সুন্দরবনের জলদস্যুতা ছেড়ে যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন, কতটা বদলেছে তাদের জীবন

    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে সুন্দরবনের দস্যু যারা আত্নসমর্পণ করেছেন, তারা অভিযোগ করেছেন, তিন বছর আগে তারা আত্মসমর্পণ করলেও এখনও মামলা তুলে নেয়ার অন্যতম প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়নি।

তারা বলেছেন, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বহাল থাকায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে এখন তারা আদালতে আদালতে ঘুরছেন।

সোমবার 'দস্যুমুক্ত সুন্দরবন' এর তৃতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বাগেরহাটের রামপালে এক অনুষ্ঠানে মামলা নিয়ে এসব অভিযোগের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, হত্যা এবং ধর্ষণ মামলা ছাড়া অন্য মামলাগুলো থেকে তাদের রেহাই দেয়ার ব্যবস্থা সরকার নেবে।

সুন্দরবনে ৩২টি দস্যু বাহিনীর তিনশোর বেশি সদস্য আত্নসমর্পণ করার পর ২০১৮ সাল থেকে র‍্যাব,পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় পহেলা নভেম্বর দিনটিকে 'দস্যুমুক্ত সুন্দরবন' দিবস হিসাবে পালন করে আসছে।

আরও পড়ুন:

দস্যুতা ছেড়ে আসা জাহাঙ্গীর কেমন আছেন

সুন্দরবনের দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে ছয় বছর ধরে মামলা মোকদ্দমা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে।

তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে পাঁচটি মামলা এবং একটি হত্যা মামলা রয়েছে।

তিনি নিজেই সুন্দরবনে একটি দস্যু বাহিনীর প্রধান ছিলেন।

২০১৬ সালের নভেম্বরে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর তার বিশ জন সহযোগী এবং অস্ত্র সহ র‍্যাবের কাছে আত্নসমর্পণ করেছিলেন।

তিনি বলেছেন, সরকার তাদের তখন পুনর্বাসনের জন্য এক লাখ টাকা করে দিয়েছিল। কিন্তু মামলা থেকে রেহাই দেয়ার ব্যাপারে সরকারের অন্যতম যে প্রতিশ্রুতি ছিল, সেটা এখনও হয়নি।

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের বক্তব্য হচ্ছে, মামলা বহাল থাকায় তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।

"অন্য সবদিক থেকে ভাল আছি। কিন্তু যন্ত্রণা একটাই, তা হলো আমাদের (বিরুদ্ধে) মামলা" বলেন মি: জাহাঙ্গীর।

তিনি আরও বলেন, "আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা এবং হত্যা মামলা-যেগুলো আছে, কোন মামলায় যদি আমার সাজা হয়, তখন আমার বাকি লোকগুলোতো ভয়ে পালাবে।"

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর দস্যুতা ছেড়ে এসে স্ত্রী এবং দুই সন্তান নিয়ে বাগেরহাটের রামপালে শ্বশুর বাড়িতে রয়েছেন।

এখনও তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।

'মামলার অর্থ যোগাড় করতে হিমশিম'

তার স্ত্রী মোছাম্মাৎ সামিরুন বলেছেন, সরকারি সাহায্য কিছু পেয়েছেন। কিন্তু তার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলায় উকিলের জন্য অর্থ যোগাড় করতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন।

"আমার স্বামীর বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে, সেগুলোর জন্য অনেক টাকা পয়সা খরচ করছি। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের একটা ঘর এবং একটা গরু দিচ্ছে। এগুলো ব্যবহার করে যে আমরা চলবো, মামলার কারণে এমন পরিস্থিতিও নাই" বলেন মিজ সামিরুন।

রামপালেরই আরেকজন সোহাগ আকন্দ আত্নসমর্পণ করেছিলেন প্রথম দফায় ২০১৬ সালের ৩১ শে মে।

তিনি বলছিলেন, "প্রধানমন্ত্রী যে টাকাটা দিছে, এটা দিয়েই ব্যবসা করে এবং কষ্ট করে জীবন যাপন করতেছি। অথচ এই টাকা দিতে হচ্ছে উকিল-মহুরীকে।"

"এই যে মামলা নিয়ে আমাদের একটা কষ্ট। আমাদের মামলা থেকে মুক্তি দিলে আমরা ডাল ভাত খেয়ে বাঁচতে পারতাম," বলেন সোহাগ আকন্দ।

র‍্যাব একদিকে দীর্ঘ সময় ধরে সুন্দরবনে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।

একইসাথে র‍্যাবের এবং সরকারের পক্ষ থেকে জলদস্যুদের আত্নসমর্পণ করানোর চেষ্টা চালানো হয়।

সেই প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সাল থেকে তিন বছরে সুন্দরবনের ৩২ টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮জন আত্নসমর্পণ করেন।

এরপর ২০১৮ সালের পহেলা নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দস্যুমুক্ত সুন্দরবন ঘোষণা করেন।

এবার এর তৃতীয় বর্ষপূতিতে বাগেরহাটের রামপালে সুন্দরবনের দস্যুতা ছেড়ে আসা ব্যক্তিদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এক অনুষ্ঠান করা হয়।

এই অনুষ্ঠানে তাদের পুনর্বাসনের জন্য অনেককে নির্মাণ করা ঘর, অনেককে গরুসহ বিভিন্ন সহায়তা দেয়া হয়।

তাদের অনেকে সেই অনুষ্ঠানে র‍্যাব এবং পুলিশ প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বক্তব্য রাখেন।

স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা এই ব্যক্তিদের বক্তব্য ছিল মূলত মামলা থেকে রেহাই না পাওয়ার প্রশ্নে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন

সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, হত্যা এবং ধর্ষণ মামলা ছাড়া অন্য মামলাগুলো থেকে রেহাই দেয়ার ব্যবস্থা তারা নিচ্ছেন।

"আমরা যা ওয়াদা করেছি, তা অবশ্যই পালন করবো। আপনাদের মামলার ব্যাপারে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।"

সুন্দরবনের দস্যুদের তৎপরতা নিয়ে কাজ করেন যমুনা টেলিভিশনের সাংবাদিক মহসিন উল হাকিম।

তিনি মনে করেন, সুন্দরবনে দস্যুতার পেছনে যারা ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ঝুঁকি থাকছে।

"সংগঠিত হয়ে দস্যুতা করার বিষয়টি সুন্দরবনে শেষ হয়েছে।

"কিন্তু দস্যুরা আত্নসমর্পণ করলেও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমি দেখিনি। সে কারণে তারা বিচ্ছিন্নভাবে দু্‌ তিনজনের ছোট দস্যু দল নামিয়ে দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন, কোন প্রতিরোধ আসে কিনা," বলেন মি: হাকিম।

তবে র‍্যাবের কর্মকর্তারা বলেছেন, পেছনের শক্তিকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

তারা এখন সুন্দরবনে জলদস্যুতার কোনরকম ঝুঁকি দেখেন না।