ইমরান খান: অনাস্থা ভোট নিয়ে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে তুমুল হট্টগোল, বারবার অধিবেশন মুলতুবি

ছবির উৎস, Reuters
পাকিস্তানে আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারিত হবার কথা। পার্লামেন্টে বিরোধীদের আনা এক অনাস্থা প্রস্তাবে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে আজ, কিন্তু সকালে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হলেও বারবার তা মুলতুবি হয়ে যাওয়ায় ভোটাভুটি এখনও অনুষ্ঠিত হয়নি।
ধারণা করা হচ্ছে মি. খান ভোটাভুটিতে হেরে যাবেন, কারণ কয়েকটি শরীক দল তার সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করায় ইমরান খান পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ফেলেছেন।
মি. খানের দল রবিবার পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিয়ে নতুন নির্বাচনের ডাক দেওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট সেটিকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেওয়ায় এই অনাস্থা ভোট অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
পাকিস্তানের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়। কিন্তু অনাস্থা ভোটের আগে ইমরান খানের সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সংসদের ভেতর তুমল হট্টগোল আর ক্রুদ্ধ বাকবিতণ্ডা শুরু হলে জাতীয় পরিষদের স্পিকার সাময়িকভাবে অধিবেশন মুলতুবি করে দেন।
এর দুঘণ্টা পর আবার অধিবেশন শুরু হয়। জানা যাচ্ছে ইফতারের পর সম্ভবত ভোটাভুটি হবে স্থানীয় সময় রাত আটটা নাগাদ।
বিবিসির একজন সাংবাদিক বলছেন মি. খানের হেরে যাবার বড়ধরনের সম্ভাবনা থাকায় তার সমর্থকরা ভোট যতটা বিলম্বিত করা সম্ভব সে চেষ্টা করেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ইমরান খানের হারার সম্ভাবনা কতটা?
জাতীয় পরিষদের ৩৪২ জন সদস্যের মধ্যে ১৭২ জন মি. খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট দিলে তিনি হেরে যাবেন।
বিরোধী দলের সদস্যরা আজ বিপুল সংখ্যায় পরিষদে উপস্থিত রয়েছেন। বিরোধীরা দাবি করছেন মি. খানের বিপক্ষে ১৮০টি ভোট পড়বে বলে তারা ধারণা করছেন অর্থাৎ তারা আস্থাবান যে মি. খান এই ভোটে টিকতে পারবেন না।
পিএমএলএন বা নাওয়াজ শরীফের পাকিস্তান মুসলিম লিগ পার্টির নেতা শহীদ খাকান আব্বাসি বলছেন বিরোধী দলগুলো থেকে ১৬২টি ভোট নিশ্চিতভাবে মি. খানের বিপক্ষে যাবে এবং এর বাইরে আরও যে দশটি ভোট দরকার তা তারা সহজেই পাবেন বলে মনে করছেন।
অন্যদিকে, ইমরান খানের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দল এমকিউএম, ইমরান খানের তেহরিক-ই ইনসাফের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেবার পর মি. খানের হাতে রয়েছে মাত্র ১৬৪টি ভোট যা তার টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়।
এমনও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে মি. খানের নিজের দলের ডজনখানেকের বেশি সদস্য দলের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দিতে পারেন।
ভোট হচ্ছে যে পটভূমিতে
রবিবার এই প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইমরান খানের নিজের দল এই প্রস্তাব আটকে দেয়।
এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ বিরোধী দলগুলো সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় এবং আবেদন জানায়, যেভাবে অনাস্থা প্রস্তাবটি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে আটকে দেয়া হয়েছে, তা ছিল বেআইনি ও অসাংবিধানিক।
এরপর প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পরামর্শে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেন দেশটির প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু তার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট সুয়ো মোটো রুল জারি করে। সেই রুলের শুনানির পর সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দেয়, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিরোধীদলের আনা অনাস্থা প্রস্তাবটি খারিজ করে জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি বেআইনি কাজ করেছেন, এবং এতে পাকিস্তানের সংবিধানের ৯৫ ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে।
গত ৩ এপ্রিল বিরোধী দলের এমপিরা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, উদ্দেশ্য ছিল তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো। বিরোধীরা আশা করছিলেন, পার্লামেন্টে যেহেতু তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই কাজটা সফল হবে।
কিন্তু সেদিন নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনা। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি দ্রুত এই প্রস্তাব আটকে দেন। তিনি বলেন, সরকার ফেলে দেয়ার জন্য 'একটা বিদেশি রাষ্ট্রের' সঙ্গে 'পরিষ্কার আঁতাত' দেখা যাচ্ছে।
সংকট শুরু হলো কীভাবে
২০১৮ সালের জুলাইয়ে নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসেছিলেন পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। কিন্তু তখনও দেশটির সেনাবাহিনীর ভূমিকা তার বিজয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছে- এমন কথাই প্রচলিত ছিলো।
পাকিস্তানকে ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয়ে নেতৃত্ব দেয়া মি. খান ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই আর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই ধীরে ধীরে বিপাকে পড়তে শুরু করে তার সরকার। এক পর্যায়ে গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান নিয়োগ নিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গেও দ্বন্দ্বে জড়ান তিনি।
আবার রাশিয়া যখন ইউক্রেনে হামলা শুরু করে, তখন তার মস্কো সফরও পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ভালো ভাবে নেয়নি।
এর মধ্যেই তার ক্ষমতাসীন জোটের বড় অংশ এমকিউএম তাকে ছেড়ে বিরোধী জোটে যোগ দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারায় তার সরকার।
এ-ঘটনার কয়েকদিন আগে থেকেই ইমরান খান বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছিলেন, এরা 'বিদেশি রাষ্ট্রের' সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি আরও অভিযোগ করেছিলেন, এই ষড়যন্ত্রের পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্র, কারণ তিনি রাশিয়া এবং এবং চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এজন্যেই তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে এসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই।
তবে ডেপুটি স্পিকার কাসেম সুরি রুল জারি করেন যে, এই অনাস্থা প্রস্তাব পাকিস্তানের সংবিধানের পঞ্চম অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে, যেটিতে রাষ্ট্র এবং সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের কথা আছে।
এরপর ইমরান খান পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেয়ার কথা ঘোষণা করেন। এর ফলে ৯০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানের পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান বিরোধী নেতারা। তারা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবিধানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনেন। এরপরই তারা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে যান এই বলে যে, অনাস্থা ভোট আটকে দিয়ে সরকার তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে।
এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ বিরোধী দলগুলো সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় এবং তাদের আবেদনে বলা হয় যেভাবে অনাস্থা প্রস্তাবটি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে আটকে দেয়া হয় তা ছিল বেআইনি ও অসাংবিধানিক।

ছবির উৎস, EPA/T. MUGHAL
সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির কাছে যে সুপারিশ করেছিলেন তা ছিল বেআইনি, এবং প্রেসিডেন্ট ড. আরিফ আলভি এই লক্ষ্যে যে ঘোষণা করেছিলেন তাও ছিল অবৈধ।
প্রধান বিচারপতি তার রায়ে বলেছেন, এই ভোটটি শনিবার হতেই হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন শনিবার রাতের মধ্যে ভোট না হলে ইমরান খানের সরকার আদালত অবমাননার দায়ে পড়বে।
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শনিবার রাত বারোটা পর্যন্ত চলবে বলে জানানো হয়েছে।
এরই মধ্যে ইমরান খান স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ন'টা নাগাদ তার ক্যাবিনেটের সাথে একটি বৈঠকে বসবেন বলে জানা যাচ্ছে।










