রানি এলিজাবেথ: ক্যারিবিয়ানের অনেক দেশ কেন রানিকে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দিতে চায়

ছবির উৎস, Courtesy of Andrea Garcia-Riveroll
- Author, হ্যারিয়েট ওরেল
- Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
এই বছর রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিংহাসনে আরোহণের ৭০ বছর পূর্তিতে নানা দেশে উৎসব যখন চলছে, তখন কয়েকটি কমনওয়েলথ দেশ জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে তারা রানিকে সরিয়ে দেয়ার কথা ভাবছে। যদিও সবাই চায় না যে, রানিকে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হোক।
কমনওয়েলথে যুক্তরাজ্য ছাড়াও আরও ৫৩টি দেশ রয়েছে। বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ মানুষ এই দেশগুলোয় বসবাস করে, যা এক সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ হিসাবে লন্ডন থেকেই শাসন করা হতো।
যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর বেশিরভাগ দেশ গণপ্রজাতন্ত্রী দেশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর পরও ১৪টি কমনওয়েলথ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে এখনো রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথই রয়েছেন।
গত বছরের নভেম্বর মাস রানিকে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে পুরোপুরি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় বার্বাডোস। আরও অনেক দেশেই এরকম দাবি উঠেছে।
কিন্তু ক্যারিবিয়ানের আরেকটি দেশ বেলিজের অনেক নাগরিক এখনো রাজতন্ত্রের সঙ্গে তাদের একাত্মতা বোধ করেন।
''রানিকে ছাড়া আমি একজন বেলিজ হিসাবে নিজেকে চিন্তা করতে পারিনা,'' বলছেন জর্ডানা রিভেরোল। ''আমার কাছে মনে হয়, তিনি আমাদের দেশেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।''
''যখন থেকে আমার জন্ম হয়, তখন থেকেই তাকে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ হিসাবে দেখে এসেছি, তিনি এখনো রানি। তাকে বেলিজদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা কঠিন।''
রানির জন্য নৃত্য

ছবির উৎস, Courtesy of Vanesa Vasquez Rancharan
প্রায় তিন দশক আগে ১৯৯৪ সালে যখন রানী এলিজাবেথ বেলিজ সফরে এসেছিলেন, তার সামনে ঐতিহ্যবাহী মেসতিজো নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন তখনকার নয় বছর বয়সী জর্ডানা।
আড়াই দিনের ওই সফরকে বিশাল সাফল্য হিসাবে দেখা হয়, যখন দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ রানিকে অভিবাদন জানাতে বেলিজের প্রধান শহরে সমবেত হয়েছিল।
''আমার যেটা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে, তা হলো একটা চরম উত্তেজনা চলছিল, '' বলছেন অ্যান্দ্রেয়া গার্সিয়া-রিভারেল, জর্ডানার একজন চাচাতো বোন। সেই সময় তার বয়স ছিল ১০ বছর।
''তখন যে উত্তেজনা চলছিল, তার সামান্য অংশই আমি টের পাচ্ছিলাম। আমার যেটা বেশি মনে আছে, তখন অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়েছিল। আমরা সবাই নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম।''
রানির সম্মানে সেই সময় নেচেছিলেন ১০ বছরের ভেনেসা ভাসকুয়েজ রানচরন। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ছিল, যেন তিনি সব কিছু পণ্ড করে না ফেলেন।
''আমরা নাচের অনেকগুলো কঠিন মুদ্রা তাকে দেখিয়েছিলাম। কিন্তু পুরো সময়টা জুড়ে আমার মনে হচ্ছিল না যে, এটা ঠিক গতানুগতিক কোন অনুষ্ঠান নয়। আমার মনে আছে, তারা আমাদের প্রস্তুত হতে বললো। আমাদের যাতে ভালো দেখায়, আমরা যাতে ঠিকভাবে কাজ করতে পারি, সেটা তারা নিশ্চিত হতে চাইছিল,'' তিনি বলছেন।
সেই সময় বেলিজের মেমোরিয়াল পার্ক আমন্ত্রিত অতিথি আর তাদের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে ভরে গিয়েছিল। যারা অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি, তারা রানিকে একনজর দেখার জন্য আশেপাশের গাছ, বাড়ির ছাদে উঠেছিল।

ছবির উৎস, Courtesy of Andrea Garcia-Riveroll
কিন্তু রানি এলিজাবেথকে নিয়ে যতো আবেগ ছিল বার্বাডোসের মানুষজনের মধ্যে, সেটা দেখা যায়নি এই বছরের শুরুর দিকে ডিউক এবং ডাচেস অব কেমব্রিজের সফরের সময়।
''যখন প্রিন্স উইলিয়াম এখানে আসলেন, তখন এখানে বিক্ষোভ হয়েছে। আমার বিশ্বাস, নব্বইয়ের দশকে হলে এমনটা ঘটতো না,'' বলছেন অ্যান্দ্রেয়া।
''রানি যখন এখানে এসেছিলেন, সেই সময়ের তুলনায় এখন প্রজাতন্ত্রের বিষয় নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হচ্ছে।''
ক্যারিবিয়ানে উপনিবেশ বিরোধিতা
ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর মধ্যে এখন আটটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে রয়েছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তার মধ্যে অন্তত ছয়টি দেশ জানিয়েছে, তারা প্রজাতন্ত্রে পরিণত হতে চায় এবং রানিকে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দিতে চায়।
রানির সিংহাসনে আরোহণের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে যখন রাজপরিবারের সদস্যরা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সফর করেন, তখন এ ধরনের দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
যদিও এসব সফরের প্রতি অনেকের সমর্থন রয়েছে, কিন্তু দাসত্ব থেকে রাজপরিবার কীভাবে সুবিধা পেয়েছে সেটা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে বিক্ষোভকারীরা কমনওয়েলথ দেশগুলো জুড়েই জোরালো দাবি তুলেছেন।
বেলিজে জনসেবা, সংবিধান এবং রাজনৈতিক সংস্কার বিষয়ক মন্ত্রী হেনরি চার্লস আশার ঘোষণা করেছেন, কীভাবে দেশ শাসন করা হবে, সেই বিষয়ে একটি পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা তৈরির জন্য তহবিল বরাদ্দ করা হবে।

ছবির উৎস, PA Media
''ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে উপনিবেশ মুক্তকরণ প্রক্রিয়া জোরালো হয়ে উঠছে। আমাদের স্বাধীনতা পুরোপুরিভাবে পাওয়ার জন্য হয়তো এখনি ঠিক সময়,'' তিনি বলেছেন পার্লামেন্টে।
একইভাবে জ্যামাইকা, বাহামা, গ্রানাডা, অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারমুডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসও রানিকে রাষ্ট্রপ্রধান পদ থেকে সরানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
পরিবর্তনশীল সময়
বেলিজে বিক্ষোভের কারণে রাজপরিবারের প্রথম আনুষ্ঠানিক কর্মসূচীটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিলেন ডিউক এবং ডাচেস অব কেমব্রিজ। তাদের একটি খামারে যাওয়ার কথা ছিল।

ছবির উৎস, Getty Images
কেনসিংটন প্যালেসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ওই সফরটি বাতিল করা হয়েছে কারণ, সেখানকার কম্যুনিটি ঘিরে 'স্পর্শকাতর বিষয় জড়িত ছিল'।
ইন্ডিয়ান ক্রীকে সংরক্ষণ বাদী দাতব্য সংস্থা, ফ্লোরা অ্যান্ড ফা্ওনা ইন্টারন্যাশনাল যে জমি কিনছে, তা নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রিন্স উইলিয়াম ওই সংগঠনের একজন পৃষ্ঠপোষক। এছাড়া সেখানকার একটি গ্রামকে রাজপরিবারের হেলিকপ্টারের অবতরণ কেন্দ্র তৈরি করার বিরুদ্ধেও তারা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
সেই সফরের সময় বেলিজ প্রধানমন্ত্রী জন ব্রিসিনো বলেছেন, দেশের শাসন ব্যবস্থা এবং গণতন্ত্র নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনার সময় এসেছে।
''আমরা, সময়, অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে, আমাদের তার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে,'' তিনি বলেছেন।
''আমাদের এটা নিশ্চিত করতে হবে যাতে দেশের মানুষ উপলব্ধি করে যে তারাই এই দেশের প্রকৃত মালিক।''

ছবির উৎস, PA Media
১৯৮১ সালে যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে বেলিজের বাসিন্দারা তাদের মতামত জানানোর সুযোগ পায়নি যে, তারা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে তাদের দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে চায় কিনা।
রানিকে সরিয়ে দিতে গণভোটের কোন প্রয়োজনীয়তাও রাখেনি দেশের সংবিধান। বরং হাউজ অব রিপ্রেজেন্টিটিভে দুই তৃতীয়াংশ ভোট হলেই এই সিদ্ধান্তের জন্য যথেষ্ট।
১৯৯৪ সালের স্মরণ

ছবির উৎস, 7News Belize
কমনওয়েলথ দেশগুলো জুড়ে যখন রানির সিংহাসনে আরোহণের ৭০ বছর পূর্তি উদযাপিত হচ্ছে, জর্ডানাম ভেনেসা আর অ্যান্দ্রেয়ার কাছে রানির জনপ্রিয়তা কমেনি।
তাদের তিনজনের এখন সন্তান হয়েছে। রানির সামনে সেদিন নৃত্য পরিবেশন করার কথা তার সন্তানদের সঙ্গে গল্প করেছেন।
''সেই দিনের ঘটনা নিয়ে আবার কথা বলতে গিয়ে আমি যেন সেখানে ফিরে গেছি, সেদিনকার পুরো ঘটনাগুলো আবার মনে পড়ে গেছে,'' বলছেন অ্যান্দ্রেয়া।
''আমি আমার বাচ্চাদের বলেছি, তোমরা কল্পনা করে দেখো, আমি রানির সামনে নাচছি। খুব বেশি মানুষ এটা বলতে পারবে না যে, তারা রানির জন্য নেচেছে।''
কিন্তু ১৯৯৪ সালে রানি এলিজাবেথ এবং ডিউক অব এডিনবরাকে যেভাবে স্বাগত জানানো হয়েছিল, সেরকম বড় আয়োজন আর কখনো হয়নি।
সেদিনকার লাল আর সাদা ঐতিহ্যবাহী পোশাকটি এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছেন অ্যান্দ্রেয়া। তার মেয়ে স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে সেটা পরে যায়।

ছবির উৎস, PA Media
রানিকে দেখার জন্য সেদিন যারা ভিড় করেছিল, তাদের বড় একটি অংশ ছিল নারী।
জর্ডানা বলছেন, ''আমার মনে হয়, রানিকে এখানে পাওয়াটা বেলিজ জনগণের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কৌতূহল, গর্ব বা অন্য যে কারণ হোক না কেন, সবাই সেদিন রানিকে দেখতে এসেছিল।''
'বয়সের নতুন সংজ্ঞা'
বর্তমানে যেভাবে রাজপরিবারের ব্যাপারে সামাজিক মাধ্যমে সবাই মতামত তুলে ধরে, সেটা নব্বইয়ের দশকে সম্ভব ছিল না। সামাজিক মাধ্যমে ওই রকম প্রতিক্রিয়ার কারণেই হয়তো এই বছরের শুরুতে রাজযুগলের সফরের সময় ততো বেশি উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি।
কিন্তু মাত্র দুইটি আনুষ্ঠানিক সফরে বেলিজে এলেও রানি এই দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি হিসাবেই থাকছেন।

ছবির উৎস, Garcia-Riveroll, Riveroll, Vasquez Rancharan
''আমি মনে করি, বেলিজের জন্য তার অনেক অবদান আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন। আমাদের টাকায় তার ছবি আছে, তাই বাস্তবেও আমরা তাকে প্রতিদিনই দেখতে পাই,'' বলছেন ভেনেসা।
''আমরা তাকে কখনোই ভুলতে পারবো না।''
তার এই মন্তব্যের সঙ্গে একমত জর্ডানা।
''হয়তো এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত, কিন্তু তিনি সরাসরি এখানে থাকুন বা না থাকুন, আমরা বেলিজবাসী গর্ব অনুভব করি যে, আমাদের একজন রানি আছেন।''
জর্ডানা বলছেন, ''খুব বেশি মানুষ এই উপাধি পায় না আর এতো দীর্ঘ সময় ধরে শাসন করতে পারে না। এটা সত্যিই চিত্তাকর্ষক।''
"কত বছর হলে মানুষকে বয়স্ক বলা যায়, তার নতুন সংজ্ঞা তিনি তৈরি করেছেন, '' বলছেন অ্যান্দ্রেয়া।








