বন্যা: সিলেট ও সুনামগঞ্জের দুর্গম এলাকার পানিবন্দী মানুষ কি ত্রাণ পাচ্ছে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, মুন্নী আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে সিলেট এবং সুনামগঞ্জ জেলায় মারাত্মক বন্যায় এখনো পানি বন্দী রয়েছে লাখ লাখ মানুষ। যাদের অনেকেই বাড়ি-ঘর ছেড়ে কাছাকাছি উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন।
সদর উপজেলা ছাড়াও ভারতের সাথে সীমান্তবর্তী এবং দুর্গম গ্রামগুলোতে হাজার হাজার মানুষ এখনো আশ্রয় কেন্দ্রেই রয়েছেন।
তারা অভিযোগ তুলেছেন যে, পানি বন্দী অবস্থায় সপ্তাহ খানেক পার হয়ে গেলেও এখনো কোন ধরণের ত্রাণ সহায়তা পাননি তারা। অর্ধাহারে তো বটেই অনেকে দিন পার করছেন পুরোপুরি অনাহারে।
'খাবারগুলো ভাগাভাগি করে অর্ধেক মুঠো খাচ্ছে'
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নিজগাঁও নামে একটি গ্রামের বাসিন্দা রুবেল আহমেদ। স্থানীয় বাজারে বিভিন্ন জিনিস মেরামত করার একটি দোকান রয়েছে তার।
বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকায় ওয়ার্কশপে নিজের বানানো সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে মোবাইল চার্জ দিয়ে সেটি সচল রেখেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রুবেল আহমেদের একটি পোস্ট চোখে পড়ে। সেই পোস্টে মি. আহমেদ তার এলাকায় ত্রাণ পৌঁছায়নি উল্লেখ করে সাহায্যের আবেদন করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
পরে তার সাথে যোগাযোগ করা হলে জানান, বন্যায় বাড়িঘরে পানি উঠলে তিনি এবং তার গ্রামের প্রায় দুই-তিন হাজার মানুষ একটি টিলায় আশ্রয় নেন।
সেখানকার কয়েকটা মাদ্রাসা, স্কুলকে বানানো হয় আশ্রয়কেন্দ্র। এছাড়া বাঁশ আর পলিথিনের কাগজ দিয়ে বানানো অস্থায়ী ঘরে আশ্রয় নেন অনেকে।
মি. আহমেদ জানান, দুর্গম আর ভারতের সাথে সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসের কারণে ত্রাণ না পাওয়ায় সংকটে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ।
"আমাদের এখানে ত্রাণ এখনো পর্যন্ত আসেনি। যতটুকু আসছে তা শহরের আশেপাশে। আমাদের গ্রাম একেবারে সীমান্তবর্তী এলাকায়, যোগাযোগও ভাল না। তাই এখানে কেউ ত্রাণ নিয়ে আসতে পারছে না।"
যারা আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছেন তাদের খাবারের সংকটের কথা উল্লেখ করে রুবেল আহমেদ বলেন, "সবাই সময় এরকম পার করতেছে যে যার কাছে যতটুকু আছে, নিজে কিছু খাচ্ছে, বাচ্চাদের কিছু খাওয়াচ্ছে, অন্যদের কিছু দিচ্ছে। মানুষে মানুষের খাবারগুলো ভাগাভাগি করে অর্ধেক মুঠো খাচ্ছে এরকম।"
গত দুই দিন ধরে বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। রুবেল আহমেদ জানান, পানি যেখানে ঘরের অর্ধেক পর্যন্ত ছিল সেখানে পানি রুম থেকে বারান্দায় নেমেছে। তবে এখনো বাড়ি-ঘরে ফিরে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়নি।
তার গ্রামের অনেকের কাঁচা এবং অর্ধ-কাঁচা বা ইটের তৈরি বাড়িঘরও পানির তোড়ে ভেসে গেছে বলে জানান।
মি. আহমেদ বলেন, "পানি কমতে শুরু করছে আমাদের এখানে কষ্ট আরো বাড়ছে। বাড়ি ঘরে যাইয়া মনটারে সান্ত্বনা দিতে পারছি না, ঘর ভেঙ্গে গেছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
ওই গ্রামের যে বাসিন্দারা টিলায় আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন অনেক নারীও। এদের মধ্যে অনেকেই জানাচ্ছিলেন তাদের দুর্ভোগের কথা।
এদের মধ্যে একজন আনোয়ারা। তিনি বলছিলেন, মৌসুমে এবার যে ধান গোলায় তুলেছিলেন সেগুলোর সবই এখন পানির নিচে। শুকানোর কোন উপায় নাই। বেশিরভাগই হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে।
আনোয়ারা বলেন, "আমরা এতদিন ধরে পানির মধ্যে ছিলাম বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে চৌকির উপর। ধান-টান সব পানির মধ্যে গেছে, খাবার-দাবার নাই।"
একই রকমের অভিজ্ঞতা যেন টিলায় আশ্রয় নেয়া প্রায় সবারই। আরেক নারী বলেন, পানির জন্য ঘরে থাকা সম্ভব নয়।
এখনো পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোন ধরণের ত্রাণ সাহায্য পাননি উল্লেখ করে ওই নারী বলেন, "কোন খাদ্য আসছে না তো। রান্না-বান্না সব বন্ধ। দুই দিন ধরে খাওয়া নাই।"
শুধু নিজগাঁও নয়, ওই এলাকার শাহ আরফিন, বাহাদুরপুর, ছনবাড়ী, নোয়াকুট, রাসনগর, বনগাঁও, ইছামতীর মতো গ্রামগুলোও এখন বন্যাদুর্গত।

ছবির উৎস, Getty Images
একপাশে গরু, একপাশে মানুষ
বেসরকারি উদ্যোগে বন্যাদুর্গত মানুষদের যারা ত্রাণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন তারা জানাচ্ছেন যে, জেলাগুলোকে সংযোগকারী সড়কগুলোরও একদিকে যেমন বেহাল দশা অন্যদিকে এই সড়ক ছাড়া চলাচলের একমাত্র উপায় এখন নৌযান।
সিলেট-ছাতক মহাসড়কে যতগুলো আশ্রয় কেন্দ্র আছে সেখানে স্বেচ্ছাসেবী একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গত মানুষদের ত্রাণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন আবুল ফজল ত্বহা। তিনি জানান, আশপাশের বেশিরভাগ বাজার বন্ধ।
অল্প কিছু দোকানপাট যা আছে সেগুলোর ভেতরেও পানি প্রবেশ করায় খাদ্যদ্রব্য অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। মুড়ি-চিড়ার মতো শুকনা খাবার শেষ। বৃষ্টির পানি ছাড়া নেই পানীয় জলের কোন উৎস।
আবুল ফজল ত্বহা বলেন, "আমরা বর্তমানে মেইন রোড ব্যতীত বাইরে কোথাও যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না নৌকা ছাড়া। নৌকাও সব জায়গায় যাইতে সমস্যা হয়। কারণ পানির অনেকটা বেগ। এখানে ছোট নৌকা হলে ডুবে যায়।"
তিনি জানান, নানা রকম ঝুঁকি আর প্রতিকূলতা পেরিয়েই মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যাচ্ছেন তারা।
আশপাশের যে বাড়িগুলো রাস্তা থেকে দেখা যায়, তার প্রায় প্রতিটা বাড়ি সম্পূর্ণ পানির নিচে অথবা কোন বাড়ির অর্ধেক পানির নিচে।
রাস্তায় আশ্রয় নেয়া মানুষদের কথা উল্লেখ করে মি. ত্বহা জানাচ্ছিলেন তার অভিজ্ঞতার কথা।

ছবির উৎস, Getty Images
বলছিলেন, "গতকাল আমি যে দৃশ্য দেখেছি, সুনামগঞ্জ রোডে, বিভিন্ন ব্রিজের উঁচু জায়গায় রাস্তায় মানুষ একপাশে গরু, একপাশে মানুষ, একটা ত্রিপল দিয়ে একসাথে আছে মানুষ বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে।"
"আর কারো ঘরে কিছু খাবার ছিল, সেগুলো রান্না করে খাচ্ছে। আর অনেকেই কিছুই নেই। হিসাব করা কঠিন যে কে ভাল আর কে খারাপ আছে। সবাই এক কাতারে।"
'দুর্গম এলাকায় ত্রাণ যাচ্ছে'
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর এবং ছাতক উপজেলার শতভাগ মানুষ পানি বন্দী ছিল।
আর জেলার বাকি ৮টি উপজেলার অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষ বন্যাদুর্গত।
তবে রোববার এবং সোমবার পানি কমতে থাকায় প্রায় তিন ফুট পানি নেমেছে।
জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ড ছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে।
তিনি জানান, "১৫ তারিখ থেকে এখনো পর্যন্ত এক কোটি ৩০ লাখ টাকা, পাঁচ হাজার বস্তা শুকনো খাবার, এবং আরো ১০ হাজার বস্তা আমাদের সুনামগঞ্জের কাছাকাছি এসে পৌঁছে গিয়েছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
এছাড়াও সিলেট জেলা থেকে অতিরিক্ত চিড়া-মুড়ি, গুড়, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং খাবার পানি সুনামগঞ্জে পৌঁছেছে এবং সেগুলো বিতরণ চলমান রয়েছে।
দুর্গম এলাকায় ত্রাণ দেয়া প্রসঙ্গে মি. হোসেন বলেন, "কোথাও কোথাও নৌকায় ওঠা এবং কোথাও কোথাও জনপ্রতিনিধিরা মাথায় করে খাবার নিয়ে গিয়েও মানুষের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করছেন।"
এছাড়া নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দুর্গম এলাকায় ত্রাণ দরকার কিনা তা খুঁজে খুঁজে দেখছে এবং সেখানে ত্রাণ কার্যক্রম পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
বন্যাদুর্গত সিলেট জেলা পরিদর্শনে রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুল হাসান।
তিনি জানিয়েছেন, দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌছাতে নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ড স্থানীয় নৌকা ব্যবহার করছে। এছাড়া বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর এবং জামালগঞ্জের মতো দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানো হচ্ছে।








