টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২২: অস্ট্রেলিয়ায় সব সময় সফল আফগান স্পিনার রশীদ খান

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, রায়হান মাসুদ
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
রশীদ খান নিঃসন্দেহে টি-টোয়েন্টি যুগের সেরা বোলারদের একজন, যিনি আবার আফগানিস্তানের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনও বটে।
ভারতে এতো এতো ক্রিকেটার থাকা স্বত্ত্বেও আফগানিস্তানের এই ক্রিকেটারকে দলে পেতে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো লড়াই করে নিলামে।
অনেক দল আবার নিলামে ওঠার আগেই রশীদ খানকে দলে নিয়ে নেয়, যেমনটা নিয়েছে এবারে গুজরাট টাইটান্স। চলতি বছরের আইপিএলে চ্যাম্পিয়নও হয়েছে এই দলটি।
আর রশীদ খান ছিলেন আইপিএলের টপ পারফরমারদের একজন।
কেবল ভারতেই না, বিশ্বজুড়ে টি-টোয়েন্টি লিগগুলোতে তুমুল চাহিদা রয়েছে রশীদ খানের।
অস্ট্রেলিয়ায় রশীদ খান
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেরই অন্যতম সফল এই বোলার অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া লিগ, বিগ ব্যাশেও নিজেকে সেরাদের কাতারে তুলে নিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় তুমুল জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের একজন রশীদ খান বিগ ব্যাশে এতটাই প্রভাব ফেলেছেন যে এই বছর তার দল অ্যাডেলেইড স্ট্রাইকার্সের কোচ জেসন গিলেস্পি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আফগান ক্রিকেটারকে দলে ধরে রাখতে সম্ভাব্য সবই করবেন তারা।

ছবির উৎস, Getty Images
ক্রিকেট নিয়ে রশীদ খানের মতামতও অস্ট্রেলিয়ায় বেশ গুরুত্ব পায়।
বিগ ব্যাশ একটা লম্বা সময় ধরে হওয়ার কারণে অনেক ক্রিকেটারই পুরোটা সময় ধরে খেলতে পারেন না। এবারের বিগ ব্যাশে খেলতে গিয়ে রশীদ খান দাবি তুলেছেন যে বিগ ব্যাশের সময় যাতে কমিয়ে আনা হয়।
রশীদের হাত ধরে আফগানিস্তানের তরুণ স্পিনার কায়েস আহমেদও বিগ ব্যাশে দল পেয়েছেন।
এই তারকা চান আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানরাও যাতে আরও বেশি সুযোগ পায় অস্ট্রেলিয়ায় খেলার ব্যাপারে।
আফগানিস্তানের একজন ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়ার সেরা একটি টুর্নামেন্টে যে গুরুত্ব পাচ্ছেন, এর পুরোটাই তিনি নিজের সামর্থ্য ও খেলা দিয়ে আদায় করে নিয়েছেন।
বিগ ব্যাশের সপ্তম ও অষ্টম আসরে রশীদ খান ছিলেন অ্যাডেলেইড স্ট্রাইকার্সের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী। দুই মৌসুমেই তিনি ক্লাবটির সবচেয়ে ভ্যালুয়েবল ক্রিকেটারের পুরস্কার পেয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় ওভার প্রতি ৬-এর সামান্য বেশি রান দিয়েছেন রশীদ খান।
ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফোর বিগ ব্যাশ টি-টোয়েন্টি লিগের সর্বকালের সেরা একাদশে একমাত্র নন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার হিসেবে জায়গাও করে নিয়েছেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
বিশ্লেষকরা মনে করেন যে রশীদ খান ব্যাটসম্যানদের মনে ভীতি ঢুকিয়ে দিতে সফল হয়েছেন। ফলে, ২০২২ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রশীদ খানকে খুব বেশি চার-ছয় হজম করতে হয়নি।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান ক্রিস গেইল মনে করেন, রশীদ খানের চেয়ে ভালো লেগস্পিনার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এখন কেউই নেই।
রশীদ খান অন্যদের চেয়ে কেন আলাদা
আফগানিস্তান দলের অধিনায়ক মোহাম্মদ নবীর মতে, রশীদ খান আগ্রাসী এবং সবসময় উইকেট নেয়ার চিন্তায় থাকেন - যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রশীদ বলেন, "আমার হাতে যেসব অস্ত্র আছে এবং আমি যা পারি, তার ওপর আমার ভরসা আছে। এটাই আমাকে বাড়তি শক্তি যোগায়।"
"ব্যাটসম্যানের সাথে একটা মানসিক যুদ্ধ থাকে। তাতে যদি আপনি আগেই হেরে বসে থাকেন, তাহলে ব্যাটসম্যান আপনার বলে শট মারবেই।"
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের গত দশকের সেরা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটারের পুরস্কার পেয়েছিলেন রশীদ খান।
এসব স্বীকৃতি তাকে আনন্দ দেয়, বলছেন রশীদ।
"ছয় থেকে সাত বছর আগে আমরা তো ক্রিকেটই খেলতে পারতাম না। কোন দেশ খেলবে আমরা কোন দেশে খেলবো জানতাম না। এখন খেলছি আমরা এবং প্রমাণ করছি যে আমরা পারি।"
"আমাদের কোনও ধারণাই ছিল না যে ক্রিকেট দিয়ে কত দূর যাওয়া সম্ভব।"
আইসিসিকে দেয়া ওই সাক্ষাৎকারে রশীদ আরও বলেন, "আমরা তো আফগানিস্তানে কোনও আনন্দের উপলক্ষ্যই দেখতাম না। আমি যখন উইকেট নিই, তখন অনেক মানুষ খুশি হয়। অনেক মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছি, এটা আমার জন্য সত্যিই অনেক বড় ব্যাপার।"

ছবির উৎস, Getty Images
আফগানিস্তানের কোচ ল্যান্স ক্লুজনার রশীদ খানের প্রসংশায় পঞ্চমুখ।
"রশীদ খানের মতো কেউ যখন বিশ্বব্যাপী ক্রিকেট খেলার জন্য ডাক পান, তখন তিনি মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।"
ওয়েস্ট ইন্ডিজের তারকা ক্রিস গেইলের মতে, রশীদ খান ব্যাট হাতেও ভালো করছেন।
বিগ ব্যাশের পরিসংখ্যানও অবশ্য তাই বলছে। লোয়ার অর্ডারে ব্যাট করতে নেমে রশীদ এখন পর্যন্ত ২৫৩ রান করেছেন। এই রানগুলো তিনি তুলেছেন খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে - যখন কম বলে বেশি রান করা প্রয়োজন।
চলতি বিশ্বকাপে যেসব ক্রিকেটারদের ওপর নজর রাখতে পারেন
বেশ কটি ম্যাচ তিনি দলকে ব্যাট হাতে জিতিয়েছেনও।
অনেক মাঠেই রশীদ খানকে খেলা কঠিন। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে রশীদ খান আরও বেশি সফল।
তার পরিসংখ্যান বিশ্বকাপে তার হয়ে কথা বলবে - যদিও বেশ কঠিন এক গ্রুপে পড়েছে আফগানিস্তান। ওই গ্রুপে রয়েছে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া, আছে অন্যতম ফেভারিট ইংল্যান্ড, আর আছে নিউজিল্যান্ড।
অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগে ৬১ ম্যাচ খেলে ৯২ উইকেট নিয়েছেন রশীদ খান।

ছবির উৎস, Getty Images
রশীদ খান এবং আইপিএল
২০১৭ সালে আইপিএলের দল সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ রশীদ খানকে ৬ লাখ ডলারের বিনিময়ে দলে নিয়েছিল।
সেই বছরেই তিনি হায়দ্রাবাদের আইপিএল জয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন।
ছয় বছর পর রশীদ খান আরও ক্ষুরধার, আরও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।
ক্রিকেট বিষয়ক ম্যাগাজিন দ্য ক্রিকেট মান্থলিকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে রশীদ খান বলেন, "আমি দ্রুত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে পারি। এজন্য আমি অনেক দেশেই সফল হয়েছি।"
আফগান এই তরুন স্পিনার মনে করেন চাপ সবসময়ই থাকবে, তবে সেই চাপকে দক্ষতা দিয়ে সামাল দেন।
"আমি চ্যালেঞ্জ ভালোবাসি। আমি আফগানিস্তানে ছিলাম কিছুদিন, পাকিস্তানে ছিলাম কিছুদিন। ছোটবেলাটা আমার খুব একটা ভালো কাটেনি। কিন্তু ওই সময়ে খেলা ক্রিকেটটাই আমার জীবনে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা।"








