ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: দুই প্রার্থী এমানুয়েল ম্যাক্রঁ ও মারিন লা পেন কেমন ফ্রান্স গড়ে তুলতে চান

ছবির উৎস, Getty Images
এমানুয়েল ম্যাক্রঁ এবং মারিন লা পেন দেশে ও বিদেশে ভবিষ্যতে যে ধরনের ফ্রান্স গড়ে তোলার কথা বলছেন তা একেবারেই ভিন্ন রকমের।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ডের ভোট হচ্ছে রবিবার, ২৪শে এপ্রিল এবং সেদিন ভোটাররা এই দু'জন প্রার্থীর একজনকে তাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিবেন।
আগামী পাঁচ বছরের জন্য কী তাদের পরিকল্পনা? এমানুয়েল ম্যাক্রঁ ও মারিন লা পেন তাদের ভোটারদের কী কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন?
এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এক নম্বর ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে জনগণের জীবন নির্বাহের খরচ। অতি-দক্ষিণপন্থী নেতা মারিন লা পেনও তার প্রচারণায় এই বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছেন।
কিন্তু তার অন্যান্য বড় ধরনের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সামাজিক আবাসন, ফরাসি নাগরিকদের জন্য তাদের চাকরি ও সামাজিক কল্যাণকে "জাতীয় অগ্রাধিকার" দেওয়া এবং ইসলামিজমের বিরুদ্ধে লড়াই।
তিনি তার সমর্থকদের বলছেন যে এর আগে তারা কখনো এবারের মতো বিজয়ের এতো কাছাকাছি যতে পারেন নি।
অন্যদিকে মধ্যপন্থী নেতা বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ ভোটারদেরকে "আমরা সবাই" এই স্লোগানের মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছেন।
পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তিনি এখন তার মেয়াদকে "সম্পূর্ণ নবায়ন" করার জন্য ভোটারদের প্রতি আহবান জানাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বাম এবং মূলধারার ডান উভয় শিবির থেকেই ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
জীবন নির্বাহের খরচ
মারিন লা পেন মানুষের জীবন নির্বাহের খরচ কমানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ৩০ বছরের কম বয়সী সবার আয়কর বাতিল করতে চান তিনি। জ্বালানির ওপর আরোপিত ভ্যাট ২০% থেকে কমিয়ে ৫.৫% করার পাশাপাশি তিনি একশটি প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকেও ভ্যাট বাতিল করার কথা বলেছেন।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তিনি ১০% বেতন ও মজুরি বাড়াতে চান। আগামী পাঁচ বছর ধরে শিক্ষকদের বেতনও প্রতি বছর ৩% করে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। মহাসড়কগুলো পুনরায় জাতীয়করণের মাধ্যমে সেখানে পরিবহন টোল কমাতে চান ১৫%। এছাড়াও তিনি টিভি লাইসেন্স ফি বাতিল করে সরকারি রেডিও টিভি বেসরকারি খাতে তুলে দিতে আগ্রহী।
অন্যদিকে এমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলছেন, জ্বালানি খাতে খরচ নাগালের ভেতরে রাখার জন্য তার সরকার ইতোমধ্যে কোটি কোটি ইউরো খরচ করেছে। এছাড়া তিনি চাকরিদাতাদের প্রস্তাব দিয়েছেন তাদের কর্মীদের ৬০০০ ইউরো পর্যন্ত বোনাস হিসেবে দেওয়ার জন্য।
তিনিও শিক্ষকদের বেতন বাড়াতে চান, কিন্তু এজন্য তাদেরকে আরো কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং তিনিও টিভি লাইসেন্স ফি বাতিল করতে প্রস্তুত।

অবসর ভাতা বা পেনশন
এমানুয়েল ম্যাক্রঁ চাকরি থেকে মানুষের অবসর নেওয়ার বয়স-সীমা ৬২ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ করতে চান। কিন্তু তার এই নীতি ভোটাররা ভালোভাবে গ্রহণ করেনি, বিশেষ করে বামপন্থীরা। একারণে এখন তিনি ৬৪ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
এছাড়াও তিনি রাষ্ট্রীয় অবসর ভাতা বা পেনশন ৯৫০ থেকে বাড়িয়ে ১,১০০ ইউরো করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মারিন লা পেন অবসর নেওয়ার বয়স ৬২ বছরই রাখতে চান। তবে কেউ ২০ বছর বয়সে কাজ করতে শুরু করলে তিনি ৬০ বছর বয়সে অবসর নিতে পারেন। তিনি বলেছেন ভোটারদের বুঝতে হবে যে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বামপন্থী ভোটারদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন। মারিন লা পেন সর্বনিম্ন রাষ্ট্রীয় পেনশন ১,০০০ ইউরো করতে চান, যা এমানুয়েল ম্যাক্রঁর পরিকল্পনার চেয়ে কম।

ছবির উৎস, Getty Images
অভিবাসন ও নিরাপত্তা
অভিবাসনের প্রশ্নে মারিন লা পেন গণভোট আয়োজন করতে চান। তার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সে প্রবেশ ও ফরাসি নাগরিক হওয়ার আইন আরো কঠোর করা।
এবিষয়ে 'জাতীয় অগ্রাধিকার' নামে তার যে পরিকল্পনা রয়েছে সেটি অত্যন্ত বিতর্কিত এক কর্মসূচি। তার এই প্রস্তাবে বিদেশিদের আগে ফরাসি নাগরিকদেরকে আবাসন ও সামাজিক সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিদেশি নাগরিকদের জন্য যে ৬,২০,০০০ বাড়িঘর রয়েছে সেগুলোকে যেসব পরিবারে পিতামাতাদের মধ্যে অন্তত একজন ফরাসি তাদেরকে দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শুরুর দিকে তিনি মৃত্যুদণ্ডের ওপর গণভোট আয়োজনের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন যে এটি অসাংবিধানিক।
এমানুয়েল ম্যাক্রঁ প্রতিদ্বন্দ্বী মারিন লা পেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তাকে "কর্তৃত্ববাদী" বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে তিনি সংবিধানকে সম্মান করনে না। মিস লা পেনের "জাতীয়তাবাদী এজেন্ডারও" নিন্দা করে মি. ম্যাক্রঁ বলেছেন, "তাতে দেশপ্রেমের কিছু নেই।"
এমানুয়েল ম্যাক্রঁ পুলিশ এবং সামরিক পুলিশ বাহিনীকে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত রাখার অঙ্গীকার করেছেন। একই সাথে ২০৩০ সালের মধ্যে রাস্তায় পুলিশের সংখ্যা দ্বিগুণ করার কথা বলেছেন তিনি।
মারিন লা পেন জেলখানায় কারাবন্দীদের জন্যে আরো ২০,০০০ স্থান এবং অতিরিক্ত ৭,০০০ পুলিশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
হেডস্কার্ফ বা হিজাব
মারিন লা পেন পাবলিক প্লেস অর্থাৎ রাস্তাঘাটে নারীদের হেডস্কার্ফ বা হিজাব পরা নিষিদ্ধ করতে চান এবং নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করলে তাদের জরিমানা করারও প্রস্তাব করেছেন তিনি।
হিজাবকে তিনি "ইউনিফর্ম" হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন যে কট্টরপন্থী ইসলামের ধারকরা এটি আরোপ করেছেন। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলিম বসবাস করে। প্রথম রাউন্ডের ভোটে তাদের ৬৯% অতি-বামপন্থী প্রার্থী জ্য লুক মেলশকে ভোট দিয়েছেন। দ্বিতীয় রাউন্ডের নির্বাচনে মুসলিম ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এবিষয়ে কোনো পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেই এমানুয়েল ম্যাক্রঁর এবং হিজাব নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধেও তিনি তার অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছেন। হিজাব পরিহিত এক নারীর প্রশংসা করেছেন তিনি, যে নারী নিজেকে নারীবাদী বলে দাবি করেছেন। মি. ম্যাক্রঁ বলেছেন, "নির্বুদ্ধিতার বিরুদ্ধে এটাই সেরা জবাব।"
নির্বাচনী সংস্কার
মারিন লা পেন বিজয়ী হলে তিনি কিভাবে তার সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হবেন সেটা এক বড় প্রশ্ন। তিনি জাতীয় ঐক্যের সরকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু জাতীয় পরিষদে তার দল ন্যাশনাল র্যালির আছে মাত্র সাতটি আসন। এবং জুন মাসের নির্বাচনে তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করাও কঠিন হবে।
আইন পরিষদের নির্বাচনে তিনি 'আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব' পদ্ধতি চালু করতে চান। এর অর্থ হচ্ছে- একটি দল যতো ভোট পাবে তার অনুপাতে পরিষদে ওই দলের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হবে। একই সাথে তিনি প্রেসিডেন্টের মেয়াদ বাড়িয়ে সাত বছর করতে আগ্রহী।
তবে তার অন্যতম প্রধান নীতিগুলোর একটি নাগরিকত্ব বিষয়ে গণভোট। অর্থাৎ এবিষয়ে তিনি ভোটারদের মতামতও নিতে চান।
এমানুয়েল ম্যাক্রঁও পার্লামেন্ট নির্বাচনে 'আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব' পদ্ধতি চালু করার পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। তবে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মারিন লা পেন যে গণভোট আয়োজনের কথা বলছেন তার সমালোচনা করে তিনি বলেছেন এথেকে বোঝা যায় যে মিস লা পেন নিজেকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে বলে মনে করেন।
ইউরোপ
এমানুয়েল ম্যাক্রঁ এবারের নির্বাচনকে "ইউরোপের প্রশ্নে গণভোট" হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইউরোপ ফ্রান্সকে বিভিন্ন সঙ্কট ও যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যে তারা ফ্রেক্সিট (ব্রেক্সিট গণভোটের মাধ্যমে ব্রিটেন যেমন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগ করেছে) ইইউ থেকে বের হয়ে যেতে চায়।
মারিন লা পেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগের আসল পরিকল্পনা থেকে ইতোমধ্যে অনেক দূর সরে এসেছেন, যদিও মি. ম্যাক্রঁর শিবির বিশ্বাস করে যে এটাই তার চূড়ান্ত পরিকল্পনা।
প্রথম রাউন্ডের নির্বাচন শেষে মারিন লা পেন বলেছেন, "কেউই ইউরোপের বিরুদ্ধে নয়।" কিন্তু ২০১২ সালে তিনি ফ্রান্সকে ইইউ থেকে বের করে আনার পক্ষে ছিলেন। পরে ২০১৭ সালে তার এই অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে এবং মিস লা পেন বলেন যে তিনি আসলে ইউরো থেকে বের হয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
জার্মানির সাথে সামরিক ট্যাঙ্ক ও যুদ্ধবিমান প্রকল্পসহ সবধরনের সহযোগিতা কর্মসূচিও স্থগিত করতে চান মারিন লা পেন।
রাশিয়া ও নেটো
মারিন লা পেন ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেন। তবে তার দলের ব্যাংক লোনের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ভুলে যাওয়া যাবে না।
তার প্রচারণা দলকে একটি নির্বাচনী প্রচারপত্র ছাপানোর কথা অস্বীকার করতে হয়েছে যাতে রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মারিন লা পেনকে ১০১৭ সালের নির্বাচনের আগে করমর্দন করতে দেখা যাচ্ছে।
তিনি নেটোর সমর্থক নন। তিনি মনে করেন এই জোটে থাকলেও ফ্রান্সকে নেতৃত্ব দেওয়া থেকে সরে আসতে হবে। তার বিশ্বাস যে যুদ্ধের পর "রাশিয়া ও নেটোর মধ্যে নতুন করে কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে।"
এমানুয়েল ম্যাক্রঁ এই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়াও ফ্রান্স বর্তমানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সভাপতি। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর দিকে করা জনমত জরিপে দেখা যায় মি. ম্যাক্রঁর এই ভূমিকা তার পক্ষে গেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
পরিবেশ
মারিন লা পেন তার পরিবেশবাদী মতামতের জন্য পরিচিত নন। তিনি যে শুধু উইন্ড টারবাইন নির্মাণ বন্ধ করতে চান তা নয়, বর্তমানে যেসব টারবাইন আছে সেগুলোও তিনি ভেঙে ফেলতে চান। নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য যেসব ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে সেসবও তিনি বাতিল করতে চান।
ফরাসি মানের সঙ্গে খাপ খায় না এমন খাদ্য আমদানি বন্ধ করতে চান মিস লা পেন। একই সঙ্গে স্কুলের ক্যান্টিনে ৮০% কৃষিপণ্য যেন ফরাসি হয় তার উপরেও জোর দিচ্ছেন তিনি।
এমানুয়েল ম্যাক্রঁ ইতোমধ্যে গ্রিন পার্টির প্রার্থী ইয়ানিক যাদোর সমর্থন আদায় করে নিয়েছেন। তিনি ফ্রান্সে কয়লা ও গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করতে চান। তিনি ছয়টি নতুন পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি চান ফ্রান্সের মোট জ্বালানির ৭৫% আসুক পরমাণু শক্তি থেকে।
অন্যান্য খবর:
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা
ফ্রান্সের গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা নির্বাচনের অন্যতম প্রধান একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এমানুয়েল ম্যাক্রঁ ২০২৭ সালের মধ্যে আরো ৫০,০০০ নার্স ও কেয়ারার নিয়োগ দিতে চান।
মারিন লা পেন অভিযোগ করেছেন যে তার প্রতিদ্বন্দ্বী গত পাঁচ বছরে হাসপাতালের ১৮,০০০ বেড তুলে নিয়েছেন। তিনি এই প্রবণতা বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আরো ১০,০০০ নার্স নিয়োগের কথা বলেছেন।
মি. ম্যাক্রঁ ভোকেশনাল অর্থ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় যেসব শিক্ষায় তার ওপর জোর দিয়েছেন।
সব স্কুলে খেলাধুলা সংক্রান্ত কার্যক্রম বাড়ানোর কথাও বলেছেন তিনি। এবং আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকের স্কুলে ছয় থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা প্রতিদিন আধাঘণ্টা খেলাধুলা করবে।









