পেনশনের দাবিতে মে দিবসে কলকাতায় যৌনকর্মীদের মশাল মিছিল

শনিবার মধ্য কলকাতায় যৌনকর্মীদের মশাল মিছিল

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান, শনিবার মধ্য কলকাতায় যৌনকর্মীদের মশাল মিছিল
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

কলকাতার যৌনকর্মীরা ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবসের প্রাক্কালে পেনশন ও অন্যান্য অবসর-কালীন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে এক বিরাট মিছিল করেছেন।

শনিবার সন্ধ্যায় 'দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি'র ডাকে কলকাতার সোনাগাছি এলাকার শত শত যৌনকর্মীর ওই সমাবেশ ও মিছিল থেকে দাবি জানানো হয়, ৪৫ বছর পেরোলেই তাদের পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে।

তবে ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা বলছেন, যতদিন না এই পেশাটি শ্রম আইনের আওতায় আসছে ততদিন যৌনকর্মীদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করা কঠিন - তবে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো সুবিধা অবশ্যই তাদের পাওয়া উচিত।

এশিয়ার সবচেয়ে বড় যৌনপল্লী বলে পরিচিত কলকাতার সোনাগাছিতে বেশ কয়েক হাজার যৌনকর্মীকে নিয়ে বহু বছর ধরেই কাজ করছে দুর্বার নামে ওই এনজিও-টি।

এবারের মে দিবসের ঠিক আগে তারা মধ্য কলকাতার অবিনাশ কবিরাজ স্ট্রীট থেকে যে মশাল-মিছিলটি বের করে, তার মূল দাবিই ছিল যৌনকর্মীদেরও শ্রমিকের প্রাপ্য সব অধিকার ও অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে - আর সেটার ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকেই।

মিছিলে একজন মশালধারী ট্রান্সজেন্ডার

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান, মিছিলে একজন মশালধারী ট্রান্সজেন্ডার

কেন পেনশনের দাবি?

দুর্বারের বর্তমান সভাপতি বিশাখা লস্কর বলছিলেন, হাজার হাজার যৌনকর্মী আজও এই ধরনের মৌলিক শ্রম-অধিকারগুলো থেকেই বঞ্চিত।

বিশাখা লস্করের কথায়, "একজন শ্রমিকের যে সমস্ত অধিকার আছে, সমতালিকায় একজন যৌনকর্মীর কাজকেও কাজ হিসেবে নথিভুক্ত করাটাই আমাদের দাবি। তাহলেই আমরা শ্রম-অধিকারগুলো পাব।"

"পাশাপাশি এই পেশায় থাকার জন্য অনেক সময় যৌনকর্মীরা রেশন কার্ড, ভোটার কার্ডের মতো সাধারণ সামাজিক অধিকারগুলোও পান না। যৌনকর্মীদের সন্তানরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না, পড়াশুনো করতে গেলে অসুবিধায় পড়ে।"

সোনাগাছিতে বহু বছর ধরে যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ-করা ও দুর্বারের সাবেক সভাপতি ভারতী দে-ও বিবিসিকে বলছিলেন, "সব পেশাতেই তো পেনশন চালু হয়েছে - ফলে যৌনকর্মীরা কেন বঞ্চিত হবেন?"

"আর এটা এমন একটা পেশা যেখানে পঁয়তাল্লিশের পর আর উপার্জন করার কোনও সুযোগ থাকে না।"

যৌনকর্মীর পেশাও আর পাঁচটা পেশার মতো শ্রমের স্বীকৃতি দাবি করে

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান, যৌনকর্মীর পেশাও আর পাঁচটা পেশার মতো শ্রমের স্বীকৃতি দাবি করে

"ফলে ওই বয়সের পর সরকার তাদের ফ্রি-তে রেশন দিক ও পেনশনের ব্যবস্থা করুক, এটাই আমাদের বক্তব্য।"

কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ধরনা দিতে গিয়ে দিল্লিতেও পেনশন পরিষদে তারা একাধিকবার এই দাবি পেশ করেছেন বলে জানাচ্ছেন ভারতী দে।

বলা সহজ, করা কঠিন?

যৌনকর্মীদের ওই সমাবেশে হাজির ছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কলকাতা পৌরসভার কাউন্সিলর সুনন্দা সরকারও।

তবে তৃণমূল কংগ্রেসের ওই নেত্রীও বিবিসির কাছে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেন - তাদের এই দাবিগুলো মানা হয়তো খুব সহজ নয়।

সুনন্দা সরকার বলছিলেন, "দেখুন, আমি ওখানে শুধু আমন্ত্রিত ছিলাম। আর ওরাও তাদের দাবিদাওয়াগুলো প্রকাশ্য মঞ্চে সবার সামনেই তুলে ধরেছেন। কিন্তু সেগুলো নিয়ে আমার কিছু বলার নেই, এক্তিয়ারও নেই।

"আসলে গণতন্ত্রে সবারই নিজস্ব দাবি তুলে ধরার অধিকার আছে, ওনাদেরও আছে। কিন্তু সেটা কতটা সম্ভব, তা নির্ধারণ করবেন সরকার ও নীতি-নির্ধারকরাই।"

ভারতে কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রীর কার্যালয়

ছবির উৎস, Mint

ছবির ক্যাপশান, ভারতে কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রীর কার্যালয়

শ্রম আইন কী বলে?

বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও সাবেক পার্লামেন্টারিয়ানও তপন কুমার সেনও বিবিসিকে বলছিলেন - অবসরকালীন ভাতার বিষয়টি একটু জটিল, তবে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা নেটে যৌনকর্মীদের ঢুকতে না-পারার কোনও কারণ নেই।

মি সেনের কথায়, "টেকনিক্যালি বলতে গেলে এরা তো ট্রেড ইউনিয়নে সংগঠিত নন। আর ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট অনুযায়ীও আমার তো অন্তত জানা নেই যৌনকর্মীদের কোনও রেজিস্টার্ড এনটিটি আছে বলে।"

"এখন শ্রম আইন তাদের ওপরই প্রযোজ্য হয় যারা ট্রেড ইউনিয়ন আইনে রেজিস্টার্ড। এই কারণেই তারা বঞ্চিত - এটা একটা দিক।"

"কিন্তু দুনম্বর বিষয়টা হল, এই যে পেনশনের দাবি - পেনশন কিন্তু সাধারণ সামাজিক সুরক্ষারও অংশ। আর এই সুরক্ষাটা শুধু শ্রমিকরা নন, যারা ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় নেই সেই সব নাগরিকদেরও প্রাপ্য, তা তিনি যে পেশাতেই থাকুন না কেন।"

যৌনকর্মীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে দুর্বার নিয়মিতই আন্দোলন করে থাকে

ছবির উৎস, The India Today Group

ছবির ক্যাপশান, যৌনকর্মীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে দুর্বার নিয়মিতই আন্দোলন করে থাকে

"এছাড়া সরকারের নানা ধরনের ওয়েলফেয়ার প্রোজেক্ট বা জনকল্যাণ প্রকল্পও আছে, একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের নাগরিক হিসেবে যৌনকর্মীদেরও সেই সব প্রকল্পের আনা দরকার। এটা তাদের ন্যূনতম সামাজিক অধিকারের মধ্যে পড়ে।"

"এদের 'ইউনিভার্সাল সোশ্যাল সেফটি নেটে'র মধ্যে নিয়ে আসাটা অবশ্যই সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কেউ যৌনকর্মী ছিলেন বলে সেই দাবিটা কোনও মতেই অস্বীকার করা যায় না", বলছিলেন ভারতের ওই প্রবীণ শ্রমিক নেতা।

'দুয়ারে সরকার' সোনাগাছিতেও?

তবে কলকাতার যৌনকর্মীদের একটা বড় অভিযোগ হল - সেখানে রাজ্য সরকার ঘরের দুয়ারে ভাতা ও উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়ার যে সব প্রকল্প হাতে নিয়েছে, এই পেশায় থাকার জন্য তারা অনেকেই সেটা পাচ্ছেন না।

স্থানীয় কাউন্সিলর সুনন্দা সরকার অবশ্য সে কথা মানতে রাজি নন।

মিস সরকার বলছিলেন, "দুয়ারে সরকার প্রকল্পের সব সুবিধাই কিন্তু ওনারা পাচ্ছেন। যৌনকর্মীদের যার কাছে যেটুকু ডকুমেন্টস আছে, আধার কার্ড, রেশন কার্ড - তার ভিত্তিতে এগুলো কিন্তু আমরা সব সময় করে দিই।

"এখন ধরুন বাইরে থেকে কেউ এল, বাংলাদেশ থেকে এসে মাত্র এক সপ্তাহ আগে সোনাগাছিতে ঢুকেছে ... তার কোনও কাগজপত্র নেই বলে ওই কেসগুলো কিছু করতে পারি না।"

কলকাতার সোনাগাছি এশিয়ার বৃহত্তম যৌনপল্লী হিসেবে পরিচিত

ছবির উৎস, The India Today Group

ছবির ক্যাপশান, কলকাতার সোনাগাছি এশিয়ার বৃহত্তম যৌনপল্লী হিসেবে পরিচিত

"আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি পশ্চিমবঙ্গ সরকার মহিলাদের জন্য যে সব উন্নয়নমুখী সামাজিক কর্মসূচী নিয়েছে তার সবগুলোই ওরা পাচ্ছেন - শুধু ওরকম দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে, যেখানে আমরা একেবারে অপারগ", বলছিলেন সুনন্দা সরকার।

বস্তুত যৌনকর্মীদের পেশার চরিত্রটাই এমন, যে অন্যান্য চাকরির তুলনায় অনেক আগেই তাদের অবসরে চলে যেতে হয়।

কিন্তু ভারতে যৌনকর্মীদের অবসরের পর পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার স্বপ্ন সত্যি হতে এখনও আসলে অনেক দূরের রাস্তা পাড়ি দেওয়া বাকি।