রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধ: রাশিয়ার হাতে সেভেরোদোনেৎস্কের পতনের গুরুত্ব কী

    • Author, জো ইনউড
    • Role, বিবিসি নিউজ, কিয়েভ

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্রমাগত ভারী কামানের গোলা এবং বিমান হামলা চালিয়ে পূর্ব ইউক্রেনের সেভেরোদোনেৎস্ক-কে 'ভূতুড়ে শহর' বানিয়ে ফেলেছে রাশিয়া।

সাবেক এই শিল্প নগরীটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলেও, এটি এখন কার্যত একটি ধ্বংসস্তুপ ।

কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিরোধের চেষ্টার পর ভবিতব্য মেনে নেন ইউক্রেন সেনাবাহিনীর কম্যান্ডাররা - যে শহরটি রক্ষার চেষ্টা করে আর লাভ নেই, কারণ প্রাণহানি সহ্যসীমার বাইরে চলে গিয়েছিল।

শনিবার ইউক্রেনের প্রেসিডন্ট জেলেনস্কি নিজেই ঘোষণা করেন, সেভেরোদোনেৎস্ক এখন রুশ সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে। তিনি বলেন, "নৈতিকতা এবং আবেগের" বিবেচনায় এই শহরটির নিয়ন্ত্রণ হারানো তার দেশের জন্য "খুবই কষ্টকর।"

কোনো সন্দেহ নেই যে লুহানস্ক অঞ্চলের প্রধান এই শহরটি নেয়ার পর রাশিয়া এই যুদ্ধে তাদের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্যের দিকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে।

পুরো ইউক্রেন দখলের প্রাথমিক চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পর রাশিয়া ডনবাস নামে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল দখলের লক্ষ্য স্থির করে।

ডনবাস এলাকাটি দুটো অঞ্চল নিয়ে - দনেৎস্ক এবং লুহানস্ক। এখন এই দুটি অঞ্চলের একটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলেও প্রেসিডেন্ট পুতিন তার জনগণকে কিছুটা সাফল্য দেখাতে পারবেন।

লিসিচানস্ক - শেষ দুর্গ

যদিও সন্দেহ নেই রাশিয়া এখন সেই লক্ষ্যের খুব কাছে, তবে তারা যে লুহানস্কের পুরোপুরি দখল করতে পারবে তার শতভাগ গ্যারান্টি এখনো নেই।

কারণ সেভেরোদনেৎস্কের কাছেই আরেকটি বড় শহর লিসিচানস্ক এখনও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে। সেভেরোদনেৎস্ক থেকে সরে গিয়ে এই শহরে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা ঘাঁটি গেড়েছে।

তবে সবশেষ খবর হচ্ছে রুশ বাহিনী এখন লিসিচানস্ক শহরের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে, এবং লুহানস্কের গভর্নর সেরহি হাইদাই বেসামরিক লোকদের লিসিচানস্ক ছেড়ে চলে যাবার জন্য জরুরি আহ্বান জানিয়েছেন।

সেভেরোদনেৎস্ক ও লিসিচানস্ক - এই দুই শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী সিভারস্কি পুরো ডনবাসের ওপর দিয়ে গেছে। এই নদীর দুই তীরে বেশ কিছু জায়গায় দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকবার প্রচণ্ড লড়াই হয়েছে - যে সব লড়াইতে রাশিয়ার অনেক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়।

বিশেষ করে মাসখানেক আগে এই নদী পার হবার চেষ্টার সময় রুশ সৈন্যদের পুরো একটি দল কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ইউক্রেনের কামান এবং ড্রোনের আক্রমণে কয়েকশ' রুশ সৈন্য প্রাণ হারায় এবং এবং তাদের কয়েক ডজন সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়ে যায়।

লিসিচানস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ঢাল হিসাবে কাজ করছে নদীটির একটি বাঁক । এছাড়া লিসিচানস্ক শহরটি একটি পাহাড়ের ওপর। ফলে, লুহানস্কের অবশিষ্ট এই শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া রাশিয়ার জন্য বেশ কষ্টকর হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দি স্টাডি অব ওয়ার নিয়মিত ইউক্রেন যুদ্ধের রণাঙ্গনের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের বিশ্লেষণ প্রকাশ করছে। ২৪ জুন প্রকাশিত তাদের বিশ্লেষণে সংস্থাটি বলে, "ইউক্রেন সৈন্যরা এখন লিসিচানস্কের উঁচু জায়গাগুলোতে অবস্থান নেবে। পুরোপুরি ঘেরাও না হয়ে গেলে সেসব উঁচু অবস্থান থেকে অনেকো সময় তারা রুশ সৈন্যদের প্রতিহত করতে পারবে।"

কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে রাশিয়া লিসিচানস্ককে বাকি ইউক্রেনের সাথে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার পথেই এগুচ্ছে। দক্ষিণ থেকে তারা শহরটির দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং লিসিচানস্ক এখন রুশ সৈন্যদের দৃষ্টি সীমানার মধ্যে।

রুশ সমর্থিত বিদ্রোহীদের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, লিসিচানস্ক রক্ষার কোনো চেষ্টা করাটা ইউক্রেনের সৈন্যদের জন্য অর্থহীন হবে।

"যে গতিতে আমাদের সৈন্যরা অগ্রসর হচ্ছে তাতে খুব দ্রুত লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিক (স্বঘোষিত) মুক্ত হবে," বলেন অন্দ্রে মারোচকো, লুহানস্ক এলাকার রুশ সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনীর একজন মুখপাত্র।

তিনি বলেন, "আমাদের সৈন্যরা ইতিমধ্যেই লিসিচানস্ক পৌছে গেছে। আমরা এখন বলতে পারি যে ইউক্রেনিয়ান সৈন্যদের সমস্ত গতিবিধি আমরাই নিয়ন্ত্রণ করছি।"

শেষ খেলা কী?

এখন প্রধান প্রশ্ন হলো এই যুদ্ধে এখন রাশিয়ার এন্ডগেম অর্থাৎ শেষ খেলা কী?

তারা কী এখন পুরো ডনবাস অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইউক্রেনকে যুদ্ধবিরতিতে রাজী হতে বাধ্য করবে? এরপর পুরো লুহানস্ক এবং দনেৎস্ক অঞ্চল দুটো রাশিয়ার অংশ করে ফেলবে?

সেটা অসম্ভব নয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যেভাবে গত চার মাসের যুদ্ধে রাশিয়া তাদের সৈন্য এবং অস্ত্র খুইয়েছে - তাতে দ্রুত একটি যুদ্ধবিরতি হয়তো এখন তাদের লক্ষ্য।

তারপর, ডনবাসের নিয়ন্ত্রণকে জনগণের কাছে একটি সাফল্য হিসাবে তুলে ধরবে। তাদেরকে বলবে, 'বিশেষ সামরিক অভিযানে' ডনবাস 'মুক্ত হয়েছে।'

রাশিয়া হয়তো আশা করছে শান্তি এবং বিশ্ব রাজনীতি-অর্থনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে দেশের অংশবিশেষ হারানোর বিষয়টি মেনে নিতে ইউক্রেনের ওপর চাপ তৈরি হবে।

তবে নিশ্চিতভাবেই ইউক্রেন তাতে রাজী হবেনা। ফলে, লড়াই থামলেও বিরোধ অমীমাংসিত রয়ে যাবে।

এটি ছাড়া আর কী হতে পারে? প্রেসিডেন্ট পুতিন কী যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন সেই লক্ষ্য অর্জনের পথেই থাকবেন? তিনি কি পূর্বের পাশাপাশি ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলও কব্জা করতে চাইবেন? অথবা রাজধানী কিয়েভের দিকে আরেকবার অগ্রসর হবেন?

একজন ব্যক্তিই এসব প্রশ্নের আসল উত্তরটি জানেন - ভ্লাদিমির পুতিন, এবং তিনি তার পরিকল্পনা খোলাসা করছেন না।

তবে তার "বিশেষ সামরিক অভিযান" কীভাবে শেষ হতে পারে - তার কিছু ইঙ্গিত হয়ত মি. পুতিনের সাম্প্রতিক কিছু কথা থেকে পাওয়া যেতে পারে।

জুন মাসের গোড়ার দিকে এক ভাষণে তিনি নিজেকে খোলাখুলি তুলনা করেন জার সম্রাট 'পিটার দ্য গ্রেট'-এর সাথে যিনি তিনশ' বছর আগে রুশ সাম্রাজ্য বিস্তারের যুদ্ধ শুরু করেছিলেন।

"আমাদের পুরনো ভূমিকে আবারো আয়ত্বে নিয়ে আসা এবং সেগুলোকে সংহত করার দায়িত্ব এখন আমাদের ওপর বর্তেছে," তার ভাষণে বলেন মি. পুতিন।

তাহলে, ইউক্রেন বা ইউক্রেনের একাংশ দখলই কি এখন তার লক্ষ্য?

যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়া খুবই বাজে কিছু ভুল করেছে। প্রতিরোধের জন্য ইউক্রেনের মানুষের দৃঢ় প্রত্যয় এবং ইউক্রেন সেনাবাহিনীর সক্ষমতা রুশ জেনারেলরা হয়তো অনুধাবন করতে পারেননি।

কিয়েভ দখলের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে রুশ বাহিনীকে পিছু হটতে হয়েছে যা ছিল তাদের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাকর এবং অপমান। তবে সেই ব্যর্থতা থেকে তারা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছে।

ডনবাস দখলে রুশ সৈন্যদের ধীর কিন্তু অব্যাহত অগ্রযাত্রা দেখে মনে হয় তারা তাদের আগের ভূল থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং সেই ভূলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে তারা সচেষ্ট।

বিবিসি বাংলায় আজকের আরো খবর: