জেমস বন্ড: সিনেমার গুপ্তচর কাহিনির সাথে বাস্তব গুপ্তচরবৃত্তির কতটা মিল রয়েছে?

    • Author, ফ্র্যাংক গার্ডনার
    • Role, বিবিসি নিউজ

অবশেষে! মহামারির কারণে দেরি, এছাড়াও হঠাৎ করে পরিচালক বদল- নানা কারণে দীর্ঘ বিলম্বের পর রূপালি পর্দায় হাজির নতুন জেমস বন্ড ছবি 'নো টাইম টু ডাই'। জেমস বন্ড সিরিজে এটি ২৫তম বন্ড মুভি। এছাড়াও জেমস বন্ড চরিত্র থেকে এই ছবির পরই বিদায় নিচ্ছেন অভিনেতা ড্যানিয়েল ক্রেগ।

সব মিলিয়ে নানা কারণে সাড়া ফেলে দিয়েছে 'নো টাইম টু ডাই'।

চলচ্চিত্র সমালোচকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা, পাঁচ-তারা মার্কা রিভিউ- দীর্ঘ অপেক্ষা - সব কিছু মিলিয়ে বন্ড ভক্তদের মধ্যে ছবিটি দেখার হিড়িক পড়ে গেছে।

কিন্তু চলচ্চিত্রের গুপ্তচর নায়ক জেমস বন্ডকে ব্রিটেনের যে গুপ্তচর সংস্থা এমআইসিক্স-এ কাজ করতে আমরা দেখি, সেখানে তার কাজের ধারা কি কল্পকাহিনির মসলায় ভরা নাকি এমআইসিক্স-এর গুপ্তচররা আসলে এভাবেই কাজ করে থাকেন?

বিবিসিতে আরও পড়ুন:

কীভাবে কাজ করেন ব্রিটিশ গুপ্তচররা?

এমআইসিক্স সংস্থার আসল নাম সিক্রেট ইন্টালিজেন্স সার্ভিস বা এসআইএস। এমআইসিক্স ব্রিটেনের বর্হিদেশীয় গোয়েন্দা সংস্থা যারা গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে।

কাজেই আজকের ডিজিটাল যুগে একটা গুপ্তচর সংস্থা যেভাবে কাজ করে তার সাথে জেমস বন্ডের গুপ্তচরবৃত্তির পার্থক্য কোথায়?

"সবচেয়ে বড় পার্থক্য হল, বন্ড সিনেমায় যে গুপ্তচরবৃত্তি আমরা দেখি, আমাদের গুপ্তচরবৃত্তি সেরকম নয়। আমরা অনেক বেশি সমন্বিতভাবে কাজ করি," বলছেন এমআইসিক্স কর্মকর্তা স্যাম (তার আসল নাম নয়)। "একদম একা, কোন সাহায্য ছাড়াই আমাদের কোন গুপ্তচর কাজ করছে এটা খুবই বিরল- বলতে গেলে সেটা ঘটেই না। আমরা দলে কাজ করি- আমাদের আশপাশে সঙ্গে থাকে একটা পুরো নিরাপত্তা দল।"

এমআইসিক্স-এ কেস অফিসার হিসাবেই কেরিয়ার তৈরি করেছেন স্যাম। তার বিশেষত্ব হল সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা কাজ। বন্ড ছবি মুক্তি পাওয়ার আগে এই সংস্থায় বর্তমানে গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে কর্মরত এরকম কয়েকজনের সঙ্গে আমি কথা বলার অনুমতি চেয়েছিলাম।

আমার প্রশ্ন ছিল- আপনারা যদি জেমস বন্ডের মত না হন, তাহলে আপনারা, এমআইসিক্স গোয়েন্দারা, কী ধরনের গুপ্তচর? সংস্থার সদরদপ্তরে বা "বিদেশের মাটিতে" আপনারা কীভাবে কাজ করেন?

"অনেক ধরনের ভূমিকায় আমাদের কাজ করতে হয়," জানালেন আরেক অফিসার তারা (এটাও তার আসল নাম নয়)। "বিদেশে আমাদের হয়ে যারা চরের কাজ করে তাদের নিয়োগ করা, তাদের সাথে যোগাযোগ রাখা, তাদের কাজের ওপর নজর রাখা, এসব দায়িত্ব আছে। আমাদের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ লাগে। আমাদের যোগাযোগ টিম আছে। যেখানে ঘটনা ঘটছে সেখানে আমাদের তীক্ষ্ম নজর রাখতে হয়- আমাদের সেখানে সবার থেকে এগিয়ে থাকতে হয়।"

"সবচেয়ে বড় কথা আমরা কখনই একা কাজ করি না। জেমস বন্ডের সাথে বাস্তবে আমাদের বড় তফাত এখানেই। এখানেই এসআইএস-এর কাজের সাথে বন্ডের কাজের কোন বাস্তব মিল নেই। ধরুন কেউ যদি আমাদের কাছে আবেদনপত্র পাঠিয়ে বলে একটা গোয়েন্দা কাজ সে একা একা মোকাবেলা করতে চায়, কাউকে সাথে চায় না- তার আবেদন কিন্তু তখুনি নাকচ হয়ে যাবে।"

আগ্নেয়াস্ত্র? এমআইসিক্স অফিসাররা কি কখনও আগ্নেয়াস্ত্র সাথে রাখেন? আমার এই প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক জবাব ছিল: "আমরা হ্যাঁ-ও বলব না, না-ও বলব না।"

তবে আরেকজন এমআইসিক্স কর্মকর্তা আমাকে বললেন: "একজন গুপ্তচর, বন্ডের ঢং-য়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দুর্ধর্ষ কায়দায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, ভাঙচুর করে এখানে সেখানে ঢুকে পড়ছেন, আমাদের কাছে এটা একেবারেই অভাবনীয়। এমন কোন গুপ্তচর আমাদের সংস্থায় এককথায় ঠাঁই-ই পাবেন না।

বিপদজ্জনক এলাকায় গুপ্তচরদের ঝুঁকি

এবার তাকানো যাক পৃথিবীর সেসব দেশের দিকে, যেখানে গুপ্তচর হিসাবে কাজ করার ঝুঁকি অনেক।

ধরা যাক সেখানে অনেক বিপদের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন ব্রিটিশ এক গোয়েন্দা। এখন সেখানে তার হাতে যদি অস্ত্র না থাকে, তাহলে এটা ধরে নেয়া যায় যে, তার খুব কাছেই অস্ত্র হাতে কেউ গোপনে তার ওপর চোখ রাখছে।

কিন্তু আসলে, এমআইসিক্স কর্মকর্তারা গুপ্তচর নন। তারা গোয়েন্দা কর্মকর্তা, তারা এভাবে মাঠেঘাটে কাজ করেন না। যেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ জরুরি বলে তারা মনে করেন, সেখানে তারা আসল চরদের কাজ করতে রাজি করান। যারা খবর যোগাড় করার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি তাদের কাজে লাগানোই এই কর্মকর্তাদের কাজ। যেমন ধরুন, আল কায়েদার হামলা পরিকল্পনা চক্রে ঢুকে বা বৈরি কোন দেশের পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে ব্রিটিশ সরকারের জন্য গোপন তথ্য চুরি করে আনার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি কে, তাকে খুঁজে বের করে কাজে লাগানোই এদের দায়িত্ব।

আসল এবং সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা কিন্তু নিচ্ছে ওই চরেরা যারা ভেতর থেকে গোপনে তথ্য পাচার করছে। তবে, তাদের এবং তাদের পরিবারের পরিচয় গোপন রাখার বিষয়টাকে এমআইসিক্স যে বিশাল গুরুত্ব দেয় এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমার পরের প্রশ্ন ছিল মাঠ পর্যায়ে যে চরদের নিয়োগ করা হয়, এমআইসিক্সের যে কর্মকর্তারা তাদের নিয়োগ করছেন, তারা চরদের সাথে কতটা ঘনিষ্ঠ হন। তাদের মধ্যে কি কখনও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে?

"পরস্পরের ওপর একটা নির্ভরতা অবশ্যই গড়ে ওঠে," বলছেন সংস্থায় কর্মরত আরেকজন কর্মকর্তা টম। "যে প্রাণের ঝুঁকি নিচ্ছে আমার জন্য, তার জীবনের দায়িত্ব তো আমার উপর। ফলে আমাদের কথাবার্তা এমন হয়, যা হয়ত শুনতে সুখকর নয়। কিন্তু তার নিরাপত্তার স্বার্থে কঠিন বাস্তবতাগুলো আমাদের তুলে ধরতে হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খোলামেলা কথা বলতেই হয়।"

"আমাদের হয়ে খবর যোগাড় করতে মানুষ জীবনের ঝুঁকি নেয়," বলছেন এমআইসিক্স অফিসার তারা। "কোন কোন কাজ ততটা ঝুঁকির নয়। তবে কিছু কিছু ব্যক্তি আছেন, যাদের সাথে কাজ করতে পারাকে আমরা একটা বিরাট সুযোগ বলে মনে করি। আমাদের জন্য তারা গুপ্তচরের কাজ করছেন বলে যদি ধরা পড়ে যান, তাদের চরম বিপদ হতে পারে। তাদের প্রাণ সংশয় হতে পারে। তাই যোগাযোগের প্রথম দিন থেকে আমরা গোটা অপারেশনটা চরম গুরুত্বের সাথে নিই।"

আরও পড়তে পারেন:

প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য

সবশেষ জেমস বন্ড মুভি ছিল ২০১৫ সালে তৈরি 'স্পেক্টর'। এর পর গত ছয় বছরে গুপ্তচরবৃত্তির আসল দুনিয়ায় অনেক বদল ঘটেছে। ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর স্ব-ঘোষিত খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আবার তা ভেঙেও পড়েছে। ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার জন্য চুক্তি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে, চীন তাইওয়ানের "আবার দখল" নেবার ব্যাপারে হাঁকডাক করছে। সব মিলিয়ে এমআইসিক্স-কে ব্যস্ত রাখার জন্য অনকে কিছুই ঘটেছে।

তবে বর্তমান যুগে প্রায় সব পদক্ষেপই ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে গেছে। ফলে অন্য কারো গোপন তথ্য চুরি করে আনার জন্য একজনকে চর হিসাবে কাজ করতে রাজি করানোর সাবেকী পদ্ধতির প্রয়োজন কি এখনও আদৌ রয়েছে?

"আপনাকে আসলে হিসাব করতে হবে একটা তথ্য কতদিন লাইভ থাকে- অর্থাৎ তা যোগাড় করা থেকে শুরু করে বিশ্লেষণ করা পর্যন্ত সেটাকে কতদিন গুরুত্ব দেয়া যাবে," বলছেন এমা (আসল নাম নয়), যিনি এমআইসিক্সে র শীর্ষ একজন প্রযুক্তি কর্মকর্তা।

"এই তথ্য যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ার প্রত্যেক পর্যায়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা কাজ করেন। এই প্রক্রিয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যেসব গুপ্তচর মাঠ পর্যায়ে খবর সংগ্রহ করছেন সেগুলো বিশ্লেষণ করার জন্য আমরা সবসময় নানা ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। এখানে মানুষ আর প্রযুক্তির মধ্যে একটা সমাঞ্জস্য বা সম্পর্ক গড়ে তোলা কিন্তু গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্ব বিচারের ক্ষেত্রে খুবই জরুরি।"

তাহলে কি লন্ডনে এমআইসিক্স সদর দপ্তরের ভেতরে গভীরে লুকানো কোন ঘরে নানা ধরনের যন্ত্রপাতিতে ভর্তি একটা কর্মশালা রয়েছে? উত্তর - কার্যত হ্যাঁ।

"তবে আমরা চলচ্চিত্রে যেমনটা দেখেছি এই কর্মশালা তেমনটা নয়," বলছেন এমা। আমার কাজের জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য বেশ বড়সড় একটা প্রকৌশলী দল কাজ করে। আর বন্ড মুভিতে যেমন দেখি- আমরা সবাই কিন্ত তেমন সাদা কোট পরে ঘুরে বেড়াই না। আর আমরা সব ছবির মত প্রযুক্তি-পাগল উদ্ভট মানুষও নই। আমরা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করি। তারা যা জানতে চাইছেন, কোন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সেই তথ্য আমরা তাদের হাতে পৌঁছে দিতে পারি, সেটাই আমরা চেষ্টা করি।"

প্রথম বন্ড মুভি তৈরি হয়েছিল ১৯৬২ সালে - প্রায় ৬০ বছর আগে 'ড. নো'। লেখক ইয়ান ফ্লেমিং সৃষ্টি করেছিলেন তার বিখ্যাত কাল্পনিক গুপ্তচর চরিত্র জেমস বন্ড। তিনি নিজে ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে কাজ করতেন।

এরপর এই দীর্ঘ সময়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে এত বদল ঘটেছে যে সে আমলের সাবেক গুপ্তচরদের এখন আর চেনাই যায় না।

গুপ্তচরবৃত্তির নতুন যুগ

এমআইসিক্স গোয়েন্দা সংস্থায় উঁচু পদে এখন কাজ করছেন যেসব কর্মকর্তা তারা তাদের কেরিয়ার শুরু করেছিলেন যে যুগে, সে যুগে না ছিল মোবাইল ফোন, না ছিল ইন্টারনেট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা তো ছেড়েই দেয়া যায়।

সে জমানায় তথ্য রাখা গচ্ছিত রাখা হতো আলমারিতে বা ইস্পাতের ক্যাবিনেটের ভেতর শক্ত তালাচাবি দিয়ে। বায়োমেট্রিক তথ্যের কোন ব্যবহারই ছিল না। আর এমআইসিক্স বলেও গোয়েন্দা সংস্থার অস্তিত্ব ছিল না। এই গোয়েন্দা সংস্থার যাত্রা শুরু ১৯৯৪ সালে।

সে যুগে ছদ্মবেশে কাউকে সীমান্ত পার করে চর হিসাবে অন্য দেশে বা শত্রুপুরীতে পাঠিয়ে দেয়ার কাজটা মোটামুটি সহজই ছিল। দরকার হতো হয়ত নকল দাড়িগোঁফ এবং একজোড়া চশমা।

এখন বিষয়টা অত সহজ নয়- তবে একেবারে অসম্ভব নয়। এখনও ছদ্মবেশে, ছদ্মপরিচয়ে চর হিসাবে যাতায়াতের নজির রয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ব্রিটিশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক কেজিবি চর সের্গেই ক্রিপালকে খুন করার জন্য ব্রিটেনের সলসবেরিতে ছদ্ম পরিচয়ে চর পাঠানোর ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে।

তবে চরদের যাতায়াত আজকের যুগে অনেক কঠিন হয়ে গেছে তথ্য বিপ্লবের কল্যাণে। এখন চোখের মনি স্ক্যান করে মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করার প্রযুক্তি এসেছে। রয়েছে বায়োমেট্রিক তথ্য বিশ্লেষণের প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার এনক্রিপশান, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংসহ যাবতীয় গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের বিভিন্ন প্রযুক্তি।

তবে এমআইসিক্স-এর প্রধানের পদে ছয় বছর ধরে কাজ করেছেন মাত্র গত বছর পর্যন্ত সার অ্যালেক্স ইয়াঙ্গার বলছেন, গুপ্তচরবৃত্তিতে মানুষকে ব্যবহার করার পদ্ধতি সবসময়েই অপরিহার্য থেকে যাবে।

বন্ড মুভিতে তার চরিত্রের নাম 'এম'। নতুন বন্ড ছবি 'নো টাইম টু ডাই'তে তাকে ভবিষ্যতবাণী করতে শোনা গেছে, "বিশ্বের হাতে এত দ্রুত নতুন নতুন অস্ত্র চলে আসছে, যে তার সাথে পাল্লা দেবার সময় আমাদের হাতে নেই।

এমআইসিক্স-এ যারা প্রতিদিন কাজ করতে যাচ্ছেন, তারা আসলে ঠিক সেই লক্ষ্যেই কাজ করছেন- গুপ্তচরবৃত্তির আধুনিক হাতিয়ার উদ্ভাবনই তাদের মূল্য লক্ষ্য।