আফিফ হোসেন: 'আইডল' সাকিব আল হাসানের সাথে তার যত মিল

    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের ক্রিকেট দলে ঢোকার পর তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে একধরনের আগ্রহ দেখা যায়, বিশ্লেষকদের অনেকে উচ্চ প্রশংসা করেন, সমর্থকরা অনেকে তার নামে ফ্যান পেইজ খোলেন, আর সাংবাদিকরা একের পর এক সাক্ষাৎকার নিয়ে তাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। গত ২-৩ বছরে যে ক্রিকেটাররা এই প্রচারের আলো পেয়েছেন তাদের অন্যতম আফিফ হোসেন ধ্রুব।

২২ বছর বয়সী এই তরুণ অল্প ম্যাচ খেলেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে জাতীয় দলে জায়গা মোটামুটি পাকা করে ফেলেছেন।

বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে নিজের ক্যারিয়ার এবং আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে কথা বলেছেন এই তরুণ ক্রিকেটার।

বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপির ছাত্র আফিফ।

সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিমদের পথ অনুসরণ করে তিনিও বয়সভিত্তিক দল হয়েই জাতীয় দলে ঢুকেছেন।

তবে আফিফ নজর কেড়েছেন মূলত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ টি-টোয়েন্টি আসরে।

বেশ কয়েকটি ম্যাচে টপ অর্ডারে ব্যাট করে দ্রুত রান তুলেছেন, দলকে ভালো শুরু এনে দিয়েছেন।

ক্রিকেট নিয়ে আরো পড়তে পারেন:

আফিফ মনে করেন তার মূল শক্তি, তার সাহস। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশের জয়ে বড় অবদান রেখেছেন আফিফ, প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচে ব্যাট হাতে ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ জিতিয়েছেন। বিশেষত মিচেল স্টার্ককে যেভাবে সামলেছেন সেটা নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে ক্রিকেট পন্ডিতদের মাঝে।

সাকিব আল হাসানও নিজের ব্যাটসম্যান পরিচয়ের প্রতি সুবিচার করেন ঢাকায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটি সিরিজেই, সেবার বেশ কঠিন সব সমীকরণ মিলিয়ে সাকিব বাংলাদেশকে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে তোলেন।

আফিফ মনে করেন উইকেটের কন্ডিশন বোঝাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকটা ম্যাচ, সামনে কার সাথে ম্যাচ, কী কন্ডিশনে খেলা হবে সেটাই আসল ব্যাপার।

মিরপুর স্টেডিয়ামেই ক্রিকেটার আফিফের বেড়ে ওঠা, বিশেষত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে ব্যাট হাতে তিনি আগ্রাসী ভূমিকা পালন করে সোজা জাতীয় দলে জায়গা করে নেন।

দুই বছর ধরেই জাতীয় দলের আশেপাশে থাকা আফিফ এখন অনেকটাই জাতীয় দলে নিজেকে থিতু করেছেন।

সিনিয়র ক্রিকেটারদের মধ্যে আফিফ বেশ 'প্রিয়পাত্র' হিসেবে পরিচিত। ব্যাট করতে নামার আগে বর্তমান অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আফিফকে বলেন, 'তুমি উইকেটে থাকলে টেনশন নেই।'

আফিফের মতে এই বিশ্বাস ও আস্থা ধরে রাখাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আফিফ জাতীয় দলে যখন ঢোকে তখনই বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুসারীরা বাংলাদেশের সফলতম ক্রিকেটার সাকিবের সাথে তুলনা দেয়া শুরু করেন।

বিশেষত বাঁ হাতে ব্যাট করার কারণে এবং মাঠে দাপুটে শারীরিক ভাষার কারণে সাকিবের সাথে তুলনা দেন ধারাভাষ্যকাররাও।

ডান হাতি স্পিনার আফিফ বল হাতেও কাজ চালাতে পারেন, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের অভিষেক ম্যাচে রাজশাহীর হয়ে ২১ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন আফিফ।

তবে দলের সম্বয়ের কারণে খুব বেশি বল হাতে না পেলেও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যেখানেই পারবেন সেখানেই অবদান রাখতে চান আফিফ হোসেন।

তার মতে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী দলের কাজে আসাটাই মূল ব্যাপার।

তিনি বলেন, "পরিস্থিতি যাই থাকুক, উইকেটে থাকলে রান আসবেই। এটাই আমার বিশ্বাস"

এই বিশ্বকাপ যেমন মাশরাফী পরবর্তী যুগের প্রথম বিশ্বকাপ, তেমন জুনিয়র এক ঝাঁক ক্রিকেটারদের পরীক্ষাও।

যেমন তাদের নিয়ে বলা হয় তার কতোটা মাঠে দিতে পারবেন এটা দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা।

আফিফ এসব চাপকে পাশে সরিয়ে রাখতে চান। তার মতে, ম্যাচ বাই ম্যাচ দল হিসেবে ভালো খেলাই মূল ব্যাপার।

আফিফও বলেছেন, তিনি জাতীয় দলের কারো মতো হতে চাইলে সেটা শুধুই 'সাকিব ভাই'। তবে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আফিফের প্রথম দিককার ক্রিকেট হিরো ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তী উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান- অ্যাডাম গিলক্রিস্ট।

ইতোমধ্যে ৯৮টির মতো ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন ২২ বছর বয়সী আফিফ হোসেন। যেখানে তিনি ২৩ গড় ও ১২৭ স্ট্রাইক রেট বজায় রেখেছেন।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে পরিসংখ্যান এতোটা ভালো না, ১৮ গড় ও ১২৩ স্ট্রাইক রেট আফিফের।

মূলত এই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচেই নজর কেড়েছেন আফিফ।

এখানে তিনি প্রমাণ করেছেন যে চাপ নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামলেও আফিফ হোসেন তার সাবলীল খেলাটা খেলতে পারেন।

আফিফ হোসেন চলতি বছর ১৬টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে তুলেছেন ২৬০ রান।

তবে তিনি এসব সংখ্যা বা বিশ্লেষণ নিয়ে ভাবছেন না, কারণ তার মনে পড়ে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম ম্যাচেই 'ডাক' মারার পর অনেকেই তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন।

"আমি নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করি না। আমার কেবল মাঠে চিন্তা থাকে ভালো খেলা। সব জায়গায় ভালো খেললে সব জায়গায় সুযোগ আসবে।"

একে একে ভালো খেলে একেকটি ক্যারিয়ার ধাপ পার করেন আফিফ, ২০১৮ অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে আফিফ ছিলেন অন্যতম সেরা পারফর্মার, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগেও রাজশাহীর হয়ে টপ অর্ডারে ব্যাট করে নজর কাড়েন তিনি, তবে জাতীয় দলে থিতু হতে খানিকটা সময় নিয়েছেন।

নির্বাচকদের মধ্যে আফিফ হোসেনকে নিয়ে সবসময় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে।

হাবিবুল বাশার সুমন মনে করেন, চিন্তাভাবনা অনেক পরিষ্কার আফিফের, সে জানে তাকে কী করতে হবে।

আফিফও মনে করেন ক্রিকেট খেলায় মূল ব্যাপার হচ্ছে, 'নিজে কী করছি জানা'।

তিনি বলেন, "আমি একদিন ভালো করবো একদিন খারাপ করবো এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তবে এখানে জানতে হবে আমি কী চাই এবং সেটা আমি কীভাবে অর্জন করবো।"

অল্প বয়সেই ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লীগেও ডাক পান তিনি, তার রোলমডেল সাকিবও ফ্র্যাঞ্চাইজ টি-টোয়েন্টি লীগগুলোতে আলোচিত এক নাম।

বিকেএসপি-তে খেলার সময়ই আফিফের মা মারা যান। বড় খালার কাছেই বড় হয়েছেন আফিফ।

আফিফের বড় খালাই তার জীবনে মায়ের ভূমিকায় আছেন, "বড় খালার কাছে এমনভাবে বড় হয়েছি কখনো টের পাইনি মায়ের অভাব।"

১৯ বছর বয়স থেকেই দৃঢ় মানসিকতার বলে ক্যারিয়ার তৈরি করেছেন আফিফ হোসেন।

এদিক থেকেও মিল আছে তার আইকন সাকিবের সাথে, বিকেএসপির জীবন, নির্লিপ্ত চাপহীন মানসিকতা ও মাঠে দাপুরে শারীরিক ভাষা- এসবে তো আফিফে সাকিবের ছাপ আছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য কতোটা 'সাকিব'-এর ভূমিকা নিতে পারবেন সেটা সময়ই বলে দেবে।

বিবিসি বাংলার পাতায় যা পড়তে পারেন-