ব্র্যাক: ত্রাণ প্রকল্প থেকে বিশ্বের বৃহৎ এনজিওতে পরিণত হওয়া প্রতিষ্ঠানের সুবর্ণ জয়ন্তী

    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে আসা শরণার্থীদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের লক্ষ্য নিয়ে সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকা শাল্লায় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক।

শাল্লায় যুদ্ধে বিধ্বস্ত একটি জনপদের মানুষজনের জন্য ত্রাণ সহায়তা দিতে কাজ শুরু করেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। সেখানে ১৯৭২ সালের ২১শে মার্চ প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিটি বা ব্র্যাকের।

সেই সংস্থা এখন শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি সংস্থায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের ১০টি দেশে এখন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে সংস্থাটি।

বেসরকারি সংস্থার গণ্ডি ছাড়িয়ে ব্র্যাক এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ইকো-সিস্টেম তৈরি করেছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক ব্যবসাসহ অনেকগুলো নানামুখী উদ্যোগ।

ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে শুরু করলেও পরবর্তীতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সচেতনতা-নানা খাতে কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে সংস্থাটি।

প্রথমে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিটি বা ব্র্যাক নামে শুরু করলেও ১৯৭৩ সালে যখন পুরোদস্তুর উন্নয়ন সংস্থা হিসাবে ব্র্যাক কার্যক্রম শুরু করে, তখন তার নামের বিস্তারিত পরিবর্তন করে রাখা হয় 'বাংলাদেশ রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি'। তবে সংক্ষিপ্ত নাম ব্র্যাকই থাকে।

কিন্তু কীভাবে সাধারণ একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে বিশাল একটি মহীরুহে পরিণত হয়েছে ব্র্যাক?

অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলছেন, স্বাধীনতার ঠিক পরপরেই ব্র্যাকের আবির্ভাব হয়েছিল। একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের উন্নয়ন করতে হলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে যে শক্তিশালী করতে হবে, সেখান থেকে ব্র্যাকের যাত্রা শুরু। ওই সময়ের জন্য এটা ছিল সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

ব্র্যাকের আজকের অবস্থানে আসার পেছনে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে চান এই অর্থনীতিবিদ।

''এই দর্শনগত বিষয়টি, এই বুঝতে পারা যে, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের উন্নয়ন করতে গিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির বিষয়টি হয়তো পেছনে থেকে যেতে পারে। সেই অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার যে দর্শন, এই সাফল্যের পেছনে সেটাই বড় ভূমিকা রেখেছে। সেই সঙ্গে ফজলে হাসান আবেদের ভূমিকা- সময়ের সাথে মিলিয়ে ব্র্যাকের কার্যক্রমকে ঢেলে সাজানো-সেটাও ব্র্যাকের এতদিনের অগ্রযাত্রা এবং টিকে থাকার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রেখেছে'' তিনি বলছেন।

যেভাবে শুরু হয় ব্র্যাকের পথচলা

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজে সরকারের পাশাপাশি ব্র্যাকের মতো আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উন্নয়নমূলক কাজে এগিয়ে আসে।

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফজলে হাসান আবেদ স্বাধীনতার আগে বিদেশি একটি সংস্থায় চাকরি করতেন।

কিন্তু সত্তরের ভয়াবহ দুর্যোগ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর মানুষজনের যে দুর্ভোগ হয়, সেটি দেখে নিজে থেকে করার তাগিদ বোধ করেন।

সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের সময় আরও কয়েকজনের সঙ্গে মিলে 'হেলপ' নামের একটি সংগঠন তৈরি করেন, যারা ভোলার মনপুরা দ্বীপে কাজ করেন। সেখানে তারা ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে ত্রাণ দেয়া, ঘরবাড়ি তৈরি করে দেয়ার কাজ করেন। সেখানকার মানুষের দুর্দশা দেখে তার মনে বড় পরিবর্তন আসে।

স্বাধীনতার পর বিদেশি কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্যার ফজলে হাসান আবেদ বাংলাদেশে এসে উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করেন বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন আফসান চৌধুরী।

গবেষক আফসান চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ''তখন ভারত থেকে অনেক পরিবার ফেরত আসছিল। একদিন ফজলে হাসান আবেদ দেখছিলেন, এই যে মানুষ দেশে আসছে, কিন্তু যুদ্ধে তাদের সমস্ত কিছু হারিয়ে গেছে। তিনি তখন তাদের উন্নয়নে কাজ শুরু করলেন। সেই যে শুরু করলেন, আর পিছু ফেরা হলো না।''

সেখানেই প্রথম প্রতিষ্ঠা করা হয় 'বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন এসিস্ট্যান্ট কমিটি' বা 'ব্র্যাকের'। যুদ্ধে বিধ্বস্ত মানুষজনের ত্রাণ ও পুনর্বাসন করতে তারা কাজ শুরু করেন। বাড়ি বিক্রির ১৬ হাজার পাউন্ড আর কয়েকজন বন্ধুর দেয়া টাকা দিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু হয়।

সিলেটের শাল্লার স্থানীয় তরুণদের সম্পৃক্ত করে প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের তালিকা করা হয়। এরপর তাদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করা হয়। সেখানে ১০ হাজার ২০০ বাড়ি তৈরির একটি প্রকল্প শুরু করা হয়।

সে সময় ব্র্যাকের সাত সদস্যের গভর্নিং বোর্ডের সদস্যরা ছিলেন কবি বেগম সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, কাজী ফজলুর রহমান, আকবর কবির, ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী, এর আর হোসেন এবং ফজলে হাসান আবেদ।

কবি সুফিয়া কামাল হলেন ব্র্যাকের প্রথম চেয়ারম্যান। নির্বাহী পরিচালক হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ফজলে হাসান আবেদ। ১৯৮০ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ব্র্যাকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ হুমায়ুন কবির।

২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন ফজলে হাসান আবেদ।

ব্র্যাকের উন্নতির শুরু

বাড়ি বিক্রি আর জমানো অর্থ দিয়ে কাজ শুরু করলেও, এরপরে বিদেশি দাতা সংস্থা অক্সফাম-জিবির সহায়তা পায় ব্র্যাক।

একটি সাক্ষাৎকারে ফজলে হাসান আবেদ বলেছেন, ১৯৭২ সালের দিকে অক্সফাম-জিবি প্রায় দুই লক্ষ পাউন্ড দিয়েছিল। সেই অর্থ দিয়ে ব্র্যাক অনেকগুলো প্রকল্প নেয়। পরবর্তীতে আরও কিছু বিদেশি সংস্থার সহায়তা পাওয়া যায়।

১৯৭৪ সালের দিকে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করে ব্র্যাক।

সেই ক্ষুদ্র ঋণ, ব্র্যাকের উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ আর সহায়তায় ভাগ্য বদলে গেছে রংপুরের পীরগাছার জরিনা বেগমের মতো লাখ লাখ সুবিধাভোগীর।

দুই ছেলেসহ জরিনা বেগম স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর ২০০৫ সালে ব্র্যাক থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছোট মুদি দোকানের ব্যবসা শুরু করেছিলেন জরিনা বেগম। পরবর্তীতে আরও কয়েক দফায় ঋণ নিয়ে দোকান বড় করেন।

এখন তার বড় দোকান, পাকা বাড়ি, কয়েকটি গরু এবং কয়েক বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে চাষাবাদ করেন। তার মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকার ওপরে।

জরিনা বেগম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''আগে মানুষের বাসায় কাজ করতাম। এখন অনেক মানুষ এসে আমার পরামর্শ চায়। ব্র্যাক আমাকে সহায়তা করেছে, আমিও খাটিছি। ''

গবেষক আফসান চৌধুরী বলছেন, ''ক্ষুদ্র ঋণের বড় সুবিধা হলো, এই নিম্নবিত্ত মানুষগুলো তখন পুঁজি পেলো কিছু করার জন্য।''

তিনি বলছেন, ''ব্র্যাক প্রথম দিকে দুইটি কার্যক্রম গুরুত্বের সঙ্গে শুরু করলো। একটি হচ্ছে বয়স্কদের শিক্ষার পাশাপাশি গ্রামে শিশু-তরুণদের শিক্ষা দেয়ার কার্যক্রম শুরু করলো। দ্বিতীয়ত, নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করলো।''

ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ সালেহ বলছেন, ''মাইক্রোফাইন্যান্স সম্পর্কে মানুষের অনেক ভুল ধারণা আছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজনও নেই, এটা একটা সার্ভিস।

''নব্বইয়ের দশকে মাইক্রো ক্রেডিটকে অলীক একটা ব্যাপার হিসাবে সেল করা হয়েছিল, সেটা বাস্তবসম্মত ছিল না। কিন্তু একটা মানুষকে দারিদ্র থেকে বের করতে হলে বেশ কিছু সাপোর্ট দিতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিক উপকরণ- সেদিক থেকে মাইক্রো ক্রেডিট একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ'' বলছেন মি. সালেহ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রামের সঙ্গে অংশিদারিত্ব তৈরি করলো, গ্রামের মানুষের ভূমিকা প্রথমে ছিল। সে সময় আন্তর্জাতিকভাবে যে ত্রাণ এসেছে, সেটা ভালোভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, এনজিওদের হাতে সেটা হয়েছে।

ড. নাজনীন আহমেদ বলছেন, ''বাংলাদেশের উন্নয়ন মিরাকল যদি আমরা বলি, কীভাবে বাংলাদেশ তলাবিহীন একটি ঝুড়ি থেকে আজকের অবস্থানে এসেছে, সেখানে যে কয়টি উপাদান কাজ করেছে, তার একটি বড় খাত হচ্ছে এনজিও খাত। সেখানে ব্র্যাক একটি পথিকৃৎ এনজিও।''

সে সময় বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশটি আসতো বিদেশি ঋণ বা অনুদান থেকে। আশির দশকের দিক থেকে ব্র্যাক চিন্তা করতে শুরু করলো, আমরা বিদেশি টাকার ওপর নির্ভর করে সারাজীবন চলতে পারবো না। তখন তারা নির্ভরশীলতা তৈরি করতে শুরু করলো।

একসময় ক্ষুদ্র ঋণ ও নানা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে ব্র্যাক কাজ করলেও আস্তে আস্তে তাদের নানা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়।

১৯৭৮ সালে জন্ম হয় ব্র্যাকের অন্যতম ব্যবসাসফল সহযোগী প্রতিষ্ঠান আড়ং, যেখানে তৃণমূল নারীদের হাতে তৈরি নানা পণ্য বিক্রি হয়।

পর্যায়ক্রমে কোল্ড স্টোরেজ, পাস্তুরিকৃত দুধ ও দুগ্ধজাতীয় পণ্যের ব্যবসা, উচ্চশিক্ষা, বিনিয়োগ, ও ব্যাংক।

ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ সালেহ বলছেন, '' এন্টারপ্রাইজগুলো শুরু হয়েছিল বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চিন্তা থেকে। যেমন আড়ং তৈরি হয়েছিল গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং তাঁতিরা যাতে সময়মত দাম পায়, সেই চিন্তা থেকে। তারপর যখন দেখা গেল কাজটা ভালো হয়েছে, তখন সেটা বড় হয়ে প্রফিটেবল একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।''

তিনি জানান, ব্র্যাক যে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, সেখানে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া অর্থ বড় একটি সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক দাতাদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই অর্থ যোগান বাড়ছে, যা উন্নয়নে কাজে লাগছে।

চারাগাছ থেকে বিশাল মহীরুহ

ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ১০টি দেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় বেসরকারি সংস্থা বলে মনে করা হয় সংস্থাটিকে।

ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ১১ কোটির বেশি মানুষকে সেবা দিচ্ছে। কর্মী সংখ্যা রয়েছে ৯০ হাজারের বেশি।

দেশের বাইরে কাজ করার জন্য তৈরি হয়েছে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের। ২০০২ সালে আফগানিস্তানে কাজ করার মাধ্যমে দেশের বাইরে কর্মকাণ্ড শুরু হয়।

বাংলাদেশ ছাড়াও কাজ করছে মিয়ানমার, রোয়ান্ডা, উগান্ডা, তানজানিয়া, লাইবেরিয়া, সাউথ সুদান, সিয়েরা লিওন, আফগানিস্তান ও ফিলিপিন্সে।

ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ সালেহ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই স্যার ফজলে হাসান আবেদ প্রাতিষ্ঠানিকরণের দিকে জোর দিয়েছেন যেন এটা কোন ব্যক্তি-নির্ভর সংগঠন না হয়। এখানে যেন কাজের একটা সংস্কৃতি থাকে, একটি প্রক্রিয়া থাকে।''

''আমাদের যে কাজগুলো করা হয়েছে, তার একটি বড় রকমের ফোকাস ছিল আউটকামের দিকে, ফলাফলের দিকে। আড়ং, ব্র্যাক ব্যাংক- আমাদের সব প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে দেখবেন, সেখানে প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।''

ব্র্যাক এখন মূলত তিনটি লক্ষ্যে কাজ করে। একটি হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। এখানে ১০টি প্রকল্প রয়েছে। পাশাপাশি সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ রয়েছে। সেই সঙ্গে ব্র্যাক ব্যাংকের মতো কিছু কিছু খাতে ব্র্যাক বিনিয়োগ করেছে।

পরিবার কেন্দ্রিকতার অভিযোগ

ব্র্যাকের বিরুদ্ধে সমালোচকদের একটি বড় অভিযোগ, এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদগুলোয় স্যার ফজলে হাসান আবেদের পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন।

এর জবাবে ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ সালেহ বলছেন, আমাদের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান, সদস্যরা কিন্তু পরিবারের কেউ নন।

''আসলে দেখা উচিত, যারা যে পদে রয়েছে, তারা সেই পদের জন্য যোগ্য কিনা। তারা ঠিক মতো দায়িত্ব পালন করতে পারেন কিনা। আমাদের কিন্তু অনেক অপশন ছিল। আমার দিক থেকে যদি বলি, আমি জাতিসংঘসহ অনেক জায়গায় কাজ করেছি, বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এই পদে এসেছি। আমরা সবাই বেতনভোগী, অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে থাকলে আরও বেশি বেতন পেতাম। আমরা আসলে একটা তাড়না থেকে কাজ করতে এসেছি।''

''আমরাও সবাই সীমিত সময়ের জন্য আছি, কিন্তু সারাজীবন থাকবো না। একটা সময় অন্যরাও আসবেন সামনে,'' তিনি বলছেন।

আরেকটি অভিযোগ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা বলা হলেও, ব্র্যাক এখন অনেকাংশে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে আসিফ সালেহ বলছেন, ''এই অভিযোগ একেবারেই সত্যি নয়। আমাদের প্রতিবছরের বাজেটের বেশিরভাগ টাকা যায় উন্নয়নমূলক খাতে। সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের কাজটাও কিন্তু উন্নয়নমুলক, এখানে ৬৫ হাজার কারুশিল্পীর কর্মসংস্থান হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য- বিভিন্ন খাতের পেছনে আমাদের বড় অংকের ব্যয় হয়।''

''এই অভিযোগটা আসলে শহরের মানুষ করেন, যারা ব্র্যাকের এসব সার্ভিস দেখেন না। তারা ব্র্যাকের ব্যাংক, আড়ং এগুলোই বেশি দেখেন। কিন্তু প্রান্তিক মানুষ সবাই এর বিষয়ে জানেন,'' তিনি বলছেন।

নারী শিক্ষা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গিয়ে অনেক সময় বিতর্কের মুখে বা বিরোধিতার মুখোমুখিও হয়েছে ব্র্যাক।

অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলছেন, ''কাজের পথ যখন তারা তৈরি করেছে, প্রথম দিকে হয়তো সহজ ছিল না। অনেক সময় তারা এমন অনেক প্রোগ্রাম গ্রামীণ অঞ্চলে হাতে নিয়েছে, সেগুলো হয়তো সমানভাবে সব এলাকায় কাজ করেনি। হয়তো কোন কোন এলাকায় একটু ধীরে গেলে হতো। সেখানে ধাক্কা দিতে গিয়ে একটি কনফ্লিট হয়েছে। সেখানে কৌশলে যাওয়া দরকার, সেটা পরবর্তীতে ব্র্যাক করেছে।''

আগামী ৫০ বছরে কোথায় যাবে ব্র্যাক

ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী আসিফ সালেহ বলছেন, সবসময়েই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের কাজের ধরন পাল্টেছে ব্র্যাক, নীতি নিয়েছে। ভবিষ্যতেও তারা সেটা অব্যাহত রাখবেন।

তিনি বলছেন, ''৫০ বছর আগে ব্র্যাক ছিল একটি রিলিফ অর্গানাইজেশন। শরণার্থীদের সেবার জন্য শাল্লায় ১০ হাজার ২০০ বাড়ি তৈরি কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু শুরু থেকেই ব্র্যাক ডাইনামিক থেকেছে। এর মূল কারণ হলো, সামাজিক সংগঠন হিসাবে কাজ করার সময় সমস্যা যেরকম পরিবর্তন হবে, আমাকে সেই সমস্যার সমাধানও বের করতে হবে।''

''আগামী ৫০ বছরে সমাজের যে পরিবর্তন আসবে, সারা পৃথিবীতেই পরিবর্তন হচ্ছে, সেই সময় যদি আমরা সমাধান নিয়ে আসতে পারি, তাহলে আমরা মানুষের রিলেভেন্ট হিসাবে থাকবো। মানুষের কাজে না থাকতে পারলে তো আর ব্র্যাকের থাকার দরকার হবে না।''

অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলছেন, 'আমার কাছে মনে হয়, তারা এন্টারপ্রাইজ তৈরি করলেও, গরীব বা চরম দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করার. দারিদ্র বিমোচনের যে জায়গাটায় ব্র্যাক বরাবর কাজ করেছে, সেখানে যেন তাদের মনোযোগটা আরও শক্তিশালী থাকে।''