জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য ভেস্তে যেতে পারে

ছবির উৎস, NO CREDIT

    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্য একসময় উন্নয়ন নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি কেড়েছিল। কিন্তু সেই সাফল্য বাংলাদেশ ধরে রাখতে পারছে না কেন?

বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যেভাবে বাংলাদেশে গুরুত্ব হারাচ্ছে, তাতে দেশটির সাফল্য ভেস্তে যেতে পারে।

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর একটি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনঘনত্ব প্রায় এক হাজার দুশোর কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক যদি কেবল উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে ঠেসে দেয়া হয় তাহলে সেখানকার জনঘনত্ব যা দাঁড়াবে, বাংলাদেশের বর্তমান জনঘনত্ব এখন তাই।

অনেকের কাছে এটাই আঁতকে উঠার মতো পরিসংখ্যান। কিন্তু ধরা যাক, অর্ধেক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের তিরিশ কোটি মানুষের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো উইসকনসিনে। কি দাঁড়াবে অবস্থাটা ?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন যে গতিতে কমছে, যতদিনে সেটা থিতু বা স্থির হবে, ততদিনে বাংলাদেশের জনঘনত্ব দাঁড়াবে অনেকটা এরকম।

থমকে গেছে সাফল্য

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশে ফার্টিলিটি রেট বা মা প্রতি শিশু জন্ম হার ছিল ছয় দশমিক ২। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল তিন শতাংশ।

পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশ এই অতি উচ্চ জন্ম হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে। ফার্টিলিটি রেট এখন নেমে এসেছে দুই দশমিক পাঁচে, আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক তিনে।

কিন্তু কয়েক দশকের এই সাফল্য এখন ভেস্তে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম নুর-উন-নবী বলেন, সরকারের অবহেলা ও বারবার নীতি পরিবর্তনই মূলত এর জন্যে দায়ী।

“একসময়ে বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী অনুন্নত দেশগুলোর জন্যে রোল মডেল হলেও এখন আর সেই অবস্থা নেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতিগত পরিবর্তন, রাজনৈতিক দলগুলোর মতভিন্নতার কারণে কখনো ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর বিষয়টি সামনে গেছে, কখনো পেছনে গেছে। ফলে এই বিষয়টি আর সেভাবে গুরুত্ব নিয়ে থাকেনি।”

জনবলের অভাব

আশির দশকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা জন্ম নিয়ন্ত্রণের উপকারিতা বোঝানোর পাশাপাশি পিল ও কনডম পৌঁছে দিতেন। কিন্তু সরকারের সেই কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে।

এজন্যে পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের তথ্য, শিক্ষা ও প্রণোদনা বিভাগের পরিচালক গনেশ চন্দ্র সরকার জনবলের অভাবকে দায়ী করলেন।

তিনি বলছেন, প্রায় পনেরো বছর ধরে এই দপ্তরে নতুন করে কোন মাঠকর্মী নিয়োগ করা হয়নি। ফলে সেখানে একটি শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, মাঠ পর্যায়ে যে পদগুলো রয়েছে, সেগুলো তৈরী হয়েছে সত্তরের দশকের শেষদিকে। তখন প্রতি ছয়শ পরিবারের জন্য একজন করে কর্মী নির্দিষ্ট করা হয়েছিল।

কিন্তু জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন একজন কর্মী অনুপাতে পরিবার হয়েছে বারোশ থেকে পনোরোশো। ফলে কর্মীরা আর আগের মতো সবার কাছে যেতে পারছেন না।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকির বলছেন, কর্মী সংকটের বিষয়টি তারা সমাধানের চেষ্টা করছেন। এছাড়া যেসব অঞ্চল পিছিয়ে রয়েছে সেসব ক্ষেত্রেও তারা বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

“ আমরা উনত্রিশ হাজার মাঠকর্মী নিয়োগ করতে যাচ্ছি। ইতোমধ্যেই বেশকিছু নিয়োগ করা হয়েছে। সবার নিয়োগ হয়ে গেলে আবার বাড়ি বাড়ি প্রচারণার কাজটি শুরু হয়ে যাবে।”

তিনি বলেন, ‍‚আমরা দেখেছি, হাওর অঞ্চলসহ দেশে কিছূ অঞ্চলে জন্মহার এখনো বেশি রয়েছে। সেসব এলাকায় বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাথে মিলে আমরা একটি টাস্কফোর্স গঠন করছি, যা সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।”

প্রয়োজন নতুন কৌশল

পিল ও কনডমের মতো সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবহারে সচেতনতা তৈরী করতে বাংলাদেশ অনেকটাই সফল হলেও, এখনো দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতি গ্রহণে বেশিরভাগ দম্পতিরই অনীহা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সরকারের উচিত এক্ষেত্রে বিশেষ প্রচারণা ও আগ্রহ তৈরী করা।

জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক ডা. আহমেদ আল সাবির বলছিলেন পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থপনায়ও এখন পরিবর্তন আনা দরকার।

“এখন বাংলাদেশে সবার জন্যই একই ধরণের কর্মসূচী নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এখন তো জনসংখ্যার সচেতনতায় কিছুটা সাফল্য পাওয়া গেছে। সুতরাং এখন দরকার এলাকা বা জনগোষ্ঠী অনুযায়ী বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া।”

তিনি আরও বলেন, “চিকিৎসকদের আরো প্রশিক্ষণ দেয়ার দরকার আছে। তার চেয়ে যেটা বেশি দরকার, তা হলো স্বল্প মেয়াদী পদ্ধতির বদলে দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতি বা স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণে সবাইকে উৎসাহিত করা। একটি ধারণা আছে, যে দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতি গরীবদের জন্য। এই ভুলটিও ভেঙ্গে দিতে হবে।”

অধ্যাপক নুর-উন-নবী বলছেন, সরকার জন্মহার বৃদ্ধির হার ও ফার্টিলিটি রেট কমাতে সফল হয়েছে। কিন্তু এখন যে হার রয়েছে, এই হারে চললেও, দেশের আয়তন অনুপাতে ভবিষ্যতে জনসংখ্যার হার অনেক বেশী হবে। এই হারে চললে ২০৮০ সাল নাগাদ একটি স্থিরতা আসবে। কিন্তু ততদিনে জনসংখ্যা অনেক বেশি হয়ে যাবে।