‘একবার মামলা নেয় নাই, একশোবার যাব। যতক্ষণ মামলা নেবে না, ততক্ষণ যেতেই থাকব’ - বলছেন পুলিশের সার্জেন্ট মহুয়া হাজং

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে সম্প্রতি পুলিশের একজন নারী সদস্যের বাবা দুর্ঘটনায় আহত হবার পর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে থানা থেকে যথাসময়ে মামলা না নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ডিসেম্বরের শুরুতে ওই দুর্ঘটনা ঘটালেও প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বনানী থানায় এ ব্যাপারে মামলা নেয়া হয়নি।
তবে আজ বৃহস্পতিবার বনানী থানা একটি মামলা নিয়েছে - যাতে আসামী হিসেবে অজ্ঞাক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, সুনির্দিষ্টভাবে কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি। বিবিসি বাংলাকে একথা নিশ্চিত করেছে বনানী থানা পুলিশ ।
পুলিশের সার্জেন্ট মহুয়া হাজং বিবিসিকে বলেছেন, থানা মামলা না নেয়া পর্যন্ত তিনি 'নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে' প্রতিকার পাবার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
এর আগে বাংলাদেশ পুলিশের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, ঘটনাটির ছায়া তদন্ত চালানো হচ্ছে এবং দ্রুতই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কী হয়েছিল?
সার্জেন্ট মহুয়া হাজং মামলা দায়ের করার জন্য বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর যে আবেদনপত্র লিখেছেন তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ২রা ডিসেম্বর রাত সোয়া দুইটায় ঢাকার বিমানবন্দর সড়কের ইউ-টার্নে পৌঁছালে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি মিজ হাজংএর বাবার মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
আরো পড়তে পারেন:
ওই আর্জিতে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার পর বনানী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় মহুয়া হাজংএর বাবাকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল - যেটি পঙ্গু হাসপাতাল নামে সমধিক পরিচিত - সেখানে ভর্তি করেন।
একই সময়ে বনানী থানার পুলিশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী গাড়িটি এবং মিজ মহুয়ার বাবার মোটরসাইকেলটি আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
মহুয়া হাজং বিবিসিকে বলেছেন, পরে তিনি জানতে পেরেছেন অভিযুক্ত গাড়িটিকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
এর মধ্যে হাসপাতালে প্রথমে তার বাবার ডান পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়।
কিন্তু তারপর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে।
পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে বারডেম হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তিনি এখন সেখানকার আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
মিজ হাজং বলেছেন, দুর্ঘটনার পরের দিন অর্থাৎ তেসরা ডিসেম্বর তিনি বনানী থানায় মামলা করতে গেলে, মামলাটি নেয়া হয়নি।
সেসময় তাকে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে - যিনি তার ভাষায় একজন 'প্রভাবশালী' ব্যক্তি - আপোষ করে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার পরামর্শ দেয়া হয়।
কিন্তু তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ফেরত আসেন। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম তিনি বিবিসিকে বলেননি।
'একবার মামলা নেয় নাই, একশোবার যাব। যতক্ষণ মামলা নেবে না, ততক্ষণ যেতেই থাকব'
মহুয়া হাজং জানিয়েছেন, তার বাবার শারীরিক অবস্থা খুবই 'ক্রিটিক্যাল' বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসির সাথে কথা বলার সময় তিনি হাসপাতালের আইসিইউর সামনে বসে কথা বলছিলেন। তিনি বলেছেন, তিনি নিয়মের মধ্যে থেকে এই ঘটনার বিচার চান।
"থানা একবার মামলা নেয় নাই, একশোবার যাব। যতক্ষণ মামলা নেবে না, ততক্ষণ যেতেই থাকব। আমি থেমে যাব না। আমাকে আপোষ করতে বলা হইছিল, আমি আপোষ করবো না।"
এখন দিনের বড় সময়টি তাকে হাসপাতালে কাটাতে হয়, যে কারণে তিনি রোজ থানায় যেতে পারছেন না।
ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে কথা বলার জন্য তাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের 'ধমক' শুনতে হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বিচার পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
মামলা না নেয়া প্রসঙ্গে পুলিশ কী বলছে
সার্জেন্ট মহুয়া হাজংয়ের অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশে অনেক সময় একজন বিচার প্রার্থী মামলা করতে গেলে থানা মামলা না নেয়ার অভিযোগ শোনা যায়।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
কিন্তু একজন পুলিশ সদস্য মামলা করতে যাবার পরেও পুলিশ মামলা নিচ্ছে না - এটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বনানী থানায় যোগাযোগ করা হলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূরে আজম মিয়া শুরুতে স্বাভাবিক কথা বললেও মহুয়া হাজংএর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি 'পরে ফোন দিয়েন' বলে লাইন কেটে দেন।
এরপর কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে বাংলাদেশ পুলিশের একজন মুখপাত্র মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বিবিসিকে বলেছেন, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন।
তিনি বলেছেন, "আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টিকে আইনের আওতায় আনার জন্য কনসার্নড কর্মকর্তাদের গুলশান জোনের মধ্যে পড়ে এটা তাদের বলা হয়েছে। আমার জানামতে তারা একটি জিডি করেছেন, এবং একটি ছায়া তদন্ত চালাচ্ছেন, এবং তদন্তের একটি কপি কোর্টে পাঠানো হয়েছে।"
তবে এই জিডি এবং ছায়া তদন্তের বিষয়টি মিজ হাজং জানেন না।
সে বিষয়ে মি. কামরুজ্জামান বলেছেন, "আমি সর্বোচ্চ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে যেটুকু জানি তা বললাম। সে (মহুয়া হাজং) এ বিষয়ে কেন জানে না, সেটা আমি জানি না।"




