বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্যের উচ্চ মূল্যের সাথেই সবাই খাপ খাইয়ে নিতে হবে?

খাদ্য মূল্য

ছবির উৎস, Getty Images

    • Author, সারোজ পাথিরানা
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস

খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন বিপর্যয় আসতে পারে জাতিসংঘের এমন সতর্কতা আর বৈশ্বিক ক্ষেত্রে খাদ্য পণ্যের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কার মধ্য দিয়েই চলতি বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস (১৬ই অক্টোবর) পালিত হচ্ছে।

"ইথিওপিয়া, মাদাগাস্কার, দক্ষিণ সুদান এবং ইয়েমেনে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতিতে আছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বুরকিনা ফাসো এবং নাইজেরিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীও প্রায় একই পরিস্থিতিতে পড়েছে," এক বিবৃতিতে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

এমন দুর্ভিক্ষময় পরিস্থিতিতে থাকা অন্তত ৪ কোটি মানুষকে সহায়তার জন্য দ্রুত তহবিল গঠনের আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক চ্যারিটি সংস্থা দা হাঙ্গার প্রজেক্টের তথ্য অনুসারে, প্রায় ৬৯ কোটি মানুষ বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ দরিদ্রতার সাথে বাস করছে, আর ৮৫ কোটি মানুষ দরিদ্রতার ঝুঁকিতে আছে কোভিডের কারণে। আবার এর মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী।

এখানে আমরা দেখছি যে খাবারের উচ্চমূল্য বিশ্বব্যাপী এসব মানুষের জন্য কী অর্থ বহন করে এবং খাদ্য দরিদ্রতা কমাতে বিকল্প আর কী আছে। কিন্তু শুরুতেই আমরা দেখবো - খাদ্য মূল্য বাড়ছে কেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

খাদ্য মূল্য

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মহামারির কারণে দাম বাড়ছে

কেন দাম বাড়ছে

খাদ্যের আন্তর্জাতিক বড় প্রতিষ্ঠান ক্রাফট হেইনজ সতর্ক করে বলেছে যে মহামারি-পরবর্তী পরিস্থিতি আর মুদ্রাস্ফীতির কারণে "খাদ্যের উচ্চমূল্যের সাথেই খাপ খাইয়ে নিতে হবে"।

ভারতের মুম্বাইয়ের রাহ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ড. সারিকা কুলকার্নি ক্রাফট হেইনজের প্রধান মিগুয়েল প্যাট্রিসিওর সাথে একমত যে খাদ্যমূল্য বেশিই থাকবে।

ড. কুলকার্নি ও রাহ ফাউন্ডেশন ভারতের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য একযোগে কাজ করছে।

মহামারির কারণে অনেকে দেশেই শস্য থেকে আরম্ভ করে ভোজ্যতেলসহ কাঁচামালের উৎপাদন কমেছে। মূলত করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে নেয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি অসুস্থতা, স্বল্প উৎপাদন ও বিতরণের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

যেহেতু অর্থনীতিতে এমন পণ্যের সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়েছে, অনেকেই হয়তো ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী তা করতে পারছে না, যা দাম বাড়াতে অবদান রাখছে।

পাশাপাশি উচ্চ বেতন আর জ্বালানি মূল্যও উৎপাদনকারীদের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

"দামের সাথে সরাসরি সম্পর্ক আছে চাহিদা ও সরবরাহের। যেখানে জনসংখ্যা আর খাদ্য চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে আবার পানির স্বল্পতা, মাটির গুনাগুণ কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন প্রজন্মের কৃষিকাজে অনিহাসহ নানা কারণে চাষের জমি কমে যাচ্ছে," বলছিলেন দারিদ্র দূরীকরণ বিশেষজ্ঞ ড. কুলকার্নি।

দাম বাড়ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জাতিসংঘ বলছে দাম বাড়ার কারণে ঝুঁকিতে আছে নারী ও কন্যা শিশুরা

খাদ্যের জন্য যৌনতা

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মার্টিন গ্রিফিতের মতে, "যখন দুর্ভীক্ষ দরজায় আসে, তখন এটি ভাইরাল হয়ে ওঠে"।

আর ক্রমবর্ধমান দরিদ্রতা আর খাদ্যের উচ্চ মূল্যে ঝুঁকিতে পড়ে মূলত নারী ও কন্যা শিশুরাই বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে।

"পরিবারের সদস্যদের খাদ্যের যোগান দিতে নারীদের মরিয়া চেষ্টা চালাতে হয়। এর মধ্যে খাদ্যের জন্য যৌনতা যেমন আছে, তেমনি অনেককে বাল্যবিবাহের শিকার হতে হচ্ছে-যা আমি সম্প্রতি সিরিয়ায় থাকার সময় শুনেছি," বলছিলেন তিনি।

ফার্ম রেডিও ইন্টারন্যাশনালের প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র ম্যানেজার কারেন হ্যাম্পসন বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে আছে ছোট মাপের কৃষকরাও।

"দাম বাড়ার এখনকার পরিস্থিতি তাদের দু মুখো তলোয়ারের মতো- একদিকে কৃষক পরিবারগুলোকে তারা যা উৎপাদন করে না, সেসব খাবার কিনতে হয় এবং সে কারণে তাদের ব্যয় অনেক বেড়েছে যাচ্ছে। এটি তাদের ক্ষুধা ও অপুষ্টির দিকে ঠেলে দিচ্ছে," হ্যাম্পসন বলছিলেন বিবিসিকে।

"অন্যদিকে তাত্ত্বিকভাবেই খাদ্যমূল্যবৃদ্ধির অর্থ হলো তারা যা বিক্রি করে, সেখান থেকে তারা ভালো আয় করবে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি মানেই কৃষকদের হাতে বেশি অর্থ আসছে- এমনটি হচ্ছে না। বিশেষ করে আফ্রিকার ক্ষুদ্র মাপের কৃষকদের ক্ষেত্রে।"

ড. কুলকার্নি বলছেন, দরিদ্রতা সরাসরি দামের সাথে জড়িত- যেমন দরিদ্রতা বাড়ছে এবং একই সাথে দামও বাড়ছে।

তানজানিয়ার কৃষক

ছবির উৎস, Susuma Susuma

ছবির ক্যাপশান, কৃষকদের সহায়তা এগয়ে আসতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা

কী করা যেতে পারে

উন্নত বিশ্বের মানুষ হয়তো বিলাসদ্রব্য কমাতে পারে বা বিদেশে ছুটিতে যাওয়া কমাতে পারে বা তাদের বাজেটও কাটছাঁট করতে পারে। কিন্তু এর সুফল সরাসরি অনুন্নত বিশ্বের মানুষ পায় না, বিশেষ করে যারা খাদ্যের জন্য যৌনতাকেও বেছে নিতে বাধ্য হয়।

বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংস্থা ও সরকারগুলো মানুষকে দরিদ্রতা থেকে বের করে আনতে প্রচলিত উপায়গুলো দেখতে পারে। আর বহু সাহায্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী জোর দিয়েছে সৃষ্টিশীল ধারণার ওপর।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) মহাপরিচালক বলছেন, কৃষি খাদ্য পদ্ধতিতে সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী সহায়তার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে এবং নষ্ট করার মতো কোন সময়ই এখন নেই।

ড. কুলকার্নি বলছেন, জলবায়ু সহনশীল কৃষির ব্যবস্থা করা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পানির স্বল্পতা দূর করা, বীজ ও অন্য দরকারি কাঁচামালের দাম কমানো এবং নিজের জন্য শস্য রাখতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

তারা এজন্য তরুণদের সার্বক্ষণিক কৃষিকাজে জড়িত হতেও উদ্বুদ্ধ করছেন বলে জানান।

হ্যাম্পসনের মতে, গ্রামীণ জনপদে খাদ্য দরিদ্রতার আরেকটি বড় কারণ হলো - দরকারি তথ্য না জানা- বিশেষ করে বিভিন্ন বাজারে পণ্যের দাম বা আবহাওয়া বিষয়ে।

এর ফলে তারা দরকষাকষি করতে পারে না যা পরিবর্তন করতে পারে ফার্ম-রেডিও।

কৃষক

ছবির উৎস, Susuma Susuma

ছবির ক্যাপশান, তথ্য নিশ্চিত করাও কৃষকদের জন্য সহায়তা হতে পারে

এখন কী হবে

বিশ্বব্যাপী সবাই হয়তো চিন্তা করছে যে কীভাবে পণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য তারা সামলাবে, তখন অধিকারকর্মীরা আশা করছে একটি সংকট হয়তো বিশ্ব এড়াতে পারবে যদি বিশ্ব নেতারা দ্রুত কোন পদক্ষেপ নেয়।

"আমি আশাবাদী," বলছেন হ্যাম্পসন কিন্তু সেটি করা সম্ভব হবে যদি "আমরা নারী, পুরুষ ও তরুণ কৃষকদের কথা শুনি। আমরা যদি তাদের সংলাপে অন্তর্ভুক্ত করি এবং সমবায়ের মতো পদক্ষেপ বা সৃষ্টিশীল উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের পাশে দাড়াই । জলবায়ু পরিস্থিতিতে ফোকাস করে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সহায়তার মাধ্যমে বাজারে সবার জন্য সমতা তৈরি ও তথ্য নিশ্চিত" করতে পারি।

ড. কুলকার্নি বলছেন যে এখন সমস্যা চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেয়ার সময় আছে।