টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: বিশ্বের সেরা হিসেবে বিবেচিত ক্রিকেটারদের নিয়ে তৈরি ভারতের ক্রিকেট দলটির করুণ অবস্থা কেন?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, রায়হান মাসুদ
- Role, বিবিসি বাংলা
পরপর দুটো ম্যাচে হারার কারণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে বিবেচিত ভারত শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে উঠতে পারবে কি-না, তা নিয়েই এখন বেশি আলোচনা হচ্ছে সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষকদের মধ্যে।
তাদের মতে, আর একটি পরাজয়ই ভারতের সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা শেষ করে দেবে।
পাকিস্তান আর নিউজিল্যান্ডের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে ভারত - আর ওই গ্রুপে রয়েছে আফগানিস্তান, যারা বিশ্ব ক্রিকেটে তুলনামূলক নতুন হলেও বর্তমানে সমীহ করার মতো ক্রিকেট খেলছে।
পরের ম্যাচেই হিসেব-নিকেশ চুকে যেতে পারে - ভিরাট কোহলির ভারত সেমিফাইনালে থাকছে কি থাকছে না। বুধবার, ৩রা নভেম্বর আবুধাবিতে আফগানিস্তানের মুখোমুখি হবে দলটি।
ভারত বিশ্বের সেরা টি-টোয়েন্টি লিগগুলোর একটি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের আয়োজক - বলা যায় প্রতি আসরেই ওই লিগে নতুন প্রতিভা উঠে আসে। ভারতীয় দলে বিশ্বের সেরা টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানেরা আছে, আছে সাদা বলে বিশ্বের অন্যতম সেরা পেসার।
তবু কেন বিশ্বকাপে ভারতের এমন হাল?
প্রতিভা অনেক, কিন্তু সঠিক ব্যবহার নেই
'সত্যি কথা বলতে, ভারতের দলটির প্রতিভা ও গভীরতা বিচারে এতোগুলো বছরে সাদা বলের ক্রিকেটে তেমন কিছু জিততে পারেনি' - এই বক্তব্য নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের ম্যাচের পর মাইকেল ভনের।
ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের সাবেক এই অধিনায়ক ভন এখন টেলিভিশনে ক্রিকেট বিশ্লেষণ করেন।
ভনের মতে, ভারতের উচিৎ নিজ দেশের ক্রিকেটারদের অন্য টি-টোয়েন্টি লিগগুলোতে খেলতে পাঠানো, যেন তারা ভিন্ন পরিবেশে খেলার ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
"ভারত এখন টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ার দ্বারপ্রান্তে। প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের একটা দল নিয়ে যে মানসিকতা ও পন্থা ভারত নিয়েছে তা খুবই ভুল," নিজের টুইটারে ভন লিখেছেন এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের পারফরমেন্স বিশ্লেষণ করে।
ভারতের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন মনে করেন যে ভারত এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে যে পারফরমেন্স করেছে, তা পুরো দলের সামগ্রিক একটা ব্যর্থতা। নিজের ভেরিফাইড টুইটার তিনি পাতায় লিখেছেন, "কোহলির অনেক সমালোচনা হচ্ছে, কিন্তু শুধু কোহলি নয় গোটা ভারত দল, এবং কোচরাও ব্যর্থ।"

ছবির উৎস, Getty Images
পেস খেলতে পারছে না, স্পিন খেলতেও ভুগছে
সুপার টুয়েলভ পর্যায়ে খেলতে নামার পর প্রথম ম্যাচেই দেখা গেছে যে ভারতের ব্যাটসম্যানরা পাকিস্তানের শাহীন শাহ আফ্রিদির বল খেলতেই পারছেন না।
বাম হাতের পেস বোলারদের যে বল ইনসুইং হয়ে ভেতরে ঢোকে, সে সব বলে ওপেনার রোহিত শর্মার দুর্বলতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল।
২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনাল ম্যাচে পাকিস্তানের মোহাম্মদ আমীর যেভাবে বল ভেতরে টেনে এনে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেছিলেন, সেই একই দৃশ্যের যেন রিপ্লে দেখালেন শাহীন শাহ আফ্রিদি ২৪শে অক্টোবরের ম্যাচে। রোহিত শর্মার এবারের অর্জন গোল্ডেন ডাক।
২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ভারতের ব্যাটসম্যানরা নিউজিল্যান্ডের স্পিনার স্যান্টনারের বল খেলতে পারেনি। মাত্র ১২৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে সেবারে ৭৯ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল ভারতের বিশ্বের সেরা সেরা ব্যাটসম্যানদের নিয়ে গড়া ব্যাটিং লাইনআপ।
ওই ম্যাচে মাত্র ১১ রান দিয়ে রোহিত শর্মা, সুরেশ রায়না, মাহেন্দ্র সিং ধোনী ও হার্দিক পান্ডিয়ার উইকেট নিয়েছিলেন স্যান্টনার।
আর এবারে ইশ সোধি ও মিচেল স্যান্টনার এই দুই স্পিনার সব মিলিয়ে ৮ ওভারে মাত্র ৩২ রান দিয়েছেন - স্যান্টনার উইকেট পাননি, কিন্তু সোধি নিয়েছেন রোহিত শর্মা ও ভিরাট কোহলির উইকেট।
নিউজিল্যান্ডের বা-হাতি পেস বোলার ট্রেন্ট বোল্ট ২০ রান দিয়ে তিনটি উইকেট নিয়েছেন।
অর্থাৎ যেসব জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে ভারতের দুর্বলতা প্রকাশ্য, সেসব জায়গায় মাঠের খেলায় কোনও সমাধান বের করতে পারেনি ভারতের ক্রিকেট থিঙ্কট্যাংক।

ছবির উৎস, Getty Images
ব্যাটসম্যানদের মনোবল
ভারতের সাবেক তারকা ব্যাটসম্যান ভিভিএস লাক্সমান মনে করছেন, যেভাবে ভারত ব্যাট করছে তাতে মনে হচ্ছে খেলোয়াড়দের মনোবল খুবই নড়বড়ে অবস্থায় আছে।
"(নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে) এই হারটা ভারতকে আহত করবেই। ব্যাট হাতে নড়বড়ে, শট সিলেকশন খুবই প্রশ্নবিদ্ধ। যদিও নিউজিল্যান্ড দারুণ বল করেছে, কিন্তু ভারতের ব্যাটসম্যানরা কাজটা সহজ করে দিয়েছে।"
নিজের টুইটার পাতায় লাক্সমান আরও লিখেছেন, ভারতের সেমিফাইনাল এখন 'দূরের স্বপ্ন'।
পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও অলরাউন্ডার শহীদ আফ্রিদিও মনে করেন, ভারতের সেমিফাইনালে উঠতে এখন 'অলৌকিক কিছু ঘটতে হবে'।
বোলাররা নখদন্তহীন এখনও পর্যন্ত
আগে ব্যাট করে পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতের ব্যাটসম্যানরা ১৫১ রান তুলেছিলেন ৭ উইকেট হারিয়ে। কিন্তু পাকিস্তানের একটি উইকেটও নিতে পারেনি ভারতের বোলাররা।
অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষের ম্যাচটিতে জসপ্রিত বুমরাহ নিয়েছিলেন দুটি উইকেট - চতুর্থ ওভারে একটি ও ত্রয়োদশ ওভারে আরকেটি। কিন্তু এটা ম্যাচে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি।
এখন পর্যন্ত ৩২ ওভারের মতো বল করে ভারতের বোলাররা মাত্র দুটি উইকেট নিতে পেরেছেন চলতি বিশ্বকাপে।
বরুন চক্রবর্তী, মোহাম্মদ শামী, রাভিন্দ্রা জাদেজা - কেউই সুবিধা করতে পারেননি এখন পর্যন্ত।
ভারত ইয়ুজভেন্দ্র চাহাল ও শিখর ধাওয়ানের মতো সিনিয়র ক্রিকেটারদের ছাড়াই একটি স্কোয়াড নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই বিশ্বকাপে খেলছে।
ক্লান্ত ভারত
ভারতের এই দলটার মধ্যে উদ্দীপনার অভাব দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন কোন কোন বিশ্লেষক।
এর একটা বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ভিরাট কোহলির টুর্নামেন্টের আগেই দেয়া ঘোষণা যে তিনি বিশ্বকাপের পর আর অধিনায়ক থাকবেন না। একই সাথে রাভি শাস্ত্রীও জানিয়েছেন যে তিনিও আর কোচ হিসেবে দলের সঙ্গে থাকবেন না।
তবে মাহেন্দ্র সিং ধোনীকে মেন্টর হিসেবে দলের সাথে পাঠানোর সিদ্ধান্ত বেশ আলোচিত হয়েছে, কিন্তু তোন ফলাফল এখনও দেখা যায়নি।

ছবির উৎস, Getty Images
ম্যাচ হারার পর ভিরাট কোহলি ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রতিপক্ষকে বাহবা দিয়েছেন এবং নিজেদের খেলার অসঙ্গতিগুলোর কথাও স্বীকার করেছেন।
কিন্তু সব ছাপিয়ে যেন ফুটে উঠেছে ভারতীয় ক্রিকেটারদের মধ্যে ক্লান্তির ছাপ।
টানা প্রায় পাঁচ মাস ম্যাচ খেলার মধ্যেই আছে ভারতের এই দলটি।
জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ায়, ফেব্রুয়ারি-মার্চে ভারতের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, এপ্রিল-মে মাসে আইপিএলের প্রথমার্ধ, জুনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল, জুলাই মাসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ, অগাস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ এবং তারপর সংযুক্ত আরব আমিরাতে আবারও ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের বাকি অংশের খেলা - এই ছিল তাদের রুটিন।
ভিরাট কোহলি এ সবকে অজুহাত হিসেবে দেখাতে চাননি, তবে বেশি ক্রিকেট খেলার একটা নেতিবাচক প্রভাব যে থাকেই তা হয়তো স্পষ্ট হচ্ছে।








