পাকিস্তান: ইসলাম ধর্মের নবীর অবমাননার অভিযোগে আবার নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ব্লাসফেমি উন্মাদনার সর্বশেষ বলি এক শ্রীলঙ্কান

    • Author, শাকিল আনোয়ার
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, লন্ডন

পাকিস্তানে ক'দিন আগে ইসলামের নবীকে অবমাননার গুজবে একজন শ্রীলঙ্কান নাগরিকের নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে সর্বস্তরে যে ক্রোধ, লজ্জা, ঘৃণা ও হতাশার প্রকাশ চোখে পড়ছে, তা সেদেশে প্রায় নজিরবিহীন।

পাঞ্জাব রাজ্যের শিয়ালকোটে ৩রা ডিসেম্বর শুক্রবার খেলার সামগ্রী তৈরির এক কারখানার ম্যানেজার প্রিয়ান্থা দিবাওয়াদানাগের বিরুদ্ধে হঠাৎ গুজব ওঠে যে তিনি নাকি নবীর নাম লেখা একটি পোস্টার ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন।

সাথে সাথে শত শত লোক হাজির হয়ে ৪৮-বছর বয়স্ক এই শ্রীলঙ্কানকে টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় নামিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে এবং এরপর তার মরদেহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। নিহতের দু-চারজন পাকিস্তানী সহকর্মী ঝুঁকি নিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও কোনও লাভ হয়নি।

হত্যার খবর জানার পর থেকেই পাকিস্তানের সরকার, রাজনৈতিক মহল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে ইসলামের নামে নৃশংসতা এবং আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন শুক্রবার ছিল পাকিস্তানের জন্য "একটি লজ্জার দিন।"

তিনি বেশ কয়েকবারই বলেছেন যে "জঘন্য এই হত্যাকান্ডের" বিচার হবেই, অপরাধীদের "কঠোর শাস্তি পেতে হবে"। শ্রীলঙ্কার সাথে সম্পর্ক যাতে নষ্ট না হয়, তার জন্য প্রায় সাথে সাথেই তিনি শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টকে টেলিফোন করেন।

বিবৃতি দিয়ে ঘটনার কড়া নিন্দা করেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার রশীদ বাজওয়া। বিচারকাজে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

এছাড়া, গতকাল (মঙ্গলবার) পাকিস্তানের বিভিন্ন মত-পথের ইসলামী ধর্মীয় নেতারা একসাথে বসে বলেছেন শুক্রবারের ওই হত্যাকাণ্ড "অনৈসলামিক"।

হামলা ও হত্যায় জড়িত সন্দেহে একশো'রও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করা হয়েছে বিচারকাজ যেন দ্রুত হয়।

বিদেশী বলে এত তোলপাড়?

লাহোরের সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক উমের জামাল বিবিসি বাংলাকে বলেন যে ২০১৪ সালে পেশোয়ারে সেনাবাহিনীর একটি স্কুলে সন্ত্রাসী হামলার পর একক কোন ইস্যুতে পাকিস্তানে এমন প্রতিক্রিয়া চোখে পড়েনি।

"সমাজ ও রাজনীতির সর্বস্তরে এমন আলোড়ন পাকিস্তানে বেশ বিরল," বলেন মি. জামাল, যিনি যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক রাজনীতি বিষয়ক সাময়িকী দি ডিপ্লোম্যাটের সংবাদদাতা।

২০১৪ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পেশোয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে কট্টর ইসলামপন্থী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির সন্ত্রাসী হামলায় ১৫৬ জন মারা গিয়েছিল। পরপরই পাকিস্তানে সন্ত্রাস দমনে বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রিয়ান্থা দিবাওয়াদানাগের হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানে কি ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হত্যা-নির্যাতন বন্ধে কড়া কোন উদ্যোগ দেখা যাবে?

"কিছু করতে চাইলে সরকারের জন্য এটা একটা সুযোগ। সবাই যেন এক সুরে কথা বলছে," বলেন উমের জামাল। কিন্তু, একইসাথে তিনি বলেন, এই সুযোগ কাজে লাগানোর সাহস বা ইচ্ছা পাকিস্তানের রাজনৈতিক এবং ক্ষমতাসীন মহলে যে রয়েছে তার কোন ইঙ্গিত তিনি দেখেছেন না।

"যদি হত্যাকাণ্ডের শিকার একজন বিদেশী না হয়ে একজন পাকিস্তানী হতো, তাহলে হয়তো এই প্রতিক্রিয়া সরকারী মহলে হতো না। সেনাপ্রধান তার উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তার কারণ তিনি হয়তো শ্রীলঙ্কার সাথে সম্পর্ক নিয়ে চিন্তিত। দেশের বাইরে পাকিস্তানের ইমেজ নিয়ে চিন্তিত।"

বিদেশী না হলে এত কথা হতো না - এমন কথা পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়াতে বহু মানুষ লিখছেন। কারণ তারা বছরের পর দেখছেন ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কিছুদিন পর পর এমন হত্যাকাণ্ড হয়েই চলেছে। বড় বড় ক'জন রাজনীতিক এর শিকার হয়েছেন, কিন্তু পরিস্থিতি তাতে তেমন বদলায়নি।

হত্যার তালিকা

২০১১ সালে পৃথক দুই হামলায় পাঞ্জার রাজ্যের গভর্নর সালমান তাসির এবং সংখ্যালঘু বিষয়কমন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টিকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়। তারা দুজনেই বলেছিলেন ধর্ম অবমাননা নিয়ে বাড়াবাড়ি হচ্ছে।

মি. তাসির ব্লাসফেমি আইনে কিছু সংশোধনরে প্রস্তাব তুলেছিলেন এবং ওই আইনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খ্রিস্টান নারী আসিয়া বিবির পক্ষে কথা বলেছিলেন। গভর্নর তাসিরকে তারই একজন দেহরক্ষী মালিক মুমতাজ কাদরী ৩০টি গুলি ছুড়ে হত্যা করেছিল।

২০১৭ সালের এপ্রিলে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মারদানে খান আব্দুল ওয়ালি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাশাল খানকে দিনেদুপুরে পিটিয়ে মারা হয়েছিল।

২০১৮ সালের মে মাসে সংবিধানে 'খতমে নবুয়ত' ধারায় সংশোধন ইস্যুতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহসান ইকবালে ওপর বন্দুক হামলা হয় - যদিও তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

গত বছর জুলাইতে তাহির নাসিম নামে একজন প্রবাসী পাকিস্তানীর বিরুদ্ধে আনা ধর্ম অবমাননার মামলার বিচার চলাকালে পেশোয়ারে আদালত কক্ষের ভেতর পুলিশ এবং বিচারকের সামনেই তাকে গুলি করে মারা হয়।

পাকিস্তানের হিউম্যান রাইটস কমিশনের দেওয়া এক হিসাবে ২০২০ সালে ৫৮৬ জনের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির মামলা হয়েছে, যার অধিকাংশই হয়েছে পাঞ্জাবে। এক হিসাব বলছে, গত ৩০ বছরে পাকিস্তানে প্রায় ৯০ জন ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে পৃথিবী জুড়ে হৈচৈ নিন্দা হলেও পাকিস্তানের সরকার বা রাজনীতিকদের মধ্যে তেমন কোনো নড়চড় দেখা যায়নি।

বরং ইসলাম অবমাননার ইস্যুতে বিভিন্ন সময় হত্যা-সহিংসতার জন্য অভিযুক্ত তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তানের (টিএলপি) ওপর থেকে কদিন আগেই নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের কয়েকশো' নেতা-কর্মীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে এখন বিস্তর কথা শুরু হয়েছে।

ইসলামাবাদে সাংবাদিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাহিদ হোসেনও মনে করেন সরকার এখনও সমস্যার মূলে তাকাতে চাইছে না।

বিবিসি উর্দু বিভাগকে তিনি বলেন, "এখন পর্যন্ত যেসব বিবৃতি কথাবার্তা তা শুধু শুক্রবারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে। কিন্তু যে সব কারণে বার বার এমন নৃশংসতা হচ্ছে, তা নিয়ে কোনও কথা নেই।"

"রাজনীতিকরা প্রাণ খুলে কথা বলতে ভয় পান। সমাজের বাস্তবতার সাথে তাল মেরে চলেন।"

কিন্তু পাকিস্তান সমাজের বাস্তবতা কী?

উমের জামাল বলেন, গত ক'দিন ধরে পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু ভিডিও বেরুচ্ছে যেগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে ছোটো শহর ও গ্রামে মাদ্রাসায় বাচ্চাদের এমনভাবে এমন সব শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, যাতে এক সময় তাদের কাছে ধর্মের নামে আইন হাতে তুলে নেওয়া খুব স্বাভাবিক কাজ মনে হওয়া স্বাভাবিক।

মাদ্রাসার শিক্ষাক্রমে সংস্কার বা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি আইনি কাঠামোর ভেতর আনা নিয়ে বিভিন্ন সময় নাগরিক সমাজ থেকে কথা তোলা হলেও রাজনীতিকরা এ নিয়ে উদ্যোগ নিতে ইচ্ছুক নন।

"যে শ্রেণীটি পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, তারা প্রচলিত এই ব্যবস্থা থেকে ফায়দা পান। সেটাই অন্যতম প্রধান সমস্যা," বলেন উমের জামাল।

"পাকিস্তানের অন্য প্রদেশের চেয়ে পাঞ্জাবে এ ধরণের কট্টর মনোভাব অপেক্ষাকৃত বেশি। এই প্রদেশের গ্রামীণ এলাকায় গেলে দেখবেন ভোটের আগে রাজনীতিকরা এমন সব লোকজনকে পাশে নিয়ে মানুষের সামনে দাঁড়াচ্ছেন যারা এসব কট্টর মতবাদের বড় সমর্থক।"

ফলে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যখন শিয়ালকোটে শ্রীলঙ্কান নাগরিকের হত্যা নিয়ে বিস্তর হম্বি-তম্বি করছেন, তারই সরকারের এক সিনিয়র মন্ত্রী ওই হত্যাকাণ্ডকে "কিছু শিশুর ধর্মীয় আবেগের বিশৃঙ্খল বহিঃপ্রকাশ বলে" উড়িয়ে দেওয়া চেষ্টা করছেন।

দু'দিন আগে পেশোয়ারে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পারভেজ খাত্তাকের মন্তব্য ছিল - "কিছু বাচ্চা ইসলাম নিয়ে আবেগের জেরে বেসামাল হয়ে গিয়েছিল। একটা বয়সে সবারই এমন আবেগ দেখা দিতেই পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে পাকিস্তান তাতে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে বা সরকার এর জন্য দায়ী।"

পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন তাদের মঙ্গলবারের এক সম্পাদকীয়তে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করেছে।

ডন লিখেছে, "মন্ত্রীর এমন বক্তব্য একটি জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা। এমন মন্তব্য অজ্ঞানতাপ্রসূত এবং বিপজ্জনক। এতে এমন বার্তা যেতে পারে যে এসব হত্যাকাণ্ড স্বাভাবিক।"

'সব দলই ধর্মের কার্ড খেলে'

জাহিদ হোসেন বলেন, পাকিস্তানে সব দলই ধর্মের কার্ড খেলে ।

উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, সালমান তাসিরকে হত্যার পর ওই সময়কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক বলেছিলেন যে এ ধরণের ধর্মীয় অবমাননা আসলেই সহ্য করার মত নয়।

মি. হোসেন বলেন, রাজনৈতিক এবং নির্বাচনী ফায়দা পেতে এমনকি তথাকথিত "প্রগতিশীল দলগুলো" এমন সব কথা বলে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মাশাল খান নিহত হওয়ার পর আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি কার্যত ওই হত্যা সমর্থন করেছিল।

"একজন বিদেশীকে হত্যা করা হয়েছে বলে এখন এত কথা হচ্ছে। কিন্তু পিটিআই (ইমরান খানের দল) এবং টিএলপির (তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তান) মধ্যে মৌলিক কোন তফাত নেই্।"

জাহিদ হোসেন উদাহরণ হিসেবে বলেন, পিটিআইয়ের এমন একজন মন্ত্রী হয়েছেন যিনি সালমান তাসিরের হত্যাকারী মুমতাজ কাদরীর কবর জিয়ারত করেছিলেন। টিএলপি নেতা সাদ রিজভী সম্প্রতি জেল থেকে ছাড়া পেলে পাঞ্জাব পিটিআইয়ের এক নেতাকে ফুলের তোড়া উপহার দিতে দেখা গেছে।

তবে ভোটের হিসাবের পাশাপাশি রয়েছে জীবনের ভয়। মানুষজন দেখছেন ধর্ম অবমাননার ধুয়ো তুলে হত্যা করা হচ্ছে, ব্লাসফেমির মামলা দিয়ে বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন অতিষ্ঠ করে দেওয়া হচ্ছে।

"মানুষ ভীত। মিথ্যা অভিযোগে নির্যাতনের শিকার হলেও তারা মামলা করতে চান না। কারণ বিচারকরা অস্বস্তি বোধ করেন। উকিলরা মামলা নিতে চান না," বলেন উমের জামাল।

মালিক আদনান নামে যে সহকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার শ্রীলঙ্কান বসকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন, তাকে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সাহসিকতার জন্য রাষ্ট্রীয় খেতাব দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু জানা গেছে ওই যুবক এখন পুলিশী নিরাপত্তায়।

পাকিস্তান যেভাবে শুক্রবারের হত্যাকাণ্ডের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামাবাদে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রদূত ভিজে বিক্রামা তাতে সন্তুষ্ট।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, "গত তিনদিনে অমি দেখেছি জনগণের নানা পর্যায় থেকে এই ঘটনার নিন্দা হচ্ছে, তারা সবাই বলছেন এটা পাকিস্তানের আসল চিত্র নয়। আমিও তা বিশ্বাস করি।"

কিন্তু, পাকিস্তানে কেউই বিশ্বাস করছেন না যে প্রিয়ান্থা দিবাওয়াদানাগের মৃত্যুর পর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে উন্মত্ত জনতার হাতে কারো নৃশংস মৃত্যুর খবর তাদের আর শুনতে হবে না।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন: