বেইজিং অলিম্পিকস: নানা প্রতিকূলতার মাঝে শুরু হয়েছে শীতকালীন অলিম্পিকস

ইই ও তার মা
ছবির ক্যাপশান, উৎসাহী আইস স্কেটার ইই-র (ডানে) মত সাধারণ চীনা নাগরিকরা বেইজিং অলিম্পিক ভেন্যুতে ঢোকার অনুমতি পাচ্ছেন না কোভিডের কারণে

কয়েক দশকের মধ্যে নজিরবিহীন এক কঠিন পরিস্থিতির মাঝে বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে শীতকালীন অলিম্পিক গেমস। একদিকে, কোভিড-১৯ নিয়ে চীনে কঠোর বিধিনিষেধের বেড়াজাল, অন্যদিকে চীনে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ তুলে পশ্চিমা কিছু দেশের গেমস বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা।

এত কিছুর মধ্যেও বেইজিংই একমাত্র শহর যেটি গ্রীষ্মকালীন এবং শীতকালীন দুই অলিম্পিকেরই স্বাগতিক শহর হবার মর্যাদা পেলো।

যেখানে অলিম্পিক ইভেন্টগুলো হচ্ছে সেখানে বরফের যে ঢাল তার বেশিরভাগটাই মানুষের তৈরি।

ভেতরে যে বরফের প্রতিযোগিতার রিংক তৈরি করা হয়েছে, সেখানে বরফ যাতে না গলে তার জন্য হিমশীতল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে গম্বুজাকৃতি স্টেডিয়ামের একপাশে বসানো বিশাল বিশাল ফ্রিজারের মাধ্যমে জানাচ্ছেন বেইজিং থেকে বিবিসি নিউজের রবিন ব্রান্ট।

বেইজিংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকস চলবে চৌঠা ফেব্রুয়ারি থেকে বিশে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ১০৯টি আলাদা ইভেন্টে প্রতিযোগিতা করছেন প্রায় তিন হাজার অ্যাথলেট।

এরপরে হবে শীতকালীন প্যারালিম্পিক্স- চৌঠা মার্চ থেকে ১৩ই মার্চ অবধি। যেখানে ৭৮টি ইভেন্টে প্রতিযোগিতা করবেন প্রায় সাড়ে সাতশ' অ্যাথলেট।

line

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

শিশু ইই আইস স্কেটিং করছে
ছবির ক্যাপশান, বিধিনিষেধ থাকলেও অলিম্পিকস নিয়ে ইই দারুণ উদ্দীপ্ত

টিভিতেই অলিম্পিক উপভোগ

কীভাবে চীন এই শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজনকে বাস্তবে সম্ভবপর করে তুলেছে তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই ছয় বছরের কিশোরী আইস স্কেটার ইই-র। তার ও তার পরিবারের সাথে কথা বলেছেন বিবিসির রবিন ব্রান্ট।

এই অলিম্পিকে গেমস দেখার জন্য ইই-র তর সইছিল না। বেইজিংয়ে প্রথম যখন অলিম্পিক হয়েছিল, তখন ইই-র জন্মই হয়নি। এই অলিম্পিক নিয়ে তার প্রবল উৎসাহ।

"সবরকম কলাকৌশল পুরো রপ্ত না করে সে ছাড়বে না," আইস স্কেটিং শেখার ক্লাসে মেয়ের অনুশীলন দেখার পর বলছিলেন তার মা।

কিন্তু অলিম্পিক নিয়ে আগ্রহীদের পাওনা শুধু ঐটুকুই।

কারণ ইই এবং তার মা অলিম্পিকের কোন ইভেন্টে ঢুকতে পারবেন না। বেইজিংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকের আসর বসলেও প্রায় কারোরই সেখানে ঢোকার অনুমতি নেই।

চীনে যাতে একজনও কোভিড আক্রান্ত না হয় সেজন্য দেশটি যে "জিরো কোভিড" নীতি নিয়েছে সেই কঠোর নীতি বাস্তবায়নের নতুন উদ্যোগ চলছে এখন দেশটিতে।

কাজেই সাধারণ জনগণকে অলিম্পিক দেখার জন্য কোন টিকেট বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বেইজিং শীতকালীন অলিম্পিকের ম্যাসকট এবং প্যারালিম্পিকের ম্যাসকটের সামনে ছবি তুলছে অনেক অলিম্পিক উৎসাহী

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, বেইজিং শীতকালীন অলিম্পিকের ম্যাসকট এবং প্যারালিম্পিকের ম্যাসকটের সামনে ছবি তুলছে অনেক অলিম্পিক উৎসাহী

একমাত্র ক্ষমতাসীন কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলোর কর্মচারীরা আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে ইভেন্ট দেখতে পারবেন। তারপরেও অলিম্পিক স্টেডিয়ামে ঢোকার জন্য তাদের টেস্টিং এবং কঠোর বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।

আর উৎসাহী সাধারণ মানুষকে খেলা দেখতে হবে টিভির পর্দায়।

বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, তারা কিছুটা হতাশ হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে টিভিতেই আনন্দ উপভোগের জন্য তৈরি।

বেইজিংএর অলিম্পিক পার্কে বরফে জমে যাওয়া একটি খালের ওপর স্কেটিং করছেন এক ব্যক্তি

ছবির উৎস, CHINA NEWS SERVICE VIA GETTY

ছবির ক্যাপশান, বেইজিংএর অলিম্পিক পার্কে বরফে জমে যাওয়া একটি খালের ওপর স্কেটিং করছেন এক ব্যক্তি

কোভিড ঠেকাতে কঠোর বিধিনিষেধ

কোভিডের বিস্তার ঠেকাতে চীন যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তার একটি অংশ হল মাঠে সাধারণ দর্শকদের ঢুকতে না দেয়া।

এছাড়াও ভাইরাস যাতে না ছড়ায় তার জন্য অ্যাথলেট এবং কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে অলিম্পিক এলাকার ভেতরে এবং তাদের থাকতে হচ্ছে নির্দিষ্টভাবে বেঁধে দেয়া গণ্ডি বা 'বাবল্'এর মধ্যে। ওই গণ্ডির বাইরে তাদের বেরনো নিষেধ।

যাদের একটি বাবল্ থেকে অন্য আরেকটি বাবল্-এ যাবার প্রয়োজন হবে, তাদের সেজন্য সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে হবে। তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে গাড়ি যদি কোন দুর্ঘটনায় পড়ে, যেখানে সাধারণ মানুষ জড়িত, সেখানে তারা যেন কোন অবস্থাতেই সাধারণ মানুষের সামনাসামনি না যান, তারা যেন নিজেদের গাড়ির ভেতরেই থাকেন।

কোভিডের কড়াকড়ি ছাড়াও এই অলিম্পিকের আরেকটি বিতর্কিত দিক হল আমেরিকা, ব্রিটেন এবং আরও ১২টির মত দেশের উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের এই অলিম্পিক বয়কট। চীনের মানবাধিকার রেকর্ডের ইস্যু তুলে তারা এই অলিম্পিকে যোগ দেননি।

তবে, চীনা নেতারা এবং চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কূটনৈতিক এই বয়কটকে মোটেও আমল দিচ্ছেন না। তারা বলছেন এটা গেমসের "রাজনীতিকরণ"।

line

আরও পড়তে পারেন:

শিনজিয়াংয়ে চীনের প্রচারণা ভিডিও

ছবির উৎস, Xinjiang regional media’

ছবির ক্যাপশান, বেইজিং ২০২২ অলিম্পিকের সরকারি স্লোগান হল - 'অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য একসাথে পথচলা'

'অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য একসাথে পথচলা'

চীনের সরকার এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো অলিম্পিকস আয়োজনে খরচ করছে তিনশ নব্বই কোটি ডলার।

স্কেটিংসহ কিছু ইভেন্ট হচ্ছে বেইজিংয়ের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে।

স্কি ও স্নোবোর্ডিং জাতীয় ইভেন্ট - যেগুলোর জন্য উন্মুক্ত জায়গা প্রয়োজন - সেগুলো হবে বেইজিংয়ের কিছুটা বাইরে।

এসব জায়গায় যেহেতু তুষারপাত হয় খুবই কম, তাই চীন প্রায় ১২ লক্ষ ঘনমিটার কৃত্রিম তুষার তৈরি করেছে।

রাশিয়ার সোচিতে ২০১৪ সালে শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজনের সময় সেখানেও কৃত্রিমভাবে তুষার তৈরি করা হয়েছিল। কারণ সোচি রাশিয়ার সবচেয়ে উষ্ণ অঞ্চলগুলির একটি।

বেইজিং ২০২২ অলিম্পিকের সরকারি স্লোগান হল - 'অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য একসাথে পথচলা'।

বাসস্টপে, শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে সর্বত্র এই বাণী লেখা পোস্টার সাঁটা হয়েছে। হাস্যোজ্জ্বল শিশুদের নাচ গানে সমৃদ্ধ প্রচারণা ভিডিও ছাড়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে।

শি জিনপিং-এর সরকার গত মাসে শিনজিয়াংয়ে এই ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে সংখ্যালঘু উইঘুর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চালানো গণহত্যার অভিযোগ চীন অস্বীকার করে আসছে।