ভারত-শাসিত কাশ্মীর: শ্রীনগরে বন্দুক যুদ্ধে নিহত ব্যবসায়ীদের কি সেনা-পুলিশ 'মানব ঢাল' হিসেবে ব্যবহার করেছিল?

দেড় বছরের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বিচার চাইছেন নিহত মুদাসসির গিলের স্ত্রী

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান, দেড় বছরের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বিচার চাইছেন নিহত মুদাসসির গিলের স্ত্রী
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

ভারত-শাসিত কাশ্মীরে সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো যে এনকাউন্টারে দুজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন, সেই ঘটনা নিয়ে তীব্র জনরোষের মুখে রাজ্য প্রশাসন আজ ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে শ্রীনগরে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে ক্রমশ এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে ওই দুজন ব্যবসায়ীকে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা সেদিন 'হিউম্যান শিল্ড' বা মানব-ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।

এদিকে নিহত দুজন ব্যবসায়ীর দেহ পরিবারের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে তাদের পরিবারের সদস্যরা ও স্থানীয় মানুষজন প্রবল শীতের মধ্যেও রাতভর যে ধরনায় বসেছিলেন - সেটাও বুধবার মাঝরাতের পর জোর করে তুলে দেওয়া হয়েছে।

বস্তুত সোমবার সন্ধ্যায় শ্রীনগর শহরের উপকণ্ঠে হায়দারপোরাতে যে এনকাউন্টারে মুদাসসির গিল ও আলতাফ আহমেদ দার নামে দুজন ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন, তা নিয়ে রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।

স্বামীর মরদেহ ফেরত চাইছেন মুদাসসির গিলের স্ত্রী

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান, স্বামীর মরদেহ ফেরত চাইছেন মুদাসসির গিলের স্ত্রী

সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ডেরা

একটি শপিং কমপ্লেক্সে ওই অভিযানের পর কাশ্মীর পুলিশ দাবি করেছিল ওই দুজন তাদের ভাষায় জঙ্গীদের সমর্থক ছিলেন - কিন্তু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা অনেকেই বলছেন তাদেরকে আসলে 'হিউম্যান শিল্ড' বা মানব-ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

নিহত আলতাফ আহমেদ দার ছিলেন শপিং কমপ্লেক্সটির মালিক - তাকে নিয়েই পুলিশ ও সেনারা বাড়িটির ভেতরে ঢুকেছিল বলে মি আহমেদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

তারা আরও বলছেন, ওই কমপ্লেক্সের যে ঘরটিতে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ডেরা ছিল বলে বলা হচ্ছে, সেটিতে নক-ও করানো হয় ওই দুজনকে দিয়েই।

রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতিও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে এসে বলেন, "এই সরকার এতই নিষ্ঠুর যে মৃতদের দেহ পর্যন্ত ফেরত দিচ্ছে না। জম্মু ও কাশ্মীরকে এরা আগেই বরবাদ করেছে, এভাবে চললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।"

"সেদিন কোনও জঙ্গী আদৌ মারা গেছে কি না আমরা জানি না, কিন্তু এটা জানি দুজন নিরপরাধ ব্যবসায়ী - যাদের ঘরে ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়ে আছে - তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। এই সরকার আর কত নির্যাতন চালাবে?", বলেন মিস মুফতি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাউথ এশিয়া ডিরেক্টর মীনাক্ষি গাঙ্গুলি

ছবির উৎস, PRAKASH MATHEMA

ছবির ক্যাপশান, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাউথ এশিয়া ডিরেক্টর মীনাক্ষি গাঙ্গুলি

নতুন নয় কাশ্মীরে মানব-ঢালের ব্যবহার

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাউথ এশিয়া ডিরেক্টর মীনাক্ষি গাঙ্গুলিও বিবিসিকে বলছিলেন, এই দুজন নিহত ব্যক্তির যে সশস্ত্র কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না তা বোঝাই যাচ্ছে - কিন্তু এখন সরকারি তদন্তটাও সঠিকভাবে হওয়া প্রয়োজন।

তাঁর কথায়, "কাশ্মীরে এই চরম নিপীড়নের পরিবেশের মধ্যেও যেভাবে নিহতদের পরিবারের লোকজন দৃঢ়ভাবে এই হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তাতে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না এরা সত্যিই সিভিলিয়ান ছিলেন।"

"এটা ভাল যে সরকারও সেটা একরকম মেনে নিয়েছে ও এই ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু আমরা আগে বহুবার দেখেছি এই সব সরকারি তদন্তের পরিণতি আর কখনোই জানা যায় না, দোষীদের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয় না।"

"এই ইমপিউনিটি-র সংস্কৃতিটা আছে বলেই কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী বারে বারে সেই একই জিনিস করে, যেখানে বেসামরিক মানুষজন এনকাউন্টারে মারা যান।"

বৃহস্পতিবার নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সংহতি জানাতে এসে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা

ছবির উৎস, TAUSEEF MUSTAFA

ছবির ক্যাপশান, বৃহস্পতিবার নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সংহতি জানাতে এসে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা

মুদাসসির গিল ও আলতাফ আহমেদ দারকে হিউম্যান শিল্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে - কাশ্মীরে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী সেই রেওয়াজ বহুদিন ধরেই চালিয়ে আসছে বলেও জানাচ্ছেন মিস গাঙ্গুলি।

তিনি আরও বলছিলেন, "সিভিলিয়ানদের একটা সশস্ত্র এনকাউন্টারের মাঝখানে আনা কোনওভাবেই উচিত নয়। তাদেরকে কোনওভাবে ঝুঁকিতে ফেলাটা কিন্তু চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।"

"অথচ আমরা আগে অনেকবার দেখেছি স্থানীয় কাশ্মীরিদের ব্যবহার করা হয়েছে জঙ্গীদের সঙ্গে নেগোশিয়েট বা দরকষাকষি করার জন্য।"

"তাদের বন্দুক ধরে ডেকে আনা হয়েছে ধৃতদের চিনিয়ে দেওয়ার জন্য, কিংবা সন্দেহভাজনরা কোথায় লুকিয়ে আছে সেই বাড়িগুলো দেখিয়ে দেওয়ার জন্য।"

"এমন ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে যেখানে সংঘর্ষের মুখে সিভিলিয়ানদের সামনে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে - এবং তারা ফায়ারিংয়ের মধ্যে পড়ে আগে মারা গেছেন। সুতরাং এই ধরনের হিউম্যান শিল্ডের ব্যবহার কাশ্মীরে নতুন নয়", বলছিলেন মিস গাঙ্গুলি।

এনকাউন্টারে বেসামরিক মানুষজনকে হত্যার প্রতিবাদে শ্রীনগরে ধরনা। বুধবার রাতে

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, এনকাউন্টারে বেসামরিক মানুষজনকে হত্যার প্রতিবাদে শ্রীনগরে ধরনা। বুধবার রাতে

নিহতদের লাশ ফেরানোর দাবিতে ধরনা

এদিকে ঘটনার পর পরই কাশ্মীর পুলিশ নিহত দুজন ব্যবসায়ীর দেহ শ্রীনগর থেকে একশো কিলোমিটার দূরে হান্ডওয়ারার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে দাফন করে দিয়েছে - কিন্তু পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের মরদেহ ফেরত পাওয়ার জন্য দাবি জানাচ্ছেন।

মুদাসসর গিলের স্ত্রী যেমন বলছিলেন, "আমার আর কোনও দাবিদাওয়া নেই - আমি শুধু আমার স্বামীর চেহারাটা একবার দেখতে চাই। তার দেহ আমাদের ফেরত দেওয়া হোক।"

নিহত আলতাফ আহমেদ দারের বড় ভাই-ও একই সুরে বলছেন, "আমাদের হাতে ওই লাশগুলো তুলে দেওয়া হোক।"

দুজন ব্যবসায়ীর মরদেহ তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য বুধবার সকাল থেকেই এলাকার স্থানীয় মানুষজন শ্রীনগরে খোলা আকাশের তলায় একটি মাঠে ধরনাতেও বসেন - নভেম্বরের প্রবল শীতের মধ্যেও রাত গড়িয়েও চলতে থাকে সেই অবস্থান বিক্ষোভ।

Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post

বক্তারা সেখানে বলেন, "একজন ব্যক্তি যেভাবেই মারা যান না-কেন, তার দেহ পরিবারকে ফিরিয়ে দিতেই হয় - ভারতের সংবিধান বা আইন সরকারকে তা লুকিয়ে ফেলার অনুমতি দেয় না।"

"ভারতে কি গণতন্ত্র আর নেই? ভারতের বিজ্ঞজন ও বুদ্ধিজীবীরা কি দেখছেন না আমাদের সঙ্গে কত বড় অন্যায় নির্যাতন করা হচ্ছে?"

মধ্যরাতের পর পুলিশ এসে সেই ধরনা জোর করে তুলে দেয় - যদিও পরে নিহতদের পরিজনদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে হান্ডওয়ারা থেকে কফিন তুলে এনে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

এদিকে আজ দুপুরের পর কাশ্মীরের লে: গভর্নর মনোজ সিনহার অফিস টুইট করে ঘোষণা করে, হায়দারপোরা এনকাউন্টারের ম্যাজিসটেরিয়াল তদন্ত হবে - এবং সেই তদন্ত রিপোর্ট যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা পড়ে সরকার তা নিশ্চিত করবে।