ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: অলিগার্ক কারা, তারা কেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী?

ছবির উৎস, Getty Images
রাশিয়া, ইউক্রেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে সংঘাত যতই বাড়ছে, আবারো আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন রাশিয়ার অলিগার্করা।
রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বেশ কিছু ব্যাংক এবং পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তিবর্গের অর্থ লেনদেনের উপর অবরোধ আরোপ করেছে।
অলিগার্কদের অনেকেই এখন এই চলমান সংঘাতের মাঝে পড়ে চরম বিপাকে রয়েছেন।
- ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধের সর্বশেষ খবর - বিবিসি বাংলার লাইভ আপডেট
- স্বৈরশাসকের পতন হবে - পুতিনকে বাইডেনের হুঁশিয়ারি
অলিগার্ক শব্দটি কিভাবে এল?
অলিগার্ক শব্দটির অনেক পুরনো ইতিহাস রয়েছে। প্রথাগত অর্থে অলিগার্কি ধারার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী এমন একজন হলেন অলিগার্ক। এই মতধারার রাজনীতিতে ছোট একটি গোষ্ঠী শাসকের ভূমিকায় থাকে।
কিন্তু আজকের যুগে কিছু রাশিয়ান ধনাঢ্য ব্যক্তিদেরই অলিগার্ক হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর যাদের উত্থান হয়েছে। তারা খুবই ধনাঢ্য, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এবং ক্ষমতাসীনদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে তাদের ওঠবস, অলিগার্ক হিসেবে তাদের পরিচিতি।
দুটি গ্রিক শব্দ, অলিগই এবং আরখেন যুক্ত হয়ে অলিগার্ক শব্দের উৎপত্তি। অলিগই অর্থ 'গুটিকতক' আর আরখেন অর্থ 'শাসন করা'।

ছবির উৎস, Getty Images
অতএব বলা যেতে পারে একজন অলিগার্ক হলেন শাসক গোষ্ঠীর একজন সদস্য। সমাজের বাকি সবার সাথে ধর্ম, আর্থিক প্রতিপত্তি, আভিজাত্য এমনকি ভাষায়ও তাদের পার্থক্য থাকতে পারে।
এই ধরনের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা বেশিরভাগ সময় নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ করেন। আর সেজন্য প্রায়শই দুরভিসন্ধিমূলক পন্থা বেছে নেন।
আজকের দিনের অলিগার্ক কারা?
আজকের দিনে অলিগার্ক হলেন তারাই যারা ব্যাপক অর্থ বিত্তের অধিকারী, মূলত রাষ্ট্রের সাথে নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে বিত্তশালী হয়েছেন।
এরকম ব্যক্তিদের উদাহরণ দিতে হলে যুক্তরাজ্যে রুশ ব্যবসায়ী, চেলসি ফুটবল ক্লাবের মালিক রোমান আব্রামোভিচের কথা বলতে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তিনি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অনেক স্থাবর সম্পদ হস্তগত করে সেগুলো বিক্রি করেছিলেন। যারা মূল্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চৌদ্দ বিলিয়ন ডলার।
আর একজন হলেন সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি'র সাবেক কর্মকর্তা এবং ব্যাংকার আলেক্সান্ডার লেবেদেভ। তার ছেলে ইয়েভগেনি লেবেদেভ লন্ডন ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড কাগজের সত্ত্বাধিকারী। ব্রিটিশ নাগরিক ইয়েভগেনি ব্রিটিশ হাউজ অফ লর্ডসের একজন সদস্য।
ইউক্রেনের নড়বড়ে পরিস্থিতির জন্য সেখানকার সমাজ ব্যবস্থা, ব্যবসা ও রাজনীতির উপর এই অলিগার্কদের ব্যাপক প্রভাবকে দায়ী করেছে কিয়েভভিত্তিক সংস্থা ইউক্রেনিয়ান ইন্সটিটিউট ফর দা ফিউচার।

ছবির উৎস, Getty Images
এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর স্বাধীন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট লিওনিড কুসমা'র সময়ে 'পুরনো অলিগার্ক' গোষ্ঠী সমৃদ্ধি লাভ করেছে।
"অলিগার্করা তাদের বেশিরভাগ সম্পদ অর্জন করেছেন সেখানকার কর্মকর্তাদের সাথে আঁতাতের মাধ্যমে। অথবা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি সম্পদের বেসরকারিকরণের মাধ্যমে। এরপর থেকে ব্যবসা বাণিজ্য সচল রাখার জন্য তাদের অন্যতম পন্থা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপরে নিয়ন্ত্রণ", সংস্থাটি এমনটিই বলেছে তার প্রতিবেদনে।
কিভাবে এত অর্থের মালিক হলেন তারা?
২০১৯ সালে এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ভিক্টর আন্দ্রুসিভ বলেছিলেন, অলিগার্করা হলেন "একটি বিশেষ শ্রেণীর" মানুষ, এরা কাজ করেন একটি 'বিশেষ পদ্ধতিতে', তাদের জীবন-যাপন এবং প্রভাব বিস্তারের পদ্ধতিও বিশেষ ধরণের।"
"তারা আসলে ঠিক ব্যবসায়ী নন। তারা ধনী ব্যক্তি, কিন্তু যেভাবে তারা ধনী হয়েছেন তা একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে যেমন হয় তার থেকে ভিন্ন। তারা নিজেরা ব্যবসা তৈরি করেননি বরং তারা রাষ্ট্রের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে হস্তগত করেছেন", ওয়াশিংটনের উইলসন সেন্টারে এক অনুষ্ঠানে তিনি এভাবেই অলিগার্কদের বর্ণনা দিয়েছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
রাশিয়াতে এত অলিগার্ক কেন?
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও অলিগার্ক রয়েছেন। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যা ঘটেছে সেজন্যেই রুশ অলিগার্কদের নিয়ে এত আলাপ হয়।
সেবছর ক্রিসমাসের দিনে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পদত্যাগ করেছিলেন মিখাইল গর্বাচভ। তিনি বরিস ইয়েলৎসিনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। যিনি রাশিয়া রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।
এর আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট যুগে কোন ব্যক্তি মালিকাধীন সম্পদ ছিল না। তবে এরপর পুঁজিবাদী রাশিয়ায় ব্যাপকভাবে বেসরকারিকরণ হয়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি, আর্থিক ও শিল্প খাতে।
যার ফল হল, নব্বই-এর দশকে বহু মানুষ রাতারাতি বিত্তশালী হয়ে উঠেছিলেন। সেসময় রাষ্ট্রের সঠিক জায়গায় যোগাযোগ ও অবস্থান থাকলে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতের বিশাল অংশ খুব সহজেই নিজের কবজায় নেয়া সম্ভব হতো, এমনকি তেল, গ্যাস ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ পর্যন্ত যার বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
এসব সম্পদ হস্তগত করার জন্য তারা সরকারি কর্মকর্তাদের মোটা অংকের অর্থ দিয়ে হাত করে নিতেন। অথবা নিজেদের কোম্পানিতে বড় কোন পদে বসিয়ে দিতেন।
অলিগার্করা তেলক্ষেত্র, স্টিল কারখানা, বড় প্রকৌশল কোম্পানি বা গণমাধ্যমের মালিক ছিল। কর্মকর্তাদের সাথে আঁতাতের কারণে প্রায়শই তারা কর ফাঁকি দিতে সক্ষম হতেন।
এই অলিগার্করাই প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিনের সমর্থক ছিলেন এবং ১৯৯৬ সালে তার নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপক অর্থায়ন করেছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
পুতিন ও অলিগার্ক
ইয়েলৎসিনের পর যখন ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতায় আসীন হলেন, তিনি অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলেন, নিজের কাজে ব্যবহার করা শুরু করলেন। যারা তার প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য বজায় রেখেছেন তারা আরও সাফল্যের মুখ দেখেছেন।
আর পুরনো অলিগার্কদের মধ্যে যারা পুতিনের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেননি তাদের দেশ থেকে পালাতে বাধ্য করা হয়েছে। যেমন প্রখ্যাত ব্যাংকার বরিস বেরেযভস্কি। একসময় রাশিয়ার সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি মিখাইল খদরকভস্কি এখন লন্ডনে বসবাস করেন।
২০১৯ সালে ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকা ভ্লাদিমির পুতিনকে অলিগার্ক সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তার জবাবে তিনি বলেছিলেন, "অলিগার্ক বলে এখন আর আমাদের কিছু নেই।"
কিন্তু পুতিনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন অনেকেই তার পৃষ্ঠপোষকতায় বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছেন।
ছোটবেলায় পুতিনের সাথে একই জুডো ক্লাবে যেতেন বরিস রটেনবার্গ। তাকে 'পুতিনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন একজন ব্যবসায়ী' হিসেবে ব্রিটিশ সরকার উল্লেখ করেছিল। ফোর্বস ম্যাগাজিনের মতে মি. রটেনবার্গ এক দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ সম্পদের মালিক।
পূর্ব ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক আলাদা রাষ্ট্র গঠন করার পর ভ্লাদিমির পুতিন যখন তাদের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তখন মি. রটেনবার্গ এবং তার ভাই আরকাদে রটেনবার্গ দুজনেই ব্রিটিশ সরকারের অবরোধের তালিকায় ছিলেন।
ইউক্রেনে রুশ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, জাপান অনেক অলিগার্কের উপরে অবরোধ আরোপ করেছে। যা সামনে আরও কঠোর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।









