ইতিহাসের সাক্ষী: জর্জিয়ায় প্রেসিডেন্ট পুতিনের যুদ্ধ কেন ও কিভাবে শুরু হয়েছিল

দক্ষিণ ওসেটিয়ায় রুশ ট্যাঙ্ক।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দক্ষিণ ওসেটিয়ায় রুশ ট্যাঙ্ক।

ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। তার একটি হয়েছিল ২০০৮ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক একটি প্রজাতন্ত্র জর্জিয়ার সঙ্গে।

রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত থেকে জর্জিয়া তার দক্ষিণ ওসেটিয়া প্রদেশ পুনর্দখল করার চেষ্টা করলে রাশিয়া সেখানে সৈন্য পাঠায়। দখল করে নেয় আবখাজিয়া নামের আরো একটি প্রদেশও।

পাঁচদিনের এই যুদ্ধে জর্জিয়ার বহু শহরে এবং কৃষ্ণ সাগরের একটি বন্দরের ওপর রুশ বাহিনী বোমাবর্ষণ করে। এতে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়।

স্বাধীনতার পর থেকেই বিরোধ

সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র জর্জিয়া। পরে এটি যখন স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তার শুরুর দিকেই এই যুদ্ধের বীজ রোপিত হয়। মিখাইল সাকাশভিলি বিপ্লবের মাধ্যমে জর্জিয়ায় ক্ষমতায় আসার পর ২০০৪ সাল থেকে এই যুদ্ধের আশঙ্কা তীব্র হতে শুরু করে।

ক্ষমতা গ্রহণের পরে মি. শাকাসভিলি জর্জিয়াকে রাজনৈতিক এবং আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি থেকে মুক্ত করার জন্য নতুন এক লড়াই-এর কথা ঘোষণা করেন।

জর্জিয়ার সাংবাদিক নাতালিয়া আন্তালাভা বলেন, স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক বছরে সমগ্র দেশে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল তা ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

তিনি বলছেন, ভ্লাদিমির পুতিন প্রেসিডেন্ট সাকাশভিলি এবং ওই বিপ্লবকে একটা সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি চাননি জর্জিয়াতে সাবেক সোভিয়েত ধরনের বদলে পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র সাফল্য অর্জন করুক।

"দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির ওপর ভিত্তি করেই সেখানে মি. পুতিনের অস্তিত্ব গড়ে উঠেছিল। তিনি চাইতেন অন্যেরাও ঠিক একই ধরনের কাজে লিপ্ত থাকুক। নাহলে সেটা তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে," বলেন সাংবাদিক নাতালিয়া আন্তালাভা।

দক্ষিণ ওসেটিয়ায় জর্জিয়ার বাহিনীর নিক্ষিপ্ত গোলায় বিধ্বস্ত একটি ভবন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দক্ষিণ ওসেটিয়ায় জর্জিয়ার বাহিনীর নিক্ষিপ্ত গোলায় বিধ্বস্ত একটি ভবন।

এছাড়াও জর্জিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী ছোট্ট দুটো প্রদেশকে কেন্দ্র করে সেসময় রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির সম্পর্কও জটিল হয়ে উঠেছিল।

দুটো প্রদেশের স্বাধীনতার লড়াই

এই দুটো প্রদেশ- দক্ষিণ ওসেটিয়া এবং আবখাজিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই দুটো প্রদেশই স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিল। কিন্তু তাদের পরিচয় কী হবে সেটা কখনোই চূড়ান্ত হয়নি। রাশিয়ার সমর্থনে তারা সবসমই ছিল জর্জিয়ার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

স্বাধীনতার পরের কয়েক বছরে এই দুটো প্রদেশে বিচ্ছিন্নভাবে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

সাংবাদিক নাতালিয়া আন্তালাভা বলছেন, আবখাজিয়া এবং দক্ষিণ ওসেটিয়া- এই দুটো যুদ্ধেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল সাকাশভিলি এই সঙ্কট সমাধানে ছিলেন বদ্ধপরিকর। এবিষয়ে ২০০৪ সালে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনাও করেছেন।

কিন্তু এর পরে জর্জিয়ার বাহিনীও সেখানে হস্তক্ষেপ করে। তারা দক্ষিণ ওসেটিয়াতে কালো বাজারে ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়। রাশিয়ার কাছ থেকে সমর্থন, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তখন জর্জিয়ার বাহিনীগুলোর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

মস্কো তখন সতর্ক করে দেয় যে এই প্রদেশে তাদের যেসব নাগরিক বসবাস করছেন তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়লে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

একই সময়ে প্রেসিডেন্ট মিখাইল সাকাশভিলি ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলছিলেন। তখন মি. সাকাশিভিলির কাছে জানতে চাওয়া হয় যে রাশিয়া কি তার দেশকে উস্কানি দিচ্ছে?

"আমাদের নীতি অত্যন্ত পরিষ্কার- আমরা ওই এলাকাকে সৈন্যমুক্ত করতে চাই, পরিস্থিতি শান্ত করতে চাই, একই সংগে আমরা আলাপ আলোচনাও চালিয়ে যেতে চাই। রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার সঙ্গেও আমরা কথা বলতে চাই। আমরা রাশিয়ার রাজনীতিবিদদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। তাদের সঙ্গে জর্জিয়ার সার্বভৌমত্ব নিয়ে কথা বলতে হবে। রাশিয়া যখন থেকে জর্জিয়ার ভেতরে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে তখন থেকেই এসব সমস্যা শুরু হয়েছে। আমরা চাই না আমাদের উস্কানি দেওয়া হোক," বলেন মি. শাকাসভিলি।

জর্জিয়া যুদ্ধের সময় ভ্লাদিমির পুতিন ছিলেন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জর্জিয়া যুদ্ধের সময় ভ্লাদিমির পুতিন ছিলেন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী।

এর পর যুদ্ধবিরতির বিষয়ে দুটো দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়। তবে সেটি স্থায়ী হয়নি। তখন হামলার জবাবে পাল্টা হামলা - এধরনের যুদ্ধ অব্যাহত থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক

কিন্তু জর্জিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক তখন উষ্ণ হতে থাকে। প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৬ সালে পশ্চিমা প্রতিরক্ষা জোট নেটোতে জর্জিয়ার যোগদানের সম্ভাবনার কথা ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, "আমি বিশ্বাস করি জর্জিয়া নেটোর সদস্য হলে নেটো লাভবান হবে। আমি মনে করি এ থেকে জর্জিয়াও লাভবান হবে। তাদের সদস্য হওয়ার বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছে। এনিয়ে নেটোর অংশীদারদের সাথে আমরা কাজ করছি। আমরা দেখছি জর্জিয়ার জন্য এই পথটা কীভাবে আরো মসৃণ করা যায়। এনিয়ে জর্জিয়াকেও কাজ করতে হবে এবং জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট সেটা বুঝতে পারছেন। আমি মনে করি বিশ্বের স্বার্থেই নেটোর সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।"

অন্যান্য খবর:

সাংবাদিক নাতালিয়া আন্তালাভা বলেন এই ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট পুতিন যে ক্ষুব্ধ হয়েছেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ রাশিয়া চাইছিল নেটো যেন জর্জিয়া থেকে আরো দূরে সরে যায়।

কিন্তু জর্জিয়া দূরে যায়নি। ২০০৮ সালে জর্জিয়াকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে তাদেরকে নেটোর পূর্ণ সদস্য করে নেওয়া হবে, ভবিষ্যতের সুবিধাজনক কোনো সময়ে।

নেটোর এই ঘোষণার পর কয়েক মাস ধরে রাশিয়া, জর্জিয়ার সাথে তাদের সীমান্ত এলাকায় সৈন্য এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম মোতায়েন করতে শুরু করে। একই সময়ে দক্ষিণ ওসেটিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে জর্জিয়ার বাহিনীর শত্রুতাও তীব্র হতে থাকে।

প্রেসিডেন্ট সাকাশভিলি আবারও তার বাহিনীকে যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার আহবান জানান। কিন্তু তাদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত থাকে।

যুদ্ধের শুরু যেভাবে

এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট সাকাশভিলি ৭ই অগাস্ট সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন। এবং দক্ষিণ ওসেটিয়াতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চিরতরে দমন করার জন্যে সেখানে দেড় হাজার সৈন্য পাঠানো হয়।

ভ্লাদিমির পুতিন সেসময় রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। অলিম্পিক গেমস উপলক্ষে সেসময় তিনি বেইজিং-এ ছিলেন।

সেখানে তিনি বলেন, "জর্জিয়ার নেতৃত্ব দক্ষিণ ওসেটিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আগ্রাসনের পথ বেছে নিয়েছে। কার্যত তারা সামরিক অভিযান শুরু করেছে। তারা সব ধরনের ভারী অস্ত্র, গোলা এবং ট্যাঙ্ক ব্যবহার করছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক ঘটনা, যার জবাব আমাদের দিতে হবে।"

জর্জিয়ার রাজধানী তিবলিসি থেকে গোরি শহরে যাওয়ার সড়কে ট্যাঙ্ক নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে রাশিয়ার সৈন্যরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জর্জিয়ার রাজধানী তিবলিসি থেকে গোরি শহরে যাওয়ার সড়কে ট্যাঙ্ক নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে রাশিয়ার সৈন্যরা।

জবাব হিসেবে রাশিয়ার সীমান্তে যে সামরিক বাহিনী জড়ো করা হয়েছিল তাদেরকে দক্ষিণ ওসেটিয়াতে পাঠানো হয় যারা সেখান থেকে জর্জিয়ার সৈন্যদের বের করে দিতে শুরু করে।

কিন্তু পরে রুশ অভিযান এই প্রদেশের বাইরে বাকি জর্জিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে।

এর ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে তারা পালিয়ে যেতে শুরু করে। অনেকেই উদ্বাস্তু হয়। রাজধানী তিবলিসি থেকে যুদ্ধক্ষেত্র ছিল মাত্র এক ঘণ্টা দূরে। প্রতি রাতে হাজার হাজার মানুষ এই রুশ অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তিবলিসির রাস্তায় নেমে আসে।

ভ্লাদিমির পুতিন এই অভিযানকে শান্তিরক্ষার অভিযান হিসেবে উল্লেখ করে এর যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যারা আক্রমণের মুখে পড়েছে রাশিয়া তাদেরকে রক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে।

সাংবাদিক নাতালিয়া আন্তালাভা বলেন, "রাশিয়া সবসময় যা করে, সেটাই তারা করছিল। তারা বিভিন্ন লোকজনের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয় এবং পরে তারা সেখানে ঢুকে পড়ে। বলে যে তারা এই সমস্যার সমাধান করছে। রাশিয়া বলে, আমি শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করবো, আমি এই সঙ্কটে মধ্যস্থতা করবো।"

সারা জর্জিয়াতেই এই যুদ্ধ টের পাওয়া যায়। রাজধানী তিবলিসির কাছে পূর্বাঞ্চলীয় শহর গোরি এবং কৃষ্ণ সাগরের পোটি বন্দরেও বিমান থেকে হামলা চালানো হয়।

সাংবাদিক নাতালিয়া আন্তালাভা বলেন, "সাকাশভিলি যে সম্পূর্ণ ভুল হিসেব করেছিলেন তা নিয়ে আমার মনে কোন সন্দেহ নেই। তবে আমাকে এটাও বলতে হবে যে তাকে উস্কানি দিতে রাশিয়া সফল হয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল সরকার এবং সাকাশভিলিকে সরানো।"

আরো পড়তে পারেন:

পাঁচদিনের যুদ্ধে শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর মস্কো যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। কিন্তু তার পরদিনও রুশ ট্যাঙ্ক রাজধানী তিবলিসির দিকে অগ্রসর হতে দেখা যায়।

পাঁচদিনের যুদ্ধ

রাশিয়ার সৈন্যদের এই অগ্রযাত্রা তখনই থামতে বাধ্য হয়, যখন সাহায্য-সামগ্রী ভর্তি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি বিমান রাজধানী তিবিলসির বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

সাংবাদিক নাতালিয়া আন্তালাভা বলেন, "বিমানবন্দরে বোমা হামলার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেখানে অবতরণের একটা তাৎপর্য রয়েছে। আমার বিশ্বাস একারণেই তিবলিসির পতন ঘটেনি। তা নাহলে তারা আরো অগ্রসর হতো।"

সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইসও তিবলিসিতে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে তিনি রাশিয়াকে তাদের সামরিক অভিযানের ব্যাপারে সতর্ক করে দেন।

তিনি বলেন, "এখন ১৯৬৮ সাল নয়। তখন চেকোস্লোভাকিয়ায় অভিযান চালানো হয়। একটি বৃহৎ শক্তি যখন প্রতিবেশী ছোট একটি দেশে হামলা চালায় এবং সেদেশের সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা করে, মুক্ত বিশ্বকে এখন ভেবে দেখতে হবে নিরাপত্তার ওপর, ওই অঞ্চলে এবং তার বাইরেও এর পরিণতি কী হতে পারে।"

এর পরেই রাশিয়া তার বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু দক্ষিণ ওসেটিয়া এবং আবখাজিয়াতে তাদের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত থাকে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয় জর্জিয়া যাতে ওই দুটো প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে সেজন্যই তাদের সৈন্যরা সেখানে অবস্থান করবে।