দ্রব্যমূল্য: ফুল, ফল, প্রসাধনী, আসবাবপত্রসহ ১৩৫ পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ শুল্ক, বেড়ে যেতে পারে দাম

পেঁয়াজ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে পেঁয়াজের চাহিদার একটা বড় অংশ মেটানো হয় ভারত থেকে আমদানি করে

বাংলাদেশে আমদানি করা হয় এমন ১৩৫টি পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে।

এর ফলে বিদেশি ফুল, বিদেশি ফল,বিদেশি আসবাবপত্র, সুগন্ধি, প্রসাধনী বা রূপসজ্জা পণ্যসহ অপরিশোধিত সরিষা তেল বা পেঁয়াজের ওপর বাড়তি ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হবে।

চিনি, পেঁয়াজ, গাড়ী, অপরিশোধিত সরিষার তেলসহ আরও কিছু পণ্যের ওপর আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক রয়েছে। আমদানি করা চিনির ওপর শুল্ক রয়েছে ৩০ শতাংশ।পাশাপাশি গাড়ি, গাড়ির টায়ার ইত্যাদির ওপর আগে থাকা সর্বোচ্চ বিশ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ শুল্ক দিতে হবে।

সোমবার রাতে এই নির্দেশনা জানিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

এর ফলে এসব পণ্য আমদানি আরও ব্যয়বহুল হবে এবং ক্রেতাদের এসব পণ্য ক্রয়ে আরো বেশি অর্থ গুনতে হবে।

কারণ আমদানিকারকদের এসব পণ্য আমদানি করতে বিদ্যমান কাস্টমস ট্যারিফ, মূসক, কর ছাড়াও অতিরিক্ত এই নিয়ন্ত্রণ শুল্ক দিতে হবে।

বাংলাদেশে ফল, খাদ্য দ্রব্য, যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বেশিরভাগ পণ্য বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে।

আপেল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিয়ন্ত্রণ শুল্ক আরোপের ফলে আপেলসহ বিদেশি ফলের জন্য বেশি মূল্য দিতে হবে

বর্তমানে বিদেশি ফলের ওপর ৫৮ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক দিতে হয়।

সেখান নিয়ন্ত্রণ শুল্ক দিতে হয় তিন শতাংশ পর্যন্ত।

নতুন নিয়মে এই শুল্ক তিন শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ দিতে হবে।

প্রসাধনী, গাড়ির সরঞ্জাম, সুগন্ধির ওপর এখনো ১০৪ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়।

নিয়ন্ত্রণ শুল্কে এসব পণ্যের দাম আরও বাড়বে।

কেন আমদানি শুল্ক বসালো সরকার?

কর্মকর্তারা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে দেশে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সামলাতে তারা এই নিয়ন্ত্রণ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

মূল্য বৃদ্ধির ফলে ক্রেতারা এসব পণ্য ব্যবহারে বা আমদানিতে নিরুৎসাহিত হবেন বলে কর্মকর্তাদের ধারণা।

কিন্তু দেশেই ফুল, ফল উৎপাদন বা আসবাবপত্র তৈরি হওয়ায় তা বাজারের ওপর প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন তারা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মুখপাত্র সৈয়দ এ মোমেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিলাসবহুল পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা ও আমদানি হ্রাস করার উদ্দেশ্যে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোসহ পৃথিবীর সব দেশই বিলাসবহুল পণ্যের আমদানি কমাচ্ছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নিচ্ছে।''

ভিডিওর ক্যাপশান, বিশ্ব অর্থনীতিতে কীভাবে আধিপত্য করছে মার্কিন ডলার?

''এই লক্ষ্যে আমরা মনে করছি, বিদেশি ফল, ফুল, ফার্নিচার, কসমেটিক্স-এ জাতীয় ১৩৫টি পণ্যের ওপর আমদানি করতে বিদ্যমান যে শুল্ক আছে (শূন্য থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত), এর পরিবর্তে আমরা ২০ শতাংশ পর্যন্ত রেগুলেটরি ডিউটি (নিয়ন্ত্রণ শুল্ক) আরোপ করেছি।''

বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এনবিআরের বড় একটি লক্ষ্য বলে তিনি জানান।

তিনি বলছেন, ফুল ও ফল চাষে বাংলাদেশ যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে।

ফলে বিদেশি ফুল-ফলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে তা দেশের চাষিরা ন্যায্য মূল্য পাবে।

তেমনি বাংলাদেশে ভালো মানের আসবাবপত্র ও প্রসাধনী সামগ্রী উৎপাদন হচ্ছে।

ফলে বিদেশি আসবাব পণ্যের আমদানি কমলে দেশিয় উৎপাদকরা উৎসাহিত হবেন।

সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, বিবিসিকে বলেন মি. মোমেন।

ভিডিওর ক্যাপশান, শ্রীলঙ্কার নজিরবিহীন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ কী?

নিয়ন্ত্রণ শুল্ক দিতে হবে যেসব পণ্যে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • আপেল, আঙ্গুর, কলা, আম, কমলাসহ বিদেশি ফল- ২০%
  • ফুল- ২০%
  • অপরিশোধিত সরিষা তেল- ১০%
  • চিনি- ৩০%
  • পেঁয়াজ- ৫%
  • সুগন্ধি- ২০%
  • দাঁত সুরক্ষার সরঞ্জাম- ২০%
  • প্রসাধনী- ২০%
  • আঠা-১৫%
  • গাড়ি-৩০%
  • আসবাবপত্র- ২০%
  • নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, ফার্স্ট এইড বক্স- ১০%

বাংলাদেশের শুল্ক আইন ১৯৬৯ অনুযায়ী, সংসদের অনুমোদন ছাড়াই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রণ শুল্ক আরোপ করতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৪০৮টি পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ শুল্ক রয়েছে।

ভিডিওর ক্যাপশান, একটি দেশ কেন দেউলিয়া অবস্থায় পড়ে?

শ্রীলঙ্কায় বৈদেশিক মুদ্রার ব্যাপক সংকট এবং ঋণ খেলাপি হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি বেশ কিছু বিলাসী দ্রব্য আমদানিতে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে পাকিস্তান।

করোনাভাইরাসের ধকল কাটিয়ে ওঠার পর বাংলাদেশে গত কয়েকমাসে আমদানি অনেক বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য-পণ্য, জ্বালানি তেল, গ্যাস, কাঁচামালের দাম বেড়েছে, ফলে এসব পণ্য আমদানি করতে গিয়ে ডলারের ব্যাপক চাহিদার কারণে এটির বিনিময় মূল্যও রেকর্ড ছুঁয়েছে

আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

ডলারের বিপরীতে টাকার মান কয়েক দফায় কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৯শে মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশ দেন যাতে তারা ডলারের বাজার এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: