তৈরি করে ফেলেছে।
সন্তানসম্ভবা ঝর্না আক্তার যেমন একটা ভয় নিয়েই ডেলিভারির অপেক্ষায় আছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
তিনি বলছিলেন, “আমি আসার আগে থেকেই ভাবতেছি আমারতো ডেলিভারি হবে কিনা কি হয় আর কি। বলছিলাম আইসা যে এই যে বাচ্চা চুরি হয়, কেমনে কি হইবো। তারপর তারা বলছে বাচ্চা ডেলিভারির পর যার কাছে দেয়া হবে তার সিগনেচার নিয়া সে বাচ্চার কি হয় সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে বাচ্চা দেয়া হবে”।

এদিকে সন্তানসম্ভবা পপি আক্তার বলছেন বাচ্চা চুরির ভয়ে পরিবারের সদস্যরা সবাই হাসপাতাল ও আশেপাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
“আমার স্বামী ও সবাইরে ফোন কইরা বলছি, এই যে বাচ্চা চুরি গেছে আমারতো ভয়ই লাগতাছে। ওরা বলছে যে তুমি চিন্তা কইরোনা আমরা সবাই আসতাছি। আমার ননদ আছে। মা, ভাইবোন, ভাইয়ের বউ সবাই আসতাছে। সবাই থাকবো। ওরাও ভয় পাইয়া গেছে। স্বাভাবিক ভয় পাওনেরই কথা। একটা বাচ্চার জন্যইতো একটা মা এত কষ্ট করে”।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিসিটিভি ক্যামেরা ও প্রতি গেইটে নিরাপত্তাকর্মী থাকা সত্ত্বেও কিভাবে এমন ঘটনা ঘটে এই প্রশ্ন অনেকের মনে।
এর আগেও হাসপাতাল থেকে শিশু চুরির বিভিন্ন অভিযোগের কথা শোনা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ধরনের অভিযোগের কথা স্বীকার করলেও এর সংখ্যা কত সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন ধারণা দিতে পারেনি।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা: মো: মুশফিকুর রহমান মনে করেন এধরনের ঘটনায় কোন চক্র জড়িত থাকতে পারে।
তিনি মনে করেন যারা এ ধরনের কাজ করেন তারা অনেকদিন ধরে অবজার্ভ করে সময় সুযোগমতো এই কাজটি করে। খুব কমসংখ্যক মানুষ এখানে থাকে, ও সাধারণ মানুষের ভিড়ে লোকচক্ষুর আড়ালে তারা থাকতে পারে।
মি: রহমান আরও বলছেন এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়ানোর জন্য শিশুর স্বজনদেরও সচেতন থাকা প্রয়োজন। তবে হাসপাতাল থেকে শিশু চুরির যে অভিযোগের কথা শোনা যায় তা ঠেকানোর জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করা জরুরী বলে মনে করেন উপপরিচালক ডা: মো: মুশফিকুর রহমান।
এখানে উল্লেখ্য গত ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নবজাতক এক শিশু চুরি হয়েছিল এবং সেই চুরির অভিযোগে একটি মামলাও হয়েছিল। তবে সিসি ক্যামেরায় চুরির দৃশ্য ধরা পড়লেও শিশুটি উদ্ধার হয়নি।
আর এমন সব ঘটনা হাসপাতালে আসা মায়েদের মনের ভয়কেও যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।








