ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ: সিপাহী বিদ্রোহের সমর্থক উর্দু সংবাদপত্রের সম্পাদক মৌলভি বাকারকে যেভাবে হত্যা করেছিল ব্রিটিশরা

শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা

১৮৫৭ সালে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি। দিল্লির মসনদে তখনও রয়েছেন শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। আর গোটা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিদ্রোহী ভারতীয় সিপাহীরা।

যে ঘটনাকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ব্রিটিশ শাসকরা চিহ্নিত করে থাকেন সিপাহী বিদ্রোহ হিসাবে, আর যেটিকে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা বেশ কয়েক দশক ধরেই ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে বর্ণনা করেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

১৮৫৭র সেপ্টেম্বর: দিল্লির বাইরে সেনা সমাবেশ করছে ব্রিটিশ বাহিনী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৮৫৭র সেপ্টেম্বর: দিল্লির বাইরে সেনা সমাবেশ করছে ব্রিটিশ বাহিনী

দিল্লির বাইরে তখন বিরাট সংখ্যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী জড়ো হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে বিদ্রোহী ভারতীয় সৈন্যদের প্রতিরোধ ভাঙতে শুরু করেছে ব্রিটিশ বাহিনী। আর একটু একটু করে দিল্লি পুনর্দখল করতে শুরু করেছে কোম্পানির সেনারা।

এরকমই একটা সময়ে তাদের হাতে ধরা পরে গেলেন মৌলভী মুহম্মদ বাকার।

এখন যেখানে দিল্লির কাশ্মীরী গেট এলাকা, সেখানেই একটা ইমামবরা গড়েছিলেন শিয়া মুসলমান ধর্মপ্রচারক মৌলভী মুহম্মদ বাকার। তার বসবাসও ছিল ওই অঞ্চলেই।

'দিল্লি উর্দু আখবার' - দিল্লির প্রথম উর্দু পত্রিকা

তবে শিয়া ধর্মপ্রচারকের থেকেও বড় আরেকটা পরিচয় ছিল এই মৌলভী বাকারের। তিনি ছিলেন দিল্লির একটি উর্দু সংবাদপত্রের সম্পাদক।

পত্রিকার নাম ছিল 'দিল্লি উর্দু আখবার', যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৪১ সালে।

সেটা যেমন ছিল না দিল্লির প্রথম সংবাদপত্র, তেমনই ছিল না ভারতের প্রথম উর্দু পত্রিকা।

দিল্লির প্রথম উর্দু সংবাদপত্র দিল্লি উর্দু আখবার

ছবির উৎস, শাফে কিদওয়াই

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির প্রথম উর্দু সংবাদপত্র দিল্লি উর্দু আখবার

ঐতিহাসিক রাণা সাফভি লিখছেন, "ভারতের প্রথম উর্দু সংবাদপত্র 'জাম-এ-জাহান-নুমা' প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা থেকে মার্চ ২৭, ১৮২২। আর 'দিল্লি উর্দু আখবারে'র আগেও দিল্লিতে ছিল 'সুলতান উল আখবার', 'সিরাজুল আখবার' আর 'সাদিকুল আখবারে'র মতো সংবাদপত্র। তবে সেই তিনটিই ছিল ফার্সি ভাষার কাগজ।"

ব্রিটিশরা হত্যা করল মৌলভী বাকারকে

দিল্লির প্রথম উর্দু সংবাদপত্রের সম্পাদককে গ্রেপ্তারের পরে নিয়ে যাওয়া হল বাহিনীর কর্মকর্তা মেজর হডসনের কাছে।

কোনও অভিযোগ দায়ের হল না, কোনও বিচার হল না, সরাসরি মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে মৌলভী বাকারকে মেরে ফেলা হল।

১৮৫৭-র বিদ্রোহের গবেষক, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক সৈয়দ জাহির হুসেইন জাফরি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "মৌলভী বাকারকে ১৮ অথবা ১৯ সেপ্টেম্বর মেরে ফেলে ব্রিটিশ বাহিনী।"

মেজর হডসন ঘোড়ায় চেপে বিদ্রোহী সিপাহীদের ওপরে গুলি চালাচ্ছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মেজর হডসন ঘোড়ায় চেপে বিদ্রোহী সিপাহীদের ওপরে গুলি চালাচ্ছেন

তবে ইতিহাসবিদ রানা সাফভি লিখছেন, "মৌলভী বাকারকে আটক করা হয় ১৪ই সেপ্টেম্বর, আর দুদিন পরে ১৬ই সেপ্টেম্বর তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।"

আবার আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিভাগের চেয়ারম্যান সাফে কিদওয়াই 'দিল্লি উর্দু আখবার' নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছেন যে ঠিক কীভাবে মৌলভী বাকারকে ব্রিটিশরা হত্যা করেছিল তার কোনও লিখিত প্রমাণ নেই।

তবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে মৌলভী বাকারকে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখার ঝুঁকি নিতে চায় নি, সেটা পরিষ্কার গবেষকদের কাছে।

ব্রিটিশ বাহিনী গ্রেপ্তার করছে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ব্রিটিশ বাহিনী গ্রেপ্তার করছে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে

বিদ্রোহী সেনাদের সমানে উদ্বুদ্ধ করতেন মৌলভী

সিপাহি বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের আগের কয়েক মাসে মৌলভী বাকারের লেখাগুলো ছিল প্রচন্ড ব্রিটিশ বিরোধী। তার সংবাদপত্র, 'দিল্লি উর্দু আখবার' বিদ্রোহী সিপাহীদের সমানে উদ্বুদ্ধ করে গেছে কোম্পানির বিরুদ্ধে!

অধ্যাপক জাফরি বলছেন, "বিদ্রোহ নিয়ে গোড়ার দিকে কিন্তু দিল্লি উর্দু আখবার একরকম নিঃস্পৃহই ছিল। কিন্তু চার সপ্তাহের মধ্যেই লেখার ধরন বদলিয়ে ফেলেন মৌলভী বাকার। বিদ্রোহী সিপাহীদের সম্পূর্ণ সমর্থন করতে শুরু করেন তার পত্রিকায়। তার লেখাগুলো ভীষণভাবে উদ্দীপনা জাগাত বিদ্রোহী সিপাহীদের মনে। এমন কি নিজের ছেলেকে দিয়ে কবিতাও লেখাতেন পত্রিকায়। সেই সব কবিতাও উদ্বুদ্ধ করত বিদ্রোহীদের।"

"তার ছেলে মুহম্মদ হুসেইন আজাদের লেখা একটা কবিতার কথা মনে পড়ছে। কুরানের একটা অংশ উল্লেখ করে আজাদ তার কবিতায় লিখেছিলেন যে 'হে মানুষ, যাদের চোখ আছে, তারা দেখ, তার এই পতন দেখে শিক্ষা নাও।' এখানে ব্রিটিশদের পতনের কথা বোঝানো হয়েছে," ব্যাখ্যা করছিলেন অধ্যাপক জাফরি।

কাগজের নাম বদলে ফেলা হয়েছিল

বিদ্রোহী সিপাহীরা বাহাদুর শাহ জাফরকেই তাদের নেতা বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তাই মৌলভী বাকার বিদ্রোহের মাঝপথেই কাগজের নামও বদলিয়ে ফেললেন।

মৌলভী বাকার যে কাশ্মীরী গেট এলাকায় থাকতেন, সেই অঞ্চল পুনর্দখল করছে ব্রিটিশ বাহিনী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মৌলভী বাকার যে কাশ্মীরী গেট এলাকায় থাকতেন, সেই অঞ্চল পুনর্দখল করছে ব্রিটিশ বাহিনী

১২ জুলাই, ১৮৫৭ সালে 'দিল্লি উর্দু আখবার' এর বদলে প্রকাশিত হল 'আখবার-উজ-জাফর'। আগে কাগজটা প্রকাশিত হত প্রতি শনিবার, এখন থেকে প্রকাশিত হতে লাগল রবিবার করে, জানাচ্ছেন ইতিহাসবিদ রানা সাকভি।

মুঘল সম্রাটের নাম যেমন ছিল জাফর, তেমনই উর্দুতে জাফর শব্দের অর্থ জয়। তাই কাগজের নাম বদলটা দুই অর্থেই ধরা যেতে পারে।

সাফে কিদওয়াই তার ইংরেজি বইয়ের জন্য 'দিল্লি উর্দু আখবার' এর অনুবাদ করেছেন।

সবথেকে বেশি বিক্রির কাগজ ছিল 'দিল্লি উর্দু আখবার'

মি. কিদওয়াইয়ের কথায়, "লিথোগ্রাফিক প্রেসে ছাপা হত দিল্লি উর্দু আখবার। দাম ছিল এক আনা। সেই সময়ে দিল্লির সবথেকে বেশি বিক্রির কাগজ ছিল সেটা। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কপি ছাপা হত। যেখানে অন্যান্য কাগজ কোনওটা ৩০, কোনওটা ২৫ কপি মতো বিক্রি হত।"

"তার পত্রিকাতেই আমরা প্রথম দেখতে পাই স্পট রিপোর্টিং বলে, আজকের সংবাদ দুনিয়ায় যেটা পরিচিত, অর্থাৎ ঘটনাস্থল থেকে সংবাদ সংগ্রহ। ১৭ই মে, ১৮৫৭ তারিখে প্রকাশিত একটা প্রতিবেদন ছিল এরকম: 'এই প্রতিবেদক তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল নিজের চোখে ঘটনাবলী দেখার জন্য। এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। কাশ্মীরি গেটের দিক থেকে বাজারের দিকে মানুষজন পালাচ্ছিল। নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত ঝুঁকি ছিল। কিন্তু তার থেকেও বড় আকাঙ্খা ছিল বস্তুনিষ্ঠ থেকে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা আমার পাঠকদের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব", জানাচ্ছেন মি. কিদওয়াই।

এরকমই একটি লিথোগ্রাফিক ছাপার যন্ত্র ছিল মৌলভী বাকারের

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এরকমই একটি লিথোগ্রাফিক ছাপার যন্ত্র ছিল মৌলভী বাকারের

যে লিথোগ্রাফি প্রেসে তিনি কাগজ ছাপতেন, সেটা কোথা থেকে কিনেছিলেন মৌলভী বাকার, আর কোথা থেকে অর্থায়ন হত দিল্লি উর্দু আখবারের তা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা আছে।

মৌলভী বাকারের ছিল ইউরোপীয় শিক্ষাও

তবে প্রচলিত মত এটাই যে, দিল্লি কলেজ থেকে ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত মৌলভী বাকার বেশ কিছু দিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব বিভাগে চাকরী করেছিলেন। সেই সময়ে তার সঞ্চিত অর্থ থেকেই কাগজটি প্রকাশ করতেন বলে মনে করছেন ইতিহাসবিদদের একাংশ।

ইউরোপীয় শিক্ষার আগে তিনি বাবার কাছে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন। আবার নিজে যে কলেজে পড়েছেন, সেখানে ফার্সি ভাষার শিক্ষকতাও করেন কিছুদিন।

শিয়া ধর্মপ্রচারক হয়েও বিদ্রোহের সময়ে হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা যে খুব জরুরী সেটা উপলব্ধি করেছিলেন মৌলভী বাকার।

হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের জন্য কলম ধরেছিলেন

অধ্যাপক জাফরি বলছিলেন, "খৃষ্টান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দু - মুসলিম ঐক্য ধরে রাখতে তার কাগজে তিনি ক্রমাগত লিখে গেছেন। ব্রিটিশরা অনেকবার চেষ্টা করেছে হিন্দু - মুসলিম ঐক্যে ফাটল ধরাতে। তারা মসজিদের দেওয়ালে কাউকে দিয়ে একটা পোস্টার লাগিয়ে দিয়েছিল, যাতে লেখা ছিল ইসলাম আর খৃষ্ট ধর্ম - দুটিই সেমেটিক ধর্ম। তাই এই দুই ধর্মের মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত।"

দিল্লির জামা মসজিদ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির জামা মসজিদ

মৌলভী বাকার তার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ওই পোস্টারের কড়া সমালোচনা করেছিলেন।

"তিনি দেখিয়েছিলেন যে হিন্দু, জৈন, মুসলমান - এদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে খৃষ্টান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে," বলছিলেন অধ্যাপক জাফরি।

তিনি আরও জানাচ্ছিলেন যে সেবছর ঈদ উল আজহার দিনে দিল্লিতে কোনও গরু কোরবানি করতে দেন নি বাদশাহ। কোরবানি বন্ধ করতে রীতিমতো পরোয়ানা জারি করেছিলেন তিনি।

১৮৫৭ সালে গরু কোরবানি হয় নি দিল্লিতে

অধ্যাপক জাফরির কথায়, "বাদশাহ মনে করেছিলেন গরু কোরবানি করা হলে তা নিয়েই হিন্দু সিপাহীদের সঙ্গে মুসলমানদের ঝামেলা লাগতে পারে। ব্রিটিশরা সেরকমই একটা সুযোগ খুঁজছিল। তাই পরোয়ানা জারি হয়েছিল। আর অন্যদিকে মৌলভী বাকার এই প্রশ্নে কলম ধরেছিলেন। সেবছর দিল্লিতে কোনও গরু কোরবানি হয় নি।"

রানা সাফভিও বলছেন, "বিদ্রোহের সময়ে হিন্দু মুসলমানের ঐক্য বজায় রাখার প্রচেষ্টাটাই সম্ভবত মৌলভী বাকারের সব থেকে বড় অবদান। আর ব্রিটিশরা এটা ঠিকই বুঝেছিল যে এই হিন্দু মুসলমান ঐক্য একটা কঠিন শিক্ষা দিয়ে গেল।"

১৮৫৭-র বিদ্রোহ থেকে কী শিক্ষা পাওয়া গেল, তা লিখে গেছেন ঐতিহাসিক জর্জ উইলিয়াম ফরেস্ট

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ থেকে কী শিক্ষা পাওয়া গেল, তা লিখে গেছেন ঐতিহাসিক জর্জ উইলিয়াম ফরেস্ট

ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জর্জ উইলিয়াম ফরেস্ট বিদ্রোহের ঠিক পরেই যে 'স্টেট পেপার্স' প্রকাশ করেছিলেন, তার মুখবন্ধ উদ্ধৃত করে রাণা সাফভি বলছেন, "ভারতীয় বিদ্রোহ যে অনেকগুলি শিক্ষা দিয়ে গেল, তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হল ব্রাহ্মণ, শূদ্র, হিন্দু আর মোহামেডানরা যদি আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় তাহলে একটা বিদ্রোহ করে ফেলতে পারে তারা।"

তাদের সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছেন যে সম্পাদক, বিদ্রোহীদের উৎসাহ উদ্দীপনা যুগিয়েছেন যিনি লাগাতার, সেই মৌলভীকে কি দিল্লি পুনর্দখলের পরে আর বাঁচিয়ে রাখে ব্রিটিশরা?

বিবিসি বাংলায় আরও খবর: