ভারতের নাগা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন কোন পথে

নাগাল্যান্ডে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ভারত সরকারকে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, নাগাল্যান্ডে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ভারত সরকারকে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য নাগাল্যান্ডের জন্ম হয়েছিল আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে – ১৯৬৩ সালের ১লা ডিসেম্বর। স্বাধীন ভারতের নানা প্রান্তে নানা সময়ে যে সব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হয়েছে – তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো আর সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে চলা আন্দোলনের জন্মও কিন্তু এই নাগাল্যান্ডেই – যা আজও পুরোপুরি স্তিমিত হয়ে গেছে বলা যাবে না। ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হিসেবে নাগাল্যান্ডের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে সেই জঙ্গী নাগা আন্দোলন আজ কোথায় দাঁড়িয়ে? দিল্লিতে অনুসন্ধান করেছেন শুভজ্যোতি ঘোষ:

ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে ভারতের ১৬ নম্বর অঙ্গরাজ্য হিসেবে আবির্ভাবের আগে নাগাল্যান্ড ছিল আসামেরই একটি জেলা। কিন্তু পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে নাগাদের আন্দোলন চলছে তারও অনেক আগে থেকে – সেই ১৯৪৭ সালেই আঙ্গামি ফিজোর নেতৃত্বে নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল প্রথম এই দাবি তোলে।

পরে ১৯৮০তে তৈরি হয় এনএসসিএন বা ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড – যাদের দাবি ছিল গ্রেটার নাগাল্যান্ড গঠন।

নাগা বিদ্রোহী নেতা টি মুইভাহ
ছবির ক্যাপশান, নাগা বিদ্রোহী নেতা টি মুইভাহ

সেই এনএসসিএন পরে দুভাগ হয়েছে আইজ্যাক-মুইভা আর খাপলাং, এই দুই গোষ্ঠীতে – আর এখন এই দুপক্ষের সঙ্গেই চলছে ভারত সরকারের যুদ্ধবিরতি।

কিন্তু এদের কাউকেই এখন আর সেই অর্থে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বলা যাবে না – বলছিলেন উত্তর-পূর্ব ভারত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সুবীর ভৌমিক।

তাঁর কথায়, ‘এদের সঙ্গে ভারত সরকারের শান্তি আলোচনা চলছে আজ দীর্ঘ পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে। আর স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্বের দাবি ছেড়ে দিয়ে এনএসসিএন এখন ভারতের মধ্যে থেকেই একটা সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছে।’

তবে এনএসসিএন যে বৃহত্তর নাগাভূমি বা গ্রেটার নাগার‍্যান্ড চায় – সেটা না-পাওয়া পর্যন্ত এই আলোচনার মাধ্যমে একটা চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে না – বলছিলেন মি ভৌমিক।

এই সব নাগা গোষ্ঠীর নেতারা গ্রেটার নাগাল্যান্ডে এখনকার নাগাল্যান্ড ছাড়াও অন্তর্ভুক্ত করতে চান আসামের কাছাড় হিলস ও মণিপুর রাজ্যের একাংশকে – যা ভারত সরকার মানতে রাজি নয়।

দুপক্ষের অবস্থানে এই ফারাক থাকা সত্ত্বেও আলোচনা অবশ্য বন্ধ হয়নি – আর ফলে নাগাল্যান্ডে নতুন করে হিংসা মাথা চাড়া দেওয়ার আশঙ্কাও প্রায় নেই বললেই চলে, বিবিসিকে বলছিলেন বর্ষীয়ান নাগা রাজনীতিবিদ ড: এম চুবা আও।

তিনি বলছেন, ‘নাগারা একটি পৃথক জাতিসত্ত্বা, পৃথক পরিচিতি – তারই স্বীকৃতির দাবিতে তারা এতদিন লড়াই করেছে। ফলে এখন জঙ্গীবাদের রাস্তা ছেড়ে যারা আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হয়েছে, ভারত সরকারও জানে তাদের কিছু একটা দিতে হবে।’

ড: আওয়ের কথায়, ‘দুপক্ষের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছনো যাবে বলেই মনে হচ্ছে – কারণ ভারত সরকারও উপলব্ধি করেছে নাগাদের আন্দোলন একটা নিছক আইন-শৃঙ্খলা সমস্যা নয়, বরং এটা রাজনৈতিক আন্দোলন!’

তবে এই আলোচনা যদি শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ না-ও হয়, নাগা গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে আবার নতুন করে এখন সশস্ত্র আন্দোলনের রাস্তায় ফিরে যাওয়াটা মুশকিল বলেই অভিমত সুবীর ভৌমিকের।

তিনি বলছেন, আইজ্যাক স্যু বা মুইভা-র মতো যে সব নাগা নেতারা একদিন চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় সে দেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে নাগাল্যান্ডে লড়াই করেছেন – তারাও কিন্তু আজ দিল্লি এসে মাঝে মাঝে আলোচনায় বসা আর বোঝাপড়ার রাস্তাটা খুলে রাখতেই বেশি আগ্রহী, ফলে তাদের দাবি না-মানা সত্ত্বেও জঙ্গলে গিয়ে ফের গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার মতো অবস্থায় তারা নেই!

এই দিক থেকে ভারত সরকার সফল বলেই মি ভৌমিকের অভিমত – আর এই সাফল্যের পেছনে যে পলিটিক্যাল ইনজিনিয়ারিং –তিনি বলছেন তার প্রথম ধাপটাই ছিল পঞ্চাশ বছর আগেকার নাগাল্যান্ড রাজ্য গঠন!

অর্থাৎ পৃথক নাগাল্যান্ড রাজ্য – যা আজ পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করল – তা নাগা আন্দোলনের ধার কমাতে ও সেখানে ভারত-বিরোধিতার প্রভাব কমাতে সাহায্য করেছে বলেই পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

কিন্তু পাশাপাশি বোরো, ডিমাসা, কার্বিদের মতো উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অজস্র ছোটবড় উপজাতি গোষ্ঠীও যে আজ আলাদা রাজ্যের দাবিতে লড়ছে – তাদের প্রত্যাশাকেও কিন্তু উসকে দিয়েছিল পঞ্চাশ বছর আগেকার নাগাল্যান্ড রাজ্য গঠন।

ফলে সেই সিদ্ধান্তের ভালমন্দ – দুটোই এখনও সামলাতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতকে!