সৌরভ গাঙ্গুলি : বিজেপিতে যোগ দিলেন না বলেই কি বোর্ড সভাপতির পদ হারাতে হল?

সৌরভ গাঙ্গুলি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সৌরভ গাঙ্গুলি
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

সৌরভ গাঙ্গুলি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিসিআই-য়ের প্রেসিডেন্ট পদে আর থাকছেন না, এটা স্পষ্ট হয়ে যেতেই সেই সিদ্ধান্তকে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক।

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা দাবি তুলেছেন, বিজেপিতে যোগদান না-করার জন্যই সৌরভ গাঙ্গুলিকে বোর্ড প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল কি না, ওই দলটিকে তার জবাব দিতে হবে।

বিজেপির পক্ষ থেকে অবশ্য বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ''প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত'' বলেই দাবি করা হচ্ছে।

তবে ভারতের ক্রিকেট প্রশাসনকে যারা বহুদিন ধরে চেনেন তারা অনেকেই বলছেন ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক আছেই - আর সৌরভ গাঙ্গুলিও সব জেনেবুঝেই তাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

বস্তুত প্রায় তিন বছর বোর্ড প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর সৌরভ গাঙ্গুলি যে আর ওই পদে থাকছেন না, ইতিমধ্যেই তা স্পষ্ট হয়ে গেছে বোর্ডের ভাইস-প্রেসিডেন্ট রাজীব শুক্লার কথাতেই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র সঙ্গে সৌরভ গাঙ্গুলি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র সঙ্গে সৌরভ গাঙ্গুলি

মি শুক্লা জানিয়েছেন, আগামী ১৮ অক্টোবরের নির্বাচনে সভাপতি পদে মনোনয়ন জমা পড়েছে মাত্র একটিই, সেটি সাবেক অলরাউন্ডার রজার বিনির - ফলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই নির্বাচিত হবেন ।

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও ধনী এই ক্রিকেট বোর্ডের সচিব পদেও থেকে যাবেন জেয় শাহ, যিনি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পুত্র।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন :

'দাদার পাশে' তৃণমূল

এরপরই তৃণমূল কংগ্রেসের সিনিয়র এমপি শান্তনু সেন ''দাদার পাশে থাকার'' বার্তা দিয়ে টুইট করেন, সৌরভ গাঙ্গুলি বিজেপিতে যোগ দেননি বলেই কি তার ওপর এই কোপ পড়ল? (সৌরভ গাঙ্গুলিকে ভারতে অনেকেই ''দাদা'' নামে চেনেন।)

Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post

সৌরভ গাঙ্গুলিকে সরে দাঁড়াতে হলেও অমিত শাহ-র ছেলে কীভাবে বোর্ডের পদে রয়ে গেলেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

সৌরভ গাঙ্গুলি যে কোনও সময় বিজেপিতে যোগ দেবেন, লাগাতার এই প্রচার করে যাওয়ার পর এখন কেন তাকে সরানো হল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন কলকাতায় তৃণমূলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষও।

সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, "একটা সময় তারা এই প্রচারের জোয়ার বইয়ে দিয়েছিলেন, এখন প্রচারের ভাঁটার সময়েও উত্তর তো তাদেরই দিতে হবে।"

"বিজেপিতে যোগ দিলেন না বলেই কি সৌরভকে আর রাখা হল না? অথচ বিজেপি নেতার ছেলে দিব্বি নিজের পদে রয়ে গেলেন - এটা নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ আর জল্পনা যে তৈরি হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই," বলেন কুনাল ঘোষ।

তৃণমূলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তৃণমূলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ

তৃণমূল এ বিষয়ে 'সরাসরি কোনও মন্তব্য' না-করলেও বিজেপির কাছে যে কৈফিয়ত দাবি করছে - সেটাও খোলাখুলি জানান দলের ওই মুখপাত্র।

'প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত'

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেত্রী ও এমএলএ অগ্নিমিত্রা পাল আবার পাল্টা বলছেন, রাজ্যের ক্রীড়া প্রশাসনে তৃণমূল যেভাবে দলীয় লোকজন ঢুকিয়েছে তাদের মুখে এসব কথা মানায় না।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, "খেলাধুলো থেকে শিক্ষা, যারা রাজ্যের সব কিছুতে রাজনীতি ঢোকায় তাদের কাছ থেকে অন্য কী আর আশা করা যায়?"

"দিদিমণির দাদা, ভাই, বোন, ভাগ্নে, ভাইঝিদেরই এ রাজ্যে ক্রিকেট থেকে ফুটবল, লুডো থেকে বাগাডুলি - সব খেলার ফেডারেশনের মাথায় বসানো হয়েছে," মন্তব্য করেন তিনি।

বোর্ডের সচিব পদে থেকে যাচ্ছেন জেয় শাহ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বোর্ডের সচিব পদে থেকে যাচ্ছেন জেয় শাহ

তবে ঘটনা হল, ভারতের ক্রিকেট বোর্ডেও নতুন কমিটির বহু সদস্যই বিজেপির প্রভাবশালী নেতা। গত মাসে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনেও নতুন সভাপতি হয়েছেন কল্যাণ চৌবে, তিনিও বিজেপির নেতা।

মিস পালকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে ক্রিকেট বা ফুটবলে বিজেপিও তো ঠিক একই জিনিস করছে?

অগ্নিমিত্রা পাল জবাবে বলেন, "দুটোকে কীভাবে মেশানো সম্ভব? সৌরভ গাঙ্গুলির সরে যাওয়াটা একটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, মেয়াদ শেষ হলে তার জায়গায় অন্য কেউ আসবেন - এই তো ব্যাপার!"

ভারতীয় বোর্ডে পর পর দুটো মেয়াদে কারও প্রেসিডেন্ট হওয়ার নজির নেই, কেউ কেউ একাধিকবার প্রেসিডেন্ট হলেও তার মাঝে কয়েক বছরের ব্যবধান ছিল - সেটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন তিনি।

"আর জেয় শাহ-কে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, এটা তো দেখছেন না যে রাজীব শুক্লা ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে রয়ে যাচ্ছেন - তিনি তো কংগ্রেস করেন!" বলছিলেন অগ্নিমিত্রা পাল।

বিজেপি নেত্রী ও বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিজেপি নেত্রী ও বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল

সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে অমিত শাহ কিংবা মমতা ব্যানার্জি, এমন কী সিপিআইএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা অশোক ভট্টাচার্যরও যেহেতু ব্যক্তিগত পর্যায়ে খুব ভাল সম্পর্ক - তাই ক্রিকেট বোর্ডে তার ভূমিকাকে রাজনীতির প্রিজম দিয়ে দেখা উচিত নয় বলেও দাবি করছেন ওই বিজেপি নেত্রী।

'রাজনীতি পুরোটাই'

তিন বছর আগে বোর্ড সভাপতির পদে সৌরভ গাঙ্গুলির নিয়োগে রাজনীতির কতটা ভূমিকা ছিল তা নিয়ে চর্চা হয়েছে বিস্তর।

সেবার কর্নাটকের ক্রিকেটার ব্রিজেশ প্যাটেলের প্রেসিডেন্ট হওয়া একরকম চূড়ান্ত হয়ে গেলেও একেবারে শেষ মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে সেই পদ ছিনিয়ে নেন সৌরভ গাঙ্গুলি। তার টিমে সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন জেয় শাহ।

পশ্চিমবঙ্গে ২০২১র বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েই তিনি বোর্ড প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছেন, ভারতের প্রায় সব প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমেই তখন এধরনের লেখালেখি হয়েছিল।

শারদ পাওয়ার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শারদ পাওয়ার

বোর্ডের বহু পদে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব সামলেছেন ক্রিকেট কর্মকর্তা বিশ্বরূপ দে, তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বিগত প্রায় তিন দশক ধরে রাজনীতিই কিন্তু ভারতের ক্রিকেট বোর্ডকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে।

বিশ্বরূপ দে-র কথায়, "আগেও অল্পস্বল্প হয়তো ছিল, কিন্তু শারদ পাওয়ার যখন বোর্ড প্রেসিডেন্ট হন তখন থেকেই আসলে বোর্ডের একশোভাগ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে।"

"পাওয়ারের সঙ্গে ক্রিকেটের কোনও সম্পর্কই ছিল না, কিন্তু তাকে প্রেসিডেন্ট বানাতে উঠেপড়ে লাগে এই বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম - সব দল!

"আজ সিপিএম বড় বড় কথা বলে, তাদের সর্বোচ্চ নেতারাও কিন্তু সেদিন নিজেদের ত্রিপুরার ভোট শারদ পাওয়ারকে দিতে পণ করেছিলেন। সোনিয়া গান্ধী বলেছিলেন কংগ্রেস-নিয়ন্ত্রিত সব রাজ্যের ভোট যেন পাওয়ার-ই পান," জানান মি. দে।

বোর্ডের বৈঠকে যোগ দিতে মুম্বাইতে সৌরভ গাঙ্গুলি, অরুণ ধূমল ও জেয় শাহ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বোর্ডের বৈঠকে যোগ দিতে মুম্বাইতে সৌরভ গাঙ্গুলি, অরুণ ধূমল ও জেয় শাহ

তখন থেকেই ভারতীয় বোর্ডে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের এই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে এবং কেন্দ্রে যে দল যখন ক্ষমতায় থেকেছে, তাদের 'নমিনি'রাই বোর্ডে ছড়ি ঘুরিয়েছে।

ফলে এখন বোর্ড থেকে সৌরভ গাঙ্গুলির বিদায়কেও রাজনীতির ওঠাপড়ার অংশ হিসেবেই দেখতে চান বিশ্বরূপ দে।

"দেখুন, তিনি যখন সিএবি-র (ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল) সভাপতি হন, তখনও কিন্তু জগমোহন ডালমিয়ার মৃত্যুর বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে নবান্নতে গিয়ে মমতা ব্যানার্জিকে রাজি করিয়ে ফেলেছিলেন। সেটাও তো রাজনীতিই ছিল, তাই না?"

মি. দে বলেন, "নবান্ন থেকে সিএবি প্রেসিডেন্টের নাম ঘোষণা হচ্ছে, এ জিনিস তো আগে কখনো হয়নি। নরেন্দ্র মোদী যদি বিসিসিআই সভাপতির নাম ঘোষণা করেন, তাহলে যা হবে - এটাও তাই।"

অতএব সৌরভ গাঙ্গুলিকে তিনি রাজনীতির ''ভিক্টিম'' বা ''শিকার'' বলে মানতে রাজি নন।

কলকাতায় গত মাসে একটি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে সৌরভ গাঙ্গুলি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কলকাতায় গত মাসে একটি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে সৌরভ গাঙ্গুলি

"তিনি জেনেবুঝেই রাজনীতি করেছেন। আর কে না জানে রাজনীতিতে গোলাপও থাকে, কাঁটাও থাকে - আগে দু'দু'বার গোলাপের মালা পরলেও এবারে তাকে কাঁটার খোঁচা খেতে হল, আমি বিষয়টাকে সেভাবেই দেখি," বলছিলেন বর্ষীয়ান ওই ক্রিকেট কর্মকর্তা।

গোটা বিতর্ক নিয়ে সৌরভ গাঙ্গুলি নিজে এখনও কোনও মন্তব্য করেননি, সোশ্যাল মিডিয়াতেও কিছু লেখেননি।

তবে তার ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট পদের বদলে তাকে আইপিএল চেয়ারম্যান হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল - যা তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন।