বাংলাদেশে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি কেন মন্ত্রিসভায়?

- Author, সায়েদুল ইসলাম
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো এমন একটি সরকার গঠন করা হলো, যেখানে সংসদে নির্বাচিত সবগুলো দলের নেতারাই সরকারের অংশ হচ্ছেন। এমনকি দশম জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে যে দলটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হচ্ছে, সেই দলের কয়েকজন নেতা একই সাথে সরকারের মন্ত্রী হিসাবেও দায়িত্ব নিচ্ছেন।
নতুন মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির তিনজন নেতা মন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছে। তবে এর আগের দিনই সংসদ সচিবালয়ের যে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ১৪ দলীয় মহাজোটের শরীক এই দলটিকে বিরোধী দল আর দলের নেতা রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর একজন সদস্য এইচ টি ইমাম বলছেন, জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হিসাবেই ভূমিকা রাখতে চেয়েছে এবং তাদের আগ্রহের কারণেই দলটির কয়েকজন নেতাকে মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এইচ টি ইমাম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে আসেননি, তাদের বাদ দিয়ে দেশের বড় দলগুলো কিন্তু সংসদে আছে।"
জাতীয় পার্টি আগেই জানিয়েছে যে তারা বিরোধী দলে থাকবেন, সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেবেন, কিন্তু সেই সাথে তারা সরকারকে সহযোগিতাও করতে চান। তারই প্রকাশ হিসাবে তাদের কয়েকজন নেতা মন্ত্রীসভায় রয়েছে। হয়তো সব নীতি সম্পর্কে তারা সরকারের সাথে একমত হবেন না, সেক্ষেত্রে সেগুলোয় তারা হয়তো শরীক হবেন না।
মি. ইমাম বলছেন, প্রতিবেশী অনেক দেশে এ রকম দৃষ্টান্ত আছে। বাংলাদেশে এ ধরণের সরকার প্রথম হলেও এটি একেবারে নতুন ধরণের পদ্ধতি তা বলা যাবে না।
১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির সমর্থনেই সরকার গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ কিন্তু সেই সরকারে দলটির একজন নেতা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরেই মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ফলে ওই নেতাকে দলটি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু একই সাথে দলীয় সিদ্ধান্তেই বিরোধী দলে থেকে আবার সরকারের অংশ হিসাবে ভূমিকা পালনের মতো দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে এবারই প্রথম।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলছেন, এরকম দৃষ্টান্ত আর কোথাও আছে বলে তার জানা নেই।
শাহদীন মালিক বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধিতে বিরোধী দলের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে যে, সংসদে সরকারের বাইরে যে সর্ববৃহৎ দল সরকারের বিরোধিতা করবে, সেটিই বিরোধী দল। এখন সরকারে থেকে কিভাবে সরকারের বিরোধিতা করা যাবে, সেটি তো বুঝতে পারছি না। মন্ত্রীসভায় যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, জাতীয় পার্টির মন্ত্রীরাও তো সেই সিদ্ধান্তের সাথে একমত হবেন। তাদেরই একটি অংশ যদি আবার সংসদে এসে তার বিরোধিতা করে, তাহলে তো একই সাথে পক্ষে থাকা বিপক্ষে থাকার মতো উদ্ভট একটা ব্যাপার হবে। আমার জানামতে সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে অন্য কোন দেশে এরকম একটা উদ্ভট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তো মনে পড়ছে না।"
এর আগে জাতীয় পার্টির একজন নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ বিবিসি বাংলার কাছে দাবি করেন, সরকারে থেকেই তারা বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করবেন, যা, তার ভাষায় হবে গঠনমূলক বিরোধিতা।
জাতীয় পার্টির নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ বলছেন, দেশে যখন কোন সংকট তৈরি হয়, তখন সবাইকে সাথে নিয়েই কাজ করা ভালো। তাই সরকার যদি এরকম কোন সরকারের চিন্তা করে, আমি তো মনে করি তা ভালো। আপনি কি মনে করেন, সংসদে একদিন গিয়ে গালাগালি করে এলাম, পরে আর গেলাম না, সেটাই কি ভালো? এ ধরণের বিরোধী দলও তো আমরা দেখেছি। বিদেশের সাথে তো আমাদের দেশের বিরোধী দলের পার্থক্য অনেক। বিরোধী দল সরকারের গঠন মূলক সমালোচনা করবে, সরকারের যদি ভালো কাজ থাকে, সেটিকে তো সমর্থনও করা যেতে পারে।
সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলী খান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, আসন ভাগাভাগির ভিত্তিতেই যেহেতু নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাই জাতীয় পার্টিকে মন্ত্রীসভায় স্থান না দিয়ে সরকারের উপায় ছিল না।
মি. খান বলছেন, "যদি প্রকৃত নির্বাচন হতো, তাহলে নিশ্চয়ই জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হিসাবে নির্বাচিত হতো না। যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হয়েছে, তাতে এটি একটি বিচ্যুতি বলা যেতে পারে। নির্বাচন হলে তো বিরোধী দল হবে, এখানে তো আসলে আসন ভাগাভাগি হয়েছে। প্রকৃত অর্থে এখানে কোন বিরোধী দল নেই।"
আকবর আলী খানের মতে, দেশের বেশিরভাগ আসনেই নির্বাচন হয়নি। যেসব আসনে নির্বাচন হয়েছে, সেখানেও সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই নির্বাচন হয়েছে। ফলে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশের একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে আর এর ফলেই জাতীয় পার্টির একই সঙ্গে সরকারি আর বিরোধী দলে থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।








