জার্মানি: একসময়ের 'ছিটগ্রস্তদের' দল রাইশবুর্গার কীভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠলো

খবরটা প্রথম যখন বেরোয় তখন অনেকেই এটা পড়েছেন একটা অবিশ্বাসের অনুভূতি নিয়ে। জার্মানিতে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র? এও কি সম্ভব?

কিন্তু আসলেই তাই হয়েছে। কট্টর দক্ষিণপন্থী এবং সাবেক কিছু সামরিক বাহিনীর সদস্যের একটি গ্রুপ জার্মানির পার্লামেন্ট ভবনে অভিযান চালিয়ে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছিল - এই অভিযোগে মঙ্গলবার জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মোট ২৫ জনকে গ্রেফতার করেছে।

জার্মানির একটি অভিজাত পরিবারের এক সদস্য - যিনি নিজেকে প্রিন্স ত্রয়োদশ হেইনরিখ বলে পরিচয় দেন - তাকে এই পরিকল্পনার মূল হোতা বলে বলা হচ্ছে।

জার্মানিতে বহুকাল ধরেই লোকে এই 'রাইশবুর্গারকে' কিছু ছিটগ্রস্ত লোকের গোষ্ঠী বলে মনে করতো।

তারা ছিল প্রায় জাতীয়ভাবেই সবার ঠাট্টা-তামাশার পাত্র। মনে করা হতো এরা উন্মাদ, তবে বিপজ্জনক নয়।

কিন্তু এখন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য তারা এক ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। কারণ, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে এই গোষ্ঠীটি ক্রমশ আরো উগ্র এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

কারা এই রাইশবুর্গার - কী চায় তারা

রাইশবুর্গার কথাটির অর্থ সিটিজেনস অব দ্য রাইশ বা "সাম্রাজ্যের নাগরিক।" জার্মান ভাষায় রাইশ কথাটির অর্থ সাম্রাজ্য।

এর সদস্যরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মান রাষ্ট্রকে স্বীকার করে না, এরা সরকারের কর্তৃত্বও মানে না।

বিবিসি বাংলায় সম্পর্কিত আরো খবর:

তাদের পরিকল্পনা ছিল যে তারা বর্তমান প্রজাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে ১৮৭১ সালের দ্বিতীয় জার্মান রাইশের আদলে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে।

যারা গ্রেফতার হয়েছে তার অর্ধেকই জার্মানির দক্ষিণের ব্যাডেন-ভুর্টেমবার্গ এবং বাভারিয়া অঞ্চলে।

কিন্তু এটি কোন সংগঠিত জাতীয় আন্দোলন নয়। বরং এটি অভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসী ছোট ছোট কিছু গোষ্ঠী এবং ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত। জার্মানি জুড়েই এদের সদস্যরা ছড়িয়ে আছে।

জমি, বন্দুক, নিজস্ব মুদ্রা, পরিচয়পত্র

এদের কারো কারো নিজস্ব মুদ্রা এবং পরিচয়পত্রও আছে। তাদের স্বপ্ন - একসময় তারা তাদের নিজস্ব স্বায়ত্বশাসিত রাষ্ট্র গঠন করবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় - রাইশবুর্গারের সদস্য একটি গোষ্ঠীর নাম হচ্ছে "কোনিগরাইখস ডয়েচেল্যান্ড" বা জার্মানি রাজ্য । তারা কিছুদিন আগে স্যাক্সনিতে দুটি জায়গা কেনে এবং তাতে তাদের স্বশাসিত রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা ছিল।

অন্য কিছু গোষ্ঠী আছে যারা কর দিতে অস্বীকার করে থাকে।

কখনো কখনো তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে বিপুল পরিমাণ চিঠি পাঠিয়ে ইচ্ছে করেই প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি করে । এসব চিঠি প্রায়ই গালাগালিতে ভরা থাকে।

তাদের অনেকেই বন্দুকের মালিক - যার কিছু বৈধ, কিছু অবৈধ।

কয়েক বছর আগে এক ঘটনার পর তাদের বহু বন্দুকের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। ২০১৬ সালে, একজন রাইশবুর্গার সদস্যের বাড়িতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রের খোঁজে পুলিশ হানা দিলে সদস্যটি গুলি করে একজন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে। এর পর রাইশবুর্গারের সদস্য সন্দেহে এক হাজারেরও বেশি লোকের বন্দুকের লাইসেন্স বাতিল করা হয়।

তবে গত বছরের শেষ নাগাদ তাদের প্রায় ৫০০ সদস্যের হাতে বন্দুকের বৈধ লাইসেন্স ছিল।

তারা সরকার মানে না

এসব গোষ্ঠী "সার্বভৌম নাগরিক" আন্দোলনের সমর্থক। মনে করে যে তারা সরকারের সবরকম নিয়মকানুন থেকে মুক্ত।

তারা জার্মানির আধুনিক গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে এবং কর দিতে অস্বীকার করে।

তারা মনে করে অশুভ কিছু গোপন রাজনৈতিক শক্তি দেশের মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে এবং এদের উৎখাত করাটাই তাদের কর্তব্য।

রাইশবুর্গারদের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ লোককে উগ্রপন্থী বলে মনে করা হয়. এবং তাদের মধ্যে ইহুদিবিদ্বেষ এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসের প্রবণতা খুবই ব্যাপক।

আরো পড়তে পারেন:

এগুলো সাধারণ মানুষের কাছে যতই উদ্ভট মনে হোক, আসলে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার বহিপ্রকাশ।

ইন্টারনেটে ভুয়া তথ্য এবং ঘৃণা ছড়ানোর সংগে যোগাযোগ আছে এমন কিছু সহিংস কর্মকান্ডের ব্যাপারে এর আগেও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

কী করতে চেয়েছিল

মঙ্গলবার জার্মানি জুড়ে প্রায় ১৩০টি অভিযান চালানো হয় যাতে অংশ নেন প্রায় তিন হাজার নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

অস্ট্রিয়া এবং ইতালিতেও চালানো হয় অভিযান যাতে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।

জার্মান ফেডারেল কৌঁসুলিরা বলছেন, গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে তারা একটি জার্মানিতে একটি সহিংস অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা করছিল। এজন্য তাদের কাউন্সিলের নিয়মিত বৈঠক হচ্ছিল।

অভ্যুত্থানের পর কীভাবে জার্মানি শাসন করা হবে তার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। ভাবা হয়েছিল স্বাস্থ্য, বিচার এবং পররাষ্ট্র সংক্রান্ত বিভাগের কথা।

রাইশবুর্গারের সদস্যরা বিশ্বাস করতেন যে - শুধুমাত্র সামরিক উপায়ে এবং রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েই তাদের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এর মধ্যে একটি উপায় ছিল হত্যাকাণ্ড চালানো।

রাইশবুর্গার পরিমন্ডলের অংশ হচ্ছে ইউনাইটেড প্যাট্রিয়টস নামে একটি সংগঠন । তারা গত এপ্রিল মাসে জার্মান স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্ল লোটারবাখকে অপহরণ এবং গণতন্ত্রের অবসানের জন্য গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা করছিল।

বলা হচ্ছে - জার্মান পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের একজন সাবেক এমপি - যিনি উগ্রদক্ষিণপন্থী এফডি দলের সদস্য - তিনি এ পরিকল্পনার অংশ ছিলেন এবং অভ্যুত্থানের পর তিনি বিচারমন্ত্রী হবেন বলে ঠিক হয়েছিল।

কে এই প্রিন্স ত্রয়োদশ হেইনরিখ?

রাইশবুর্গারদের নেতা হচ্ছেন ৭১ বছর বয়স্ক প্রিন্স ত্রয়োদশ হেইনরিখ। তিনি একটি পুরোনো জার্মান অভিজাত পরিবারের প্রতিভু - যার নাম হাউস অব রিউস। জার্মানির পূর্বপ্রান্তে বর্তমান থুরিঙ্গিয়া প্রদেশে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত এ পরিবার 'রাজত্ব' করতো।

পরিবারের সব পুরুষ সদস্যের নাম রাখা হয় 'হেনরিখ', এবং সেই নামের সঙ্গে একটি সংখ্যাও যোগ করা হয়।

এ পরিবারের মালিকানায় এখনো বেশ কিছু দুর্গ আছে।

ব্যাড লোবেনস্টাইন এলাকায় হেইনরিখের মালিকানাধীন একটি হান্টিং লজ বা শিকারের জন্য ব্যবহৃত বাড়ি আছে।

তার পরিবারের সদস্যরা অনেক দিন ধরেই হেইনরিখের সাথে দূরত্ব রেখে চলেন। তাদের একজন সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, হেইনরিখ নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের পাল্লায় পড়ে "কিছুটা বিভ্রান্ত।"

ষড়যন্ত্রকারীরা যে শুধু একটি ছায়া সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছিল তা নয়, পাশাপাশি তাদের একটি সশস্ত্র শাখা গড়ে তোলারও পরিকল্পনা ছিল।

এই বাহিনীতে সামরিক বাহিনীর বর্তমান এবং সাবেক অনেক সদস্য ছিল, যাদের অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা ছিল।

জার্মানির সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে অভিজাত স্পেশাল ইউনিটের সদস্যরাও এতে ছিল।

অপরাধ এবং ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব

সরকারি তথ্যে দেখা যায় রাইশবুর্গার এবং একই ধরনের মতবাদে বিশ্বাসী আরেকটি গোষ্ঠী সেলবস্টভারওয়াল্টার মিলে ২০২১ সালে ১০০০-এরও বেশি উগ্রপন্থী অপরাধমূলক কর্মকান্ড করেছে। এই সংখ্যাটি ২০২০ সালের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি।

রাইশবুর্গারের সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন ২১,০০০ লোকের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশকে মনে করা হয় উগ্র-ডানপন্থী এবং ১০ শতাংশের মধ্যে সহিংস প্রবণতা রয়েছে বলে মনে করা হয়।

এদের সাথে জার্মান সামরিক বাহিনীরও সম্পর্ক রয়েছে। বলছেন মিরো ডিট্রিখ - যিনি এই গ্রুপটিসহ ষড়যন্ত্র-তত্ত্বে বিশ্বাসী গ্রুপগুলোর ওপর নজর রাখেন এবং এ ক্ষেত্রে তিনি একজন বিশেষজ্ঞ।

মি ডিট্রিখের ধারণা - করোনাভাইরাস মহামারির সময় এই গ্রুপটি আরো বেশি উগ্রপন্থী হয়ে উঠেছে এবং তাদের সমর্থনও বেড়েছে।

"অনেক মানুষের জন্যই মহামারির দিনগুলো ছিল এক কঠিন পর্ব," বলছেন তিনি - "কী ঘটতে যাচ্ছে তার কোন স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল না -ওই সময়টায় ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো অনেক লোকের কাছেই আকর্ষণীয় ছিল কারণ এতে পৃথিবীতে কেন-কীভাবে কী হচ্ছে - তার একটা ধারণা তারা পাচ্ছিল। "

কোভিড মহামারির সময়টায় টিকা-বিরোধী এবং কোভিড অস্বীকারকারীদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করেছিল রাইশবুর্গার। তাদের সাথে গত কয়েক বছরে কিউঅ্যানন সমর্থকরাও ছিল।

বার্লিনে ২০২০ সালের আগস্ট মাসে কোভিড বিক্ষোভকারীদের একটি দল যখন জার্মান পার্লামেন্ট বুন্ডেস্টাগ ভবনে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে, তখনও তাদের সাথে কিউঅ্যাননের লোকেরা ছিল।

আধুনিক যুগের ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থান?

বিবিসির 'ডিসইনফরমেশন অ্যান্ড সোশ্যাল মিডিয়া' সংক্রান্ত বিশ্লেষক ম্যারিয়ারা স্প্রিং বলছেন, রাইশবুর্গার গোষ্ঠীটি কোভিড মহামারির আগে থেকেই জার্মানিতে ছিল, কিন্তু সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা থেকে বোঝা যায় তাদের ভেতরে উগ্রপন্থী প্রবণতা বাড়ছে।

গত এপ্রিল মাসে এই গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত একটি চক্র জার্মানির স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অপহরণের পরিকল্পনার করে - এ কথা জানা যাবার পরই নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।

তখনই আন্দাজ পাওয়া যায় যে কোভিড-১৯ ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী গোষ্ঠীগুলোর সাথে এদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে।

এসব তত্ত্বে বিশ্বাসীরা মনে করে যে কোভিড টিকা হচ্ছে একটি অশুভ পরিকল্পনার অংশ যার লক্ষ্য বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা।

এদের পোস্টে যেমন দেখা যায় ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভুয়া তথ্য প্রচার - তেমনি দেখা যায় কিউঅ্যাননের কথা - যেটি হচ্ছে একটি আমেরিকান ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং তারা ৬ই জানুয়ারির ক্যাপিটল হিল দাঙ্গার সাথে সম্পর্কিত।

ষড়যন্ত্র-তত্ত্বগুলো জার্মান সমাজের ভেতরে কীভাবে ঢুকলো

এ নিয়ে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে - জার্মান সমাজের এত গভীর পর্যন্ত কীভাবে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো ঢুকতে পেরেছে - বিশেষ করে করোনাভাইরাস মহামারির সময়।

বিবিসির বার্লিন সংবাদদাতা জেনি হিল বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে জার্মানিতে বিভিন্ন বিক্ষোভের ওপর রিপোর্ট করার সময় তিনি নিজেই এটা দেখেছেন।

বহু লোক তাকে বলেছেন তারা বিশ্বাস করে যে কোভিড টিকা আসলে একরকম বিষ। অন্য অনেকে বলেছেন, তারা বিশ্বাস করেন যে জার্মান সরকার 'স্বদেশী বাসিন্দা'দের অপসারণ করে 'বিদেশীদের' দিয়ে সেই স্থান পূরণ করার পরিকল্পনা করেছে।

গত সপ্তাহেই জ্বালানির উচ্চ মূল্যের বিরুদ্ধে ডাকা একটি ছোট আকারের প্রতিবাদ সমাবেশে এক ব্যক্তি বললেন, জার্মানির পররাষ্ট্র এবং অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রীরা নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ যা নিয়ে চিন্তিত তা হলো - এসব থেকে এখন বেশ ঘন ঘন সহিংস ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।

সব ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকই যে সহিংস বিপদের কারণ তা নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু বহু রাজনীতিবিদই এখন হত্যার হুমকি পাচ্ছেন। অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন যে কীভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ানোকে থামানো যায়।

সেদিক থেকে বলতেই হবে যে রাইশবুর্গারের আস্তানাগুলোতে পুলিশী অভিযান এবং গ্রেফতারের খবর পুরো জার্মানির জন্যই গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।