ইতিহাসের সাক্ষী: কীভাবে হয়েছিল কম্পিউটার গেম বিপ্লবের সূচনা

উনিশ সত্তরের দশকে পং ছিল অন্যতম জনপ্রিয় কম্পিউটার গেম - যা ঘরের টিভির পর্দায় খেলা যেতো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, উনিশ সত্তরের দশকে পং ছিল অন্যতম জনপ্রিয় কম্পিউটার গেম - যা ঘরের টিভির পর্দায় খেলা যেতো

কম্পিউটার গেম বা ভিডিও গেম এখন একটা বয়সের ছেলেমেয়েদের এতটাই প্রিয় যে তারা একবার গেম খেলতে বসলে কম্পিউটার ছেড়ে উঠতে চায় না। এই জনপ্রিয়তা অনেক অভিভাবকের উদ্বেগের কারণও হয়ে উঠেছে।

কিন্তু কীভাবে প্রথম ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়েছিল এই কম্পিউটার গেম?

১৯৭০এর দশকে বিপুল জনপ্রিয় হওয়া কম্পিউটার গেম পংএর অন্যতম স্রষ্টার সাথে কথা বলেছেন বিবিসির লুইস হিদালগো - যা নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্ব।

১৯৭২ সালের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের এক বাড়ির গ্যারাজে এমন এক জিনিস উদ্ভাবিত হলো - যা আজ শত শত কোটি ডলারের বিশ্বব্যাপি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

"আসলে এটা সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের একজন ইঞ্জিনিয়ারের জন্য একটা প্রশিক্ষণ প্রকল্প হিসেবে। তো আমরা এটা নিয়ে কাজ করতে করতে কিছু জিনিসকে একটু উন্নত করতে সক্ষম হলাম" - বলছিলেন নোলান বুশনেল, পং-এর নির্মাতাদের একজন এবং কম্পিউটার গেম কোম্পানি আটারির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

টিভির পর্দায় দুজনে খেলা যায় পং

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, টিভির পর্দায় দুজনে খেলা যায় পং

"এরকমই একটা পরিবর্তন করার পর দেখলাম - পুরো জিনিসটা একটা ভীষণ মজার খেলায় পরিণত হয়েছে। তখনই আমাদের মনে হলো, আরে , আমরা তো একটা দারুণ জিনিস বানিয়ে ফেলেছি। "

এই খেলাটার নাম ছিল পং। একে বলা যায় কম্পিউটারের পর্দায় টেবিল টেনিস খেলার একটা সরল সংস্করণ।

"এটা ছিল এমন একটা খেলা যাকে বলা যায় টেবিল টেনিসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এতে একটা বল আছে - যা এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে - আর আছে একটা প্যাডল, সেটা পর্দায় দেখা যাচ্ছে একটা সাদা চতুর্ভুজ হিসেবে। আপনি নব ঘোরালে সেটা পর্দার ওপর থেকে নিচে নড়াচড়া করবে। বলটা সার্ভ করা হবে নেটের মাঝখান থেকে। আপনি যদি আপনার সাদা চতুর্ভুজ দিয়ে সেটাকে মাঝপথে আঘাত করেন তাহলে ওটা ঘুরে উল্টো দিকে যেতে থাকবে - এবং তখন আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড় আরেকটি সাদা চতুর্ভুজ দিয়ে সেটাকে আটকাতে পারবেন।"

নোল্যান বুশনেল তার তার বন্ধু টেড ড্যাবনি তখন একটা কম্পিউটার গেম কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন - যাকে তারা নাম দেন 'আটারি।'

জার্মানির কম্পিউটার গেম জাদুঘরে প্রথম যুগের পং গেমিং মেশিন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জার্মানির কম্পিউটার গেম জাদুঘরে প্রথম যুগের পং গেমিং মেশিন

ক্যালিফোর্নিয়ার সানিভেলে এ্যান্ডি ক্যাপস ট্যাভার্ন নামে একটি বারকে অনুরোধ করলেন বুশনেল - যেন তারা এই পং খেলাটিকে একটি আর্কেড ভিডিও গেম হিসেবে স্থাপন করে ।

তখনই তিনি এবং তার সহপ্রতিষ্ঠাতা উপলব্ধি করলেন যে তারা একটা বিরাট সম্ভাবনাময় কিছুর সম্মুখীন।

"আমাদের তখন ব্যালি ম্যানুফ্যাকচারিং এর সাথে একটা চুক্তি ছিল। চুক্তিটা ছিল - আমরা ওদের জন্য একটা গাড়ি চালানোর ভিডিও গেম তৈরি করে দেবো। কিন্তু এই টেবল টেনিস গেমটা তৈরির পর আমরা ভাবলাম, আরে এটাই হয়তো ওরা পছন্দ করবে। আমাদের চুক্তিটাও পুরো হয়ে যাবে। তো আমরা চেষ্টা করলাম এই গেমটাই ওদেরকে গছিয়ে দিতে। কিন্তু ওরা বললো, না আমরা ড্রাইভিং গেমই চাই। "

"যাই হোক এই গেমটা আমাদের হাতে রয়ে গেল এবং শেষ পর্যন্ত ১৩টা গেমিং মেশিন বানালাম এবং নগদ টাকায় বিক্রি করলাম। তার পর বানালাম আরো ৪৫টা। বাকিটা তো ইতিহাস।"

পং তৈরি করা হয়েছিল টেবিল টেনিস খেলার ওপর ভিত্তি করে

ছবির উৎস, Mark Boster

ছবির ক্যাপশান, পং তৈরি করা হয়েছিল টেবিল টেনিস খেলার ওপর ভিত্তি করে

কিন্তু কখন তারা এটা উপলব্ধি করেছিলেন যে - তারা এমন একটা বিরাট জিনিস আবিষ্কার করেছেন যা তারা নিজেরাই আগে কল্পনা করতে পারেননি?

"বুঝলাম সেই দিন - যেদিন আমরা ক্যাশবাক্সটা খুললাম। দেখলাম বাক্সটা কয়েনে পুরো ভর্তি হয়ে আছে। যে গেমটা কয়েন দিয়ে খেলতে হয়, তা কতটা সফল হলো তা কিন্তু আপনি শুধু লোকে এর পেছনে কত টাকা খরচ করেছে তা দেখেই বুঝতে পারেন। তখনকার দিনে আপনি একদিনে ২০ ডলার কামাতে পারলে মনে করা হতো যে আপনি অনেক অর্থ উপার্জন করেছেন। সেই সময় পং গেম প্রতিদিন ৩৫, ৪০ বা এমনকি ৫০ ডলার পর্যন্ত আয় করছিল। এ থেকেই আমরা বুঝতে পারলাম যে আমাদের গেমটা সফল হয়েছে।"

দু'বছর পর এই পং গেমের একটা ঘরোয়া সংস্করণ তৈরি করলো আটারি কোম্পানি। এটা একটা তার দিয়ে টিভির সাথে সংযুক্ত করা যেতো । আর সেখান থেকেই শুরু হলো হোম ভিডিও গেম বিপ্লবের সূচনা।

১৯৭৫ সাল নাগাদ দেখা গেল বাচ্চাদের জন্য বড়দিনের উপহার হিসেবে সবচেয়ে কাঙ্খিত জিনিস হয়ে উঠেছে এই পং গেম। আর তার আবেদন ছড়িয়ে পড়েছে আটলান্টিকের ওপারেও ।

পংএর জনপ্রিয়তা থেকেই গেমিং বিপ্লবের সূচনা

ছবির উৎস, David Greedy

ছবির ক্যাপশান, পংএর জনপ্রিয়তা থেকেই গেমিং বিপ্লবের সূচনা

এর ফলে আপনার টেলিভিশন সেটকে একটা কম্পিউটার গেমে পরিণত করা সম্ভব হলো - যা দুজনে খেলতে পারে। এ জন্য প্রথমে টিভিটা বন্ধ করে তার এরিয়াল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হতো।

তার পর গেম সিমুলেটরের কেবলটি টিভির সাথে জুড়ে দিয়ে আবার টিভিটা অন করতে হতো। দুই খেলোয়াড় দুটি গেম কন্ট্রোলার হাতে নিয়ে শুরু করতেন টিভির পর্দায় টেনিস খেলা ।

বুশনেল বলছিলেন - গেম হিসেবে পং যে এত সফল হয়েছে তার বেশকিছু কারণ আছে।

প্রথম দিকে পং-এর নির্মাতারা চেয়েছিলেন একট আর্কেড গেম তৈরি করতে

ছবির উৎস, Sergei Karpukhin

ছবির ক্যাপশান, প্রথম দিকে পং-এর নির্মাতারা চেয়েছিলেন একট আর্কেড গেম তৈরি করতে

"আমার মনে হয় এর দু-তিনটি কারণ আছে। এটা ছিল একটা বিশেষ স্থান-কাল-পাত্রের মধ্যে একটা মজার দুর্ঘটনা। গেমটা ছিল এমন একটা জিনিস যাতে দেহের ছোট ছোট পেশীগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই এই খেলায় একজন সাধারণ নারী খেলোয়াড় একজন সাধারণ পুরুষ খেলোয়াড়কে হারাতে পারবে।"

"সেই সময়টা ছিল উইমেন্স লিব বা নারী স্বাধীনতার উন্মেষের সময়, এবং এই গেমের মধ্যে দিয়ে মেয়েদের একটা দারুণ ক্ষমতায়ন হতো। কারণ সেসময় একটা বারের মধ্যে একজন নারীর পক্ষে পং খেলার জন্য একজন পুরুষকে চ্যালেঞ্জ করাটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। তা ছাড়া গেমটাতে এমন একটা আকর্ষণী ক্ষমতা ছিল যে একটা গেম খেললে - আপনি জিতুন বা হারুন - আপনি আরেকটা গেম না খেলে থাকতে পারবেন না।"

"তিন নম্বর কারণটা হলো, তখনকার লোকেরা এমন কোন খেলা আগে দেখেনি - যা এত আধুনিক এবং আনন্দদায়ক, আর যে খেলাটা বোঝা এবং নিয়ন্দ্রণ করাও এত সহজ। "

বুশনেলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পং এর এই সাফল্যে তাদের ঠিক কি মনে হয়েছিল এবং এর আবিষ্কারক হিসেবে তারা কতটা বিস্মিত হয়েছিলেন?

১৯৭০এর দশকে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় পং

ছবির উৎস, INA FASSBENDER

ছবির ক্যাপশান, ১৯৭০এর দশকে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় পং

"এটা যে পরিমাণ অর্থ আয় করছিল সেটা ছিল একটা বিরাট বিস্ময়। তবে এর পরে - এর জনপ্রিয়তা যেভাবে বাড়ছিল তাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় - সেটা বের করতে আমরা খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। এত অর্ডার আসছিল যে তা আমাদের সরবরাহ করার ক্ষমতার চেয়ে বেশি ছিল।"

"আমাদের কোন কারখানা ছিল না, এ ব্যবসাটা পরিচালনার মত কোন ব্যবস্থা বা প্রক্রিয়া কিছুই ছিল না। আমাদের বয়স ছিল খুবই কম, আমরা ছিলাম খুবই অনভিজ্ঞ। কাজটা করতে করতেই আমাদের শিখতে হচ্ছিল।"

"আমি একবার একটা হিসেব করেছিলাম। সেই প্রথম বছরটায় আমরা যারা এর ব্যবস্থাপনায় ছিলা্ম - আমাদের আয় হচ্ছিল ঘন্টায় ৫০ সেন্ট। আমরা কিছু বেতন পাচ্ছিলাম ঠিকই কিন্তু সপ্তাহে সাতদিনই কাজ করছিলাম।"

ততদিনে নোলান তার আটারি ইউনিটকে গ্যারাজ থেকে স্থানান্তর করে একটা সাবেক আইস স্কেটিং রিংকের ওপর গড়ে তোলা অফিসে নিয়ে গেলেন। সেখান থেকেই তারা চেষ্টা করতে লাগলেন পং-এর ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর।

ইতালির তুরিন শহরে ভিডিও গেমের প্রতিযোগিতা - ডিসেম্বর ২০২১

ছবির উৎস, Diego Puletto

ছবির ক্যাপশান, ইতালির তুরিন শহরে ভিডিও গেমের প্রতিযোগিতা - ডিসেম্বর ২০২১

"আমরা অনেক কাজই সাব-কন্ট্রাক্ট হিসেবে অন্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করাচ্ছিলাম। গেম মেশিনের ক্যাবিনেট অন্য জায়গা খেকে করিয়ে আনা হচ্ছিল। আমরা সাধারণ টেলিভিশন সেট পাইকারি দরে কিনে আনতাম, তাতে কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে সেটা ক্যাবিনেটে বসানো হতো। তার পর তাতে কম্পিউটারটা সংযুক্ত করে তা টেস্ট করা হতো, এবং গ্রাহকের কাছে পাঠানো হতো। পুরো ব্যাপারটা ছিল বেশ ঝামেলার। "

ভিডিও গেমিং এখন শত শত কোটি ডলারের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তখন কি বুশনেলরা বুঝতে পেরেছিলেন যে এমনটা হবে?

"আমার মনে আছে একদিন আমি আমাদের অফিসে গাড়ি নিয়ে ঢুকছিলাম। দেখলাম আশপাশে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, পার্কিং লটে কোন জায়গা খালি নেই। হঠাৎ করেই আমার খেয়াল হলো যে এই সবগুলো গাড়িরই খরচ যোগাচ্ছে এই কোম্পানি যা আমি প্রতিষ্ঠা করেছি। লোকে আমাদের তৈরি গেম মেশিনে ২৫ সেন্ট ঢুকিয়ে গেম খেলছে - এবং তা থেকেই এ অর্থনীতিটা তৈরি হয়েছে। "

"এটা আমার এমন একটা উপলব্ধি - যা তখন একটা অত্যাশ্চর্য ব্যাপার বলে মনে হয়েছিল।"

ভিডিও গেম এখন বিশ্বব্যাপী শত শত কোটি ডলারের ব্যবসা

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, ভিডিও গেম এখন বিশ্বব্যাপী শত শত কোটি ডলারের ব্যবসা

"তখন আমার বয়স ছিল ২৮। আমার কোম্পানির নির্বাহীদের বেশির ভাগেরই বয়স ছিল এর কাছাকাছি।আর আমাদের কর্মচারীদের বেশির ভাগের বয়স ছিল তার চেয়েও কম, অনেকে তখন মাত্র বিশের কোঠায় পড়েছে। তখনকার দিনে এটা খুব সাধারণ ঘটনা ছিল না। "

"আজকে আমার মনে হয়, আমি স্টিভ জবস, বিল গেটস - যারা আমার পরে এসেছিলেন - তাদের জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছিলাম , কারণ আমার আগে কোন বড় ইলেকট্রনিক কোম্পানির সিইও ছিল না যার বয়স বিশের কোঠায়। সেটা একটা অন্যরকম সময় ছিল। "

"যখন আমি শুরু করেছিলাম তখন আমার মা মনে করেছিলেন, আমি একটা ভালো চাকরি ছেড়ে একটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেমেছি। তিনি বলেছিলেন, নোলান, তুমি কত ভালো একটা চাকরি করছিলে ! তবে পরে অবশ্য তার ধারণা হয়েছিল যে আমি যা করছি তা একটা দারুণ ব্যাপার। "

নোলান বুশনেলকে মনে করা হয় ভিডিও গেম শিল্পের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। নিউজউইক তাকে এমন ৫০ জনের তালিকায় ঠাই দিয়েছে - যারা আমেরিকাকে বদলে দিয়েছে।

১৯৭০এর দশকে পং আমেরিকায় এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে বলা হয়, এর কারণে সেদেশে ২৫ সেন্টের কয়েনের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। আর ভিডিও গেম শিল্প এরপর ক্রমাগত বিকশিতই হতে থেকেছে।

ভিডিওর ক্যাপশান, ভিডিও গেম আসক্তি কতোটা ভয়াবহ মানসিক রোগ?
ভিডিওর ক্যাপশান, স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কী কী সমস্যা হয় আর সেগুলো কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়