আরব ইসরায়েল সম্পর্ক: আমিরাতের সঙ্গে বাণিজ্য যেভাবে হু হু করে বাড়ছে

তেল আবিব স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং ফ্লোরে ইসরায়েলে নিযুক্ত ইউএই'র রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আল খাজা (ডানে), তেল আবিব স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান ইটাই বেন-জিভ (মাঝে) এবং আবুধাবি গ্লোবাল মার্কেটের চেয়ারম্যান আহমেদ আল জাউবি (বামে)।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, তেল আবিব স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং ফ্লোরে ইসরায়েলে নিযুক্ত ইউএই'র রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আল খাজা (ডানে), তেল আবিব স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান ইটাই বেন-জিভ (মাঝে) এবং আবুধাবি গ্লোবাল মার্কেটের চেয়ারম্যান আহমেদ আল জাউবি (বামে)।
    • Author, নাটালি লিসবোনা
    • Role, বিজনেস রিপোর্টার

তেল আভিভ স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরু হয় যে ঘণ্টা বাজিয়ে, মোহাম্মদ আল খাজা সেটির বোতাম চাপলেন, তারপর ঝকঝকে কাঁচে ঘেরা ভবনটির ভেতর ঝরে পড়তে শুরু করলো হার্টের আকৃতির সোনালি কাগজ।

মি. আল খাজা ইসরায়েলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত। তিনি যখন তেল আবিব স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান ইটাই বেন-জিভ এবং আবুধাবি গ্লোবাল মার্কেটের চেয়ারম্যান আহমেদ আল জাউবির সঙ্গে করমর্দন করলেন, চারদিক থেকে উল্লাস শোনা গেল।

এটিকে ইসরায়েলের প্রধান স্টক মার্কেটের কোন গতানুগতিক দিনের লেন-দেনের শুরু বলে চিত্রিত করা ভুল হবে। বরং এটিকে বলা যেতে পারে ইসরায়েল এবং ইউএই'র মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠছে, সেটির আরও একটি মাইলফলক।

এই দুই দেশের মধ্যে দু'বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এক ঐতিহাসিক আব্রাহাম চুক্তি সই হয়েছিল, যাতে যোগ দিয়েছিল আরেকটি উপসাগরীয় দেশ বাহরাইনও।

এই চুক্তি অনুযায়ী ইউএই এবং বাহরাইন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজী হয়েছিল এবং দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে স্থাপিত হয়েছিল। বহু দশক ধরে ইসরায়েলকে বয়কটের যে নীতি এই উপসাগরীয় দেশগুলো অনুসরণ করতো, এই চুক্তির মাধ্যমে তার অবসান ঘটলো।

ইসরায়েল সফরে যাওয়া ইউএই'র প্রতিনিধিদলের একজন ছিলেন আমিরাতি বিনিয়োগকারী সাবাহ আল-বিনালি। তেল আবিবে যখন তিনি এই অনুষ্ঠান দেখছিলেন, তখন তার মুখ হাসিতে উজ্জ্বল। তিনি একটি ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড 'আওয়ারক্রাউড আরাবিয়ার' নির্বাহী চেয়ারম্যান।

আব্রাহাম চুক্তি সই হয় ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আব্রাহাম চুক্তি সই হয় ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে।

"আমরা এখন যা দেখছি, তা ইতিহাস হয়ে থাকবে, মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রাকৃতিক প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আমরা এক দীর্ঘ, গভীর এবং ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে উঠতে দেখছি" বলছিলেন তিনি।

মি. আল-বিনালি মনে করেন, ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে এই ক্রমবর্ধমান ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে সবাই লাভবান হবে।

আরও পড়তে পারেন:

"ইসরায়েলি এবং আমিরাতি ব্যবসা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে এক ধরণের স্বাভাবিক সমন্বয় আছে। আমাদের এই সহযোগিতা থেকে যে ধরণের ফল আশা করা হচ্ছে, তার চেয়েও অনেক বেশি হবে বলে আমি মনে করি।"

"এখন আমরা লজিস্টিকস, চিকিৎসা প্রযুক্তি, কৃষি প্রযুক্তি এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো ক্ষেত্রে যৌথ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি। এরকম কিছু বিষয়ে কাজ এরই মধ্যে বেশ এগিয়ে গেছে।"

মি.আল-বিনালি আরও বলছেন, গত মাসের সফরের পর আরও কিছু ব্যবসায়িক চুক্তির ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আব্রাহাম চুক্তির কারণে ইসরায়েল এবং ইউএই'র মধ্যে বাণিজ্য যে বহুগুণ বাড়বে, সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা একমত। ইসরায়েলের প্রযুক্তি খাত খুবই শক্তিশালী, এর পাশাপাশি সামরিক প্রযুক্তিতেও তারা এগিয়ে। ইউএই আবার উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি আরবের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। তাদের অর্থনীতির মূল শক্তি এখনো তেল বেচা অর্থ, কিন্তু তারা এখন অর্থনীতির বহুমুখীকরণের চেষ্টা করছে।

কেতকি শর্মা হচ্ছেন দুবাইর একটি ডেটা এবং অর্থনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যালগরিদম রিসার্চের প্রধান নির্বাহী। দুবাই হচ্ছে যে সাতটি আমিরাত নিয়ে ইউএই গঠিত, তার একটি।

কেতকি শর্মার ধারণা ইসরায়েল এবং ইউএই‌‌‌‌র মধ্যে বাণিজ্য বহুগুণ বাড়বে

ছবির উৎস, KETAKI SHARMA

ছবির ক্যাপশান, কেতকি শর্মার ধারণা ইসরায়েল এবং ইউএই‌‌‌‌র মধ্যে বাণিজ্য বহুগুণ বাড়বে

তাঁর বিশ্বাস, ইসরায়েল এবং ইউএই'র মধ্যে বাণিজ্য আগামী পাঁচ বছরে দশ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

"এই চুক্তি হয়েছিল ২০২০ সালে এবং এরই মধ্যে এটি ইসরায়েল এবং ইউএই'র মধ্যে বাণিজ্য অনেক বাড়িয়েছে", বলছেন তিনি।

কেতকি শর্মা জাতিসংঘের পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন, ২০২০ সাল হতে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল থেকে ইউএই'তে রপ্তানি ৭৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৮৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ইউএই থেকে ইসরায়েলে রপ্তানি ১১৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩২ মিলিয়ন ডলারে।

মিজ শর্মা বলেন, দুদেশের মধ্যে যেসব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে তার মধ্যে আছে কৃষি, পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি, সাইবার নিরাপত্তা এবং স্মার্ট নগরীর মতো বিষয়।

"এ বছরের শুরুতে দুদেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও সই হয়েছে, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে যেসব পণ্যের বাণিজ্য হয় সেগুলোর ৯৬ শতাংশের ওপর থেকে শুল্ক উঠে গেছে।"

আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইসরায়েল অস্ত্র বিক্রির নতুন রেকর্ড করেছে, এমন কথাও শোনা যায়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, ২০২১ সালে তাদের অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ ১১৩০ কোটি ডলারে পৌঁছায়, আর এর ৭ শতাংশই ছিল ইউএই এবং বাহরাইনে।

ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোশে ইয়ালোন (২০১৩-২০১৬) বিবিসিকে বলেন, এর কারণ দুই দেশই তাদের অঞ্চলে একই নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে আছে। বিশেষ করে ইরানের কথা উল্লেখ করছেন তিনি।

মোশে ইয়ালোন বলছেন ইসরায়েল এবং ইউএই উভয় দেশই ইরানকে হুমকি মনে করে, এটি তাদের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মোশে ইয়ালোন বলছেন ইসরায়েল এবং ইউএই উভয় দেশই ইরানকে হুমকি মনে করে, এটি তাদের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

"গত দশকে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলো এক অভিন্ন শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে, বিশেষ করে ইরান এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট শক্তির। ফিলিস্তিনি ইস্যুটি যদিও এখনো আছে, এখন আর কোন আরব-ইসরায়েলি সংঘাত নেই", বলছেন তিনি।

তবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের তীব্র নিন্দা করেছে। তারা অভিযোগ করছে, আরব দেশগুলো ফিলিস্তিন ইস্যুতে আসলে ইসরায়েলের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে আরেকটি দেশ মরক্কো ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য একই ধরণের চুক্তি করে। চুক্তি করেছে সুদানও, তবে তাদের চুক্তির অগ্রগতি থমকে আছে।

মি. ইয়ালোন এখন আবুধাবি ভিত্তিক একটি ইসরায়েলি কোম্পানি সাইনাপটেকের চেয়ারম্যান। তিনি মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে এই নতুন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। তবে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে তিনি এর বিস্তারিত জানাতে রাজী নন। তিনি কেবল এটুকুই বললেন, "নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতার একটা উপায় আমরা খুঁজে পেয়েছি।

মি. ইয়ালোন বলছেন, এরকম আরও অনেক সহযোগিতার জায়গা আছে।

"উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা উপলব্ধি করেছেন যে, তাদের তেলের চাইতে আরো বেশি কিছু দরকার, বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তি, মরুভূমিতে করার উপযোগী কৃষি, পানি আহরণ ইত্যাদি। ইসরায়েলে আমরা বেশ সৌভাগ্যবান, কারণ এসব প্রযুক্তি আমরা অর্জন করেছি। কাজেই আমাদের অনেক অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।"

জ্বালানি খাতেও ইসরায়েল এবং ইউএই'র মধ্যে অনেক চুক্তি সই হচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি কোম্পানি নিউমেড এনার্জি (তখন নাম ছিল ডেলেক ড্রিলিং) ঘোষণা করলো যে, তারা ইসরায়েলি উপকুলের তামার গ্যাস ক্ষেত্রের ২২ শতাংশ শেয়ার ইউএই'র কোম্পানি মুবাদালা এনার্জির কাছে একশো কোটি ডলারে বিক্রি করে দেবে।

নিউমেড এনার্জির এমন এক ক্রেতা খুঁজে পাওয়া দরকার ছিল, যারা সরকারের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

"মুবাদালার সঙ্গে যে চুক্তি সই হয় সেটি আমাদের আঞ্চলিক ব্যবসাকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার যে লক্ষ্য নিয়েছি, এটি তারই অংশ," বলছেন নিউমেড এর প্রধান নির্বাহী ইউসি আবু।

মিশরের তেলমন্ত্রী তারেক আল-মোল্লার (ডানে) সঙ্গে নিউমেড এনার্জির প্রধান ইয়োসি আবু (বামে)।

ছবির উৎস, NEWMED ENERGY

ছবির ক্যাপশান, মিশরের তেলমন্ত্রী তারেক আল-মোল্লার (ডানে) সঙ্গে নিউমেড এনার্জির প্রধান ইয়োসি আবু (বামে)।

মাস ওয়াতাদ একজন ফিলিস্তিনি, তবে ইসরায়েলি নাগরিক। তিনি আরবি ভাষার একটি ডায়েটিং অ্যাপ এবং ওয়েবসাইট ডসাটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রেসিডেন্ট।

তিনি তার ব্যবসায়িক অংশীদার টালি জিঙ্গারের সঙ্গে মিলে তাদের ব্যবসা উপসাগরীয় অঞ্চলে সম্প্রসারণ করেছেন, আর এটি সম্ভব হয়েছে আব্রাহাম চুক্তির কারণে।

তিনি দাবি করছেন, এই চুক্তিটি পরিস্থিতি একদম বদলে দিয়েছে, কারণ এখন তিনি এবং তার টিম নিয়মিত ইসরায়েল এবং ইউএই'র মধ্যে ভ্রমণ করতে পারেন। মিস ওয়াতাদ তার পরিবারকে এখন আবু ধাবিতে নিয়ে এসে সেখানেই বসবাস করছেন।

মাস ওয়াতাদ (ডানে) এবং তার ব্যবসায়িক অংশীদার টালি জিঙ্গার (বামে)

ছবির উৎস, MAS WATAD

ছবির ক্যাপশান, মাস ওয়াতাদ (ডানে) এবং তার ব্যবসায়িক অংশীদার টালি জিঙ্গার (বামে)

"ইউএই চায় বেশ কিছু বিষয়ে নেতৃস্থানীয় অবস্থানে থাকতে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা একটি", বলছেন তিনি। আব্রাহাম চুক্তির কারণে তার কোম্পানি এখন পুরো আরব বিশ্বে তার প্রভাব রাখতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।

কেতকি শর্মা বলেন, তিনি আশা করেন উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশও এখন ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে চাইবে, কারণ তারা ইউএই'র অভিজ্ঞতা থেকে অনেক অনুকূল ফল দেখতে পাচ্ছেন।

"এটা শুরু মাত্র," বলছেন তিনি। "আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ আশাবাদী।"