টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: ভারতীয় ক্রিকেটারদের অনলাইনে আক্রমণের মাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, জয়া মাতিন
- Role, বিবিসি নিউজ, দিল্লি
গত রবিবার টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভারত হেরে যাওয়ার পর ভারতীয় ক্রিকেট সমর্থকরা সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নেন তাদের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই তীব্র ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন ভারতের ফাস্ট বোলার মোহাম্মদ শামি, যিনি ভারতের ১৫ সদস্যের টি টোয়েন্টি স্কোয়াডের একমাত্র মুসলিম সদস্য। ভারতীয় সমর্থকদের তীব্র বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের শিকার হন এই ফাস্ট বোলার।
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা তাকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত ভাবে রান দেয়ার অভিযোগে করেছেন, এবং তাকে 'বিশ্বাসঘাতক', 'জাতীয়তা বিরোধী' বলতেও পিছপা হননি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় মোহাম্মদ শামির ওপর আক্রমণ শুরু ওয়ার পর ভারতের কিংবদন্তী সাচিন টেন্ডুলকার থেকে শুরু করে অনেক ক্রিকেটারই শামির পক্ষ নেয়।
ভারতের ক্রিকেট বোর্ডও শামির সাথে দলের অধিনায়ক ভিরাট কোহলির একটি ছবি পোস্ট করে টুইটারে।
আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
তবে অনলাইন ট্রলিং যে শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। ভিরাট কোহলির স্ত্রী এবং বলিউড অভিনেত্রী আনুশকা শর্মাও জনরোষের শিকার হন। ভারতের হারের জন্য দোষারোপ করা হয় তাকেও।
গত সপ্তাহে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের কাছে ১০ উইকেটে হারের পরপরই শামিকে উদ্দেশ্য করে অনলাইনে বিদ্বেষমূলক ট্রল শুরু হয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সেসব বিদ্বেষমূলক পোস্ট, কমেন্ট যখন ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তখনই খবর পাওয়া যায় যে ভারতের উত্তরাঞ্চলের রাজ্য পাঞ্জাবে পাকিস্তানের বিজয় উদযাপন করায় বেশ কয়েকজন কাশ্মীরি শিক্ষার্থীর ওপর হামলা করা হয়েছে।
তারপর থেকে ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে যাদের সবাই মুসলিম। এদের অনেকের বিরুদ্ধেই কঠোর সন্ত্রাস-বিরোধী আইনের অধীনে অভিযোগ আনা হয়েছে। পাকিস্তানের সমর্থনে কিছু বলা, লেখা বা মেসেজ শেয়ার করার জন্য সন্ত্রাস-বিরোধী আইন ব্যবহার করা হয়েছে এর আগেও।
অতীতে অতি আবেগী সমর্থকরা টিভি সেট ভাঙার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের বাড়িতে ঢিল ছুঁড়ে এবং তাদের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে দল হারার রাগ সামলাতেন। তবে অনলাইন আক্রমণ বেশ কয়েক বছর ধরে হতাশা আর ক্ষোভ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হয়ে যাওয়ায় অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে এর ফলে খেলোয়াড়রা সরাসরি প্রভাবিত হবেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ক্রীড়া লেখক শারদা উগরা মনে করেন, মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর মত কাজ করে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের শুরুটা করতো রাজনৈতিক দলের কর্মীরা. আর পরে সেই পালে হাওয়া দিত টিভি মিডিয়া।
তবে সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর অনলাইনে হওয়া আক্রমণ মাঠে পানির বোতল বা ঢিল ছুঁড়ে মারা, দুয়োধ্বনি করা বা কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর চেয়ে 'অনেক বিদ্বেষপূর্ণ' রূপ ধারণ করেছে।
ক্রিকেট লেখক আয়াজ মেমন মনে করেন সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রলের প্রধান শক্তি, যিনি ট্রল করছে তার পরিচয় গোপন করার সক্ষমতা।
"ইন্টারনেটে কোনো ভৌগলিক সীমাবদ্ধতা নেই। ক্ষুব্ধ একজন সমর্থক আমার বাসায় তখনই ঢিল ছুঁড়তে পারবে যখন সে আমার বাড়ির আশেপাশে থাকবে। কিন্তু পৃথিবীর যে কোনো অংশে থেকেই অনলাইনে আক্রমণ করা সম্ভব।" তিনি বলছেন।
ভারতের সমর্থকরা যে শুধু পাকিস্তানের সাথে ম্যাচ হারার কারণেই এমন অসহনশীল আচরণ করছে, তা কিন্তু নয়।
২০০৯ সালে ইংল্যান্ডে টানা দ্বিতীয়বার টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না জিততে পারায় সেসময়কার ভারতীয় দলের ক্যাপ্টেন মহেন্দ্র সিং ধোনির কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়।
২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হারার পর অলরাউন্ডার যুবরাজ সিংয়ের বাড়িতে পাথর নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্দ্ধ সমর্থকরা।
শারদা উগরা মন্তব্য করেন অনলাইনে ক্ষোভ ঝাড়ার এই সংস্কৃতির শুরুটা হয় ভারতের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অহেতুক সমালোচনার মাধ্যমে।
"ভারতের হার নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অহেতুক আগ্রাসী মনোভাব প্রকাশ করতো। আর ঐ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বর্তমানে হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়, হারের পর কোনো একজনকে 'বলির পাঁঠা' বানিয়ে তার উপর সব দোষ চাপানোর মাধ্যমে।"
ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে মাত্রাতিরিক্ত জাতীয়তাবাদী আবেগ বা উগ্র দেশপ্রেমের প্রদর্শনী ভারতে নতুন নয়। তবে আয়াজ মেমন মনে করেন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ার সাথে সাথে ক্ষোভ প্রকাশের সংস্কৃতিরও পরিবর্তন হয়েছে।
"এখন মানুষ আগের চেয়ে অসহিষ্ণু, কম সহনশীল এবং তাদের চাহিদাও অনেক বেশি।"
"এক ম্যাচ হারলেই মানুষ এমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে যে পৃথিবী ধ্বংস হতে যাচ্ছে।"
মি. মেমনের মতে, "এই পরিবর্তনগুলো আমাদের পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন মাত্র।"








