নরেন্দ্র মোদী : প্রধানমন্ত্রীর চিতা প্রোজেক্ট নিয়ে বিদ্রূপ করায় অ্যাক্টিভিস্টের হেনস্থা

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ভারতে গত মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনে রীতিমতো ঘটা করে শুরু হওয়া ''প্রোজেক্ট চিতা'' নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করার অভিযোগে কর্নাটকের একজন অ্যাক্টিভিস্টকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
সুনীল বাজিলাকেরি নামে ওই ব্যক্তি অবশ্য চব্বিশ ঘন্টার মাথায় জামিন পেয়ে গেছেন এবং জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি বিবিসিকে বলেছেন দেশের বিজেপি সরকারের সঙ্গে যে তালেবানের কোনও পার্থক্য নেই এই ঘটনাতেই তা প্রমাণিত।
ভারতের অন্যান্য প্রান্তেও অ্যাক্টিভিস্টরা জানাচ্ছেন, সরকার বা প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে কেউ টিটকিরি বা সমালোচনা করলেই তাকে নানাভাবে ভয় দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে এবং এই সব গ্রেপ্তারি তারই অংশ।
আরও পড়তে পারেন :
কী বলেছিলেন বাজিলাকেরি?
কর্নাটকের ম্যাঙ্গালোরে সমাজকর্মী সুনীল বাজিলাকেরি এককালে সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, কিন্তু বেশ কিছুকাল ধরে তিনি কেন্দ্রে ও রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপির একজন কট্টর সমালোচক হিসেবেই পরিচিত।

ছবির উৎস, Sunil Bajilakeri/Facebook
সম্প্রতি নামিবিয়া থেকে আটটি আফ্রিকান চিতা ভারতে নিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে 'প্রোজেক্ট চিতা'র সূচনা করেছেন, সোশ্যাল মিডিয়াতে তা নিয়েই ব্যঙ্গ করেছিলেন মি. বাজিলাকেরি।
তার ফেসবুক পোস্টে সাবেকি পোশাক পরিহিত একজন গর্ভবতী মহিলার মুখে চিতার ছবি সুপারইম্পোজ করে তিনি নিচে ক্যাপশন দিয়েছিলেন, ''নামিবিয়ার চিতাদের জন্য কবে বেবিশাওয়ার বা সাধ দেওয়া হচ্ছে জানতে পারি কি?''
এই পোস্টটিকে ''অবমাননাজনক'' বলে বর্ণনা করে শুক্রবার পুলিশ তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় - একরাত হাজতবাসের পর তাকে আদালতে পেশ করা হলে শনিবার সন্ধ্যায় তিনি জামিন পান।
ম্যাঙ্গালোর থেকে আজ তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "আমি আপাতত মুক্তি পেয়েছি শুধুমাত্র দেশের সংবিধানের জন্য - যেটি সৃষ্টি হয়েছিল বাবাসাহেব আম্বেদকরের হাতে, আর তিনি ছিলেন একজন দলিত।"
"আমি আশা করি আদালতের কাছ থেকেও শেষ পর্যন্ত সুবিচার পাব।"

ছবির উৎস, Getty Images
"তবে এখনকার মতো এটুকুই বলার - যে কারণে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাতে বোঝাই যাচ্ছে আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে আমাদের দেশের শাসকদের কোনও পার্থক্য নেই।"
'মোদীকে অপমান করলে মানা সম্ভব নয়'
এর আগে গত বছর মণিপুরে সোশ্যাল মিডিয়াতে বিতর্কিত পোস্ট করে প্রায় আড়াই মাস জেলে কাটাতে হয়েছিল অ্যাক্টিভিস্ট ইরেন্দ্রো লেইচোমবাম ও সাংবাদিক কিশোরচন্দ্র ওয়ংখেমকে-ও।
রাজ্যের একজন শীর্ষ বিজেপি নেতা কোভিডে মারা যাওয়ার পর তারা ফেসবুকে লিখেছিলেন, "গোমূত্র বা গোবর - কিছুই তাহলে ওনাকে বাঁচাতে পারল না?"
বিজেপি-শাসিত মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং তখন বলেছিলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতারও একটা সীমা আছে, আর সেই সীমা লঙ্ঘন করার জন্যই তারা গ্রেপ্তার হয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি ছিল, "আমাদের গণতান্ত্রিক দেশে সবারই সমালোচনা করার, যা খুশি বলার স্বাধীনতা আছে - সংবিধানের আর্টিকল ১৯ তাদের সেই অধিকার দিয়েছে।"
"কিন্তু মনে রাখা দরকার, ওই একই আর্টিকলের ২ নম্বর ধারা তার ওপর কিছু বিধিনিষেধও দিয়েছে।"
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images
"ব্যক্তিগতভাবে কেউ আমার সমালোচনা করলে আমার কিছু যায় আসে না, ওটা আমি সহ্য করে নিই - কিন্তু আমার নেতাকে বা জাতীয় নায়কদের অপমান করলে সেটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।"
"ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ বা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীরা এই গোত্রে পড়েন, এখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রযোজ্য হতে পারে না!", বলেছিলেন এন বীরেন সিং।
'এরা ইয়ার্কিকেও ভয় পায়'
পশ্চিমবঙ্গে ''নো ভোট টু বিজেপি'' ক্যাম্পেনের অন্যতম প্রধান মুখ, ফিল্মমেকার কস্তুরী বসুও মনে করেন সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের সমালোচকদের ভয় দেখানোটাই এখন দস্তুর হয়ে উঠেছে।
তিনি বলছিলেন, "এই যেমন ধরুন কদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী মহাধূমধামে বন্দে ভারত এক্সপ্রেস নামে একটা সুপারফাস্ট ট্রেন চালু করলেন। কিন্তু সঙ্গে এটাও বলা হল, এই ট্রেন নিয়ে কেউ যেন ইয়ার্কি-ফাজলামি না-করে।"
"এরপর আমরা কী দেখলাম? মোষের গুঁতোয় ট্রেনের সামনেটা ভেঙে গেল, তারপর গরুর গুঁতোয় ইঞ্জিন বিগড়োল, তারপর একদিন চাকা বসে গেল - এক সপ্তাহের ভেতর তিন-তিনবার!"

ছবির উৎস, Getty Images
"ফলে বোঝাই যাচ্ছে ভালমতো প্রস্তুতি না-নিয়ে তাড়াহুড়ো করে একটা ট্রেন নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটা নিয়ে কোনও রসিকতা পর্যন্ত করা যাবে না, কিছু বলা যাবে না - ভাবা যায়?"
কস্তুরী বসু মনে করেন, এই সমালোচকদের সরকার যেভাবে হেনস্থা করছে বা গ্রেপ্তার পর্যন্ত করছে সেটা তাদের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগারই বহি:প্রকাশ।
"নইলে ধরুন একজন সাধারণ নাগরিক, তিনি কোনও বিরাট ইনফ্লুয়েন্সার পর্যন্ত নন যে তার হাজার হাজার হাজার ফলোয়ার আছে, তারও একটা পোস্ট পর্যন্ত এই সরকার সহ্য করতে পারছে না", বলছিলেন তিনি।
তবে ঘটনা হল, ভারতে এই কাজ শুধু বিজেপি একাই করছে না।
তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি, তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও কিংবা এনসিপি-র প্রবীণ নেতা শারদ পাওয়ারের সমালোচনা করার জন্য তাদের দলের সরকারও অভিযুক্তদের ঢালাওভাবে আটক করছে - এমন দৃষ্টান্তও আছে প্রচুর।








