ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের পোস্ট নিয়ে ফেসবুক-এর 'পক্ষপাতিত্ব' পর্যালোচনা করার সুপারিশ করেছে পর্যবেক্ষণকারী বোর্ড

পতাকা নিয়ে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কেউ কেউ মনে করেন এ বছর আগের দিকে গাযার সংঘাত বিষয়ক পোস্টগুলোর প্রতি সামাজিক মাধ্যম নিরপেক্ষ আচরণ দেখায়নি

ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েল বিষয়ে ফেসবুক পোস্টের ওপর নজরদারি করার ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার সুপারিশ করেছে ফেসবুক ওভারসাইট বোর্ড, যারা সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে।

ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারীদের পোস্ট সেন্সর করা হচ্ছে এমন অভিযোগকে ঘিরে বোর্ড যেসব প্রশ্ন তুলেছিল সেসব প্রশ্নের সবগুলোর জবাব দিতে ফেসবুক ব্যর্থ হবার পর বোর্ড এই সুপারিশ করেছে।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সংবাদ মাধ্যম থেকে নেয়া একটি কট্টরপন্থী গোষ্ঠী বিষয়ে আরবী ভাষার একটি পোস্ট যেটি শেয়ার করেছিলেন একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী।

জবাবে ফেসবুক বলেছে তারা এই সুপারিশ বিবেচনা করে দেখবে।

প্রভাবশালী প্রযুক্তি মাধ্যম ফেসবুক আরও বলেছে ওভারসাইট বোর্ডের সিদ্ধান্তকে তারা "স্বাগত" জানাচ্ছে।

"বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং সুপারিশ পর্যালোচনা করার পর আমরা পোস্টটি আপডেট করব," ফেসবুক জানিয়েছে।

আরও পড়ুন:

একজন ফিলিস্তিন সমর্থক নারী এবং একজন ইসরায়েল সমর্থক পুরুষ পরস্পরকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, একজন ফিলিস্তিন সমর্থক নারী এবং একজন ইসরায়েল সমর্থক পুরুষ পরস্পরকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করছেন

কী ছিল পোস্টে?

মিশরের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী ২০২১ সালের মে মাসে আরবী ভাষার একটি পোস্ট শেয়ার করেন। বোর্ড বলছে পোস্টটি ছিল আল জাজিরা নেটওয়ার্কের "সংবাদ পেজ" থেকে নেয়া এবং সেটি ছিল গাযা ও পশ্চিম তীরে অধিকৃত এলাকাগুলোর সাথে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা নিয়ে।

পোস্টটিতে একটি ছবিও দেয়া হয়েছিল যেখানে দুই ব্যক্তি ছিলেন ছদ্মবেশে, তাদের মুখ ঢাকা ছিল, মাথায় পরা ছিল ইজ্জেদিন আল-কাসাম ব্রিগেডের প্রতীক চিহ্ণ আঁকা হেডব্যান্ড। ইজ্জেদিন আল-কাসাম ব্রিগেড হামাস গোষ্ঠীর সশস্ত্র শাখা যারা গাযা নিয়ন্ত্রণ করে।

ওভারসাইট বোর্ড বলছে আরবী ভাষার পোস্টের ইংরেজি অনুবাদ করলে দাঁড়ায়: "প্রতিরোধ নেতৃত্ব সন্ধ্যা ছয়টা (১৮:০০) পর্যন্ত দখল আন্দোলনে বিরতি দিচ্ছে যাতে আল-আকসা মসজিদ এবং শেখ জারাহ মহল্লা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। অন্যথায় হুঁশিয়ার করে দেয়া ব্যক্তিকে যেন দোষ দেয়া না হয়। আবু উবাইদা- আল-কাসাম ব্রিগেডের সামরিক মুখপাত্র।"

ফেসবুক ব্যবহারকারী এরপর আরবী ভাষায় শুধু একটি ক্যাপশন যোগ করেন "উউহ্"।

ফেসবুকের বক্তব্য কী?

ফেসবুক তাদের বিপজ্জনক সংগঠনের সংজ্ঞার বিচারে এবং কারও কার্যকলাপ তাদের প্ল্যাটফর্মের মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিক কিনা সেই বিচারে আল-কাসাম ব্রিগেডকে বিপজ্জনক সংগঠন হিসাবে চিহ্ণিত করে।

আরও পড়ুন:

ফেসবুক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গাযার সংঘাত চলাকালীন ফেসবুকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেশ কিছু ফেসবুক ব্যবহারকারী

প্রথমে ফেসবুক এই পোস্টটি সরিয়ে নেয়। তবে যে ব্যক্তি এটি শেয়ার করেছিলেন তিনি ওভারসাইট বোর্ডের কাছে সরাসরি আপিল করার পর তারা পোস্টটি আবার ফেরত আনে।

তবে ফেসবুক এটা ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয় যে, দুজন ব্যক্তি যারা নিজেরা সরাসরি এই পোস্টটি পর্যালোচনা করে তা সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা কেন মনে করেছিলেন পোস্টটি সংস্থার নীতিমালা লংঘন করেছে। ফেসবুক জানায় কোন কন্টেন্ট সরানোর সিদ্ধান্ত পর্যালোচনাকারীরা কোন কারণে নিচ্ছেন সেটা জানাতে তারা বাধ্য নয়।

পোস্টটি ফিরিয়ে আনার ফেসবুকের সিদ্ধান্তের সাথে বোর্ড একমত হয়েছে। তারা বলেছে "বৈধ একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের একটি খবর, যা জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জরুরি একটি সংবাদ, তা পুনরায় প্রকাশ করার সিদ্ধান্তে তারা একমত।"

ইসরায়েলের অনুরোধ?

ওভারসাইট বোর্ড তাদের তদন্তের অংশ হিসাবে ফেসবুকের কাছে প্রশ্ন করেছিল এপ্রিল ও মে মাসে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সহিংসতা সংক্রান্ত কন্টেন্ট সরিয়ে ফেলার জন্য ইসরায়েলি সরকার ফেসবুকের কাছে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনরকম অনুরোধ জানিয়েছিল কিনা। ওই সহিংসতার জেরে ইসরায়েল ও গাযার মধ্যে সংঘাত বেড়ে তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়।

ফেসবুক যদিও বলেছে যে পোস্টটি নিয়ে এই বিতর্ক সেই পোস্টটি সম্পর্কে তারা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কোন অনুরোধ পায়নি, কিন্তু বেসরকারিভাবে তাদের কোন অনুরোধ জানানো হয়েছিল কিনা সে প্রশ্নের তারা জবাব দেয়নি।

এই পোস্টকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের যেসব মন্তব্য তুলে ধরা হয় তাতে এমন অভিযোগ ছিল যে ফেসবুক ফিলিস্তিনিদের পোস্ট করা কন্টেন্ট এবং সংঘাত বিষয়ে আরবী ভাষার কন্টেন্টগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মাত্রায় সরিয়ে ফেলেছে বা সেগুলো শেয়ার করতে বাধা দিয়েছে। ইসরায়েলি বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উস্কানি দেওয়া কন্টেন্ট সরানোর জন্যও ফেসবুক যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি বলেও সমালোচনা এসেছে।

বিবিসি বাংলার আরও খবর:

গাযা এবং ইসরায়েল সীমান্তে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের দিকে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ছে ইসরায়েলি বাহিনী (ফাইল চিত্র)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গাযা এবং ইসরায়েল সীমান্তে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের দিকে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ছে ইসরায়েলি বাহিনী (ফাইল চিত্র)

বোর্ডের কিছু সুপারিশ

ফিলিস্তিনের একটি ডিজিটাল গোষ্ঠী দেখেছে, সংঘাত চলাকালে ৬ থেকে ১৯শে মের মধ্যে গাযার সংঘাত সংক্রান্ত প্রায় ৫০০টি পোস্ট সরিয়ে ফেলা হয়।

বিশ্বের ঘটনাবলী বিষয়ক ফেসবুকের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিক ক্লেগ পরে ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ স্থায়ে-র কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন কিছু কিছু পোস্টকে সহিংসতায় উস্কানিমূলক পোস্ট হিসাবে ভুলভাবে চিহ্ণিত করার কারণে।

ওভারসাইট বোর্ড তাদের তদন্তের ফলশ্রুতিতে ফেসবুকের কাছে বেশ কিছু সুপারিশ পাঠিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • একটি নিরপেক্ষ গোষ্ঠী গঠন করতে হবে, যাদের সাথে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের কোন পক্ষের কোন সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। এই গোষ্ঠী পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষভাবে পরীক্ষা করে যাচাই করবে আরবী এবং হিব্রু ভাষায় পোস্ট করা কন্টেন্ট ফেসবুক পক্ষপাত না করে, সমান দৃষ্টিতে বিবেচনা করছে কিনা, এমনকি ফেসবুক সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে করলেও সেটা দু পক্ষের ক্ষেত্রেই সমান ও নিরপেক্ষভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে কিনা
  • তাদের প্রতিবেদন ও উপসংহার জনগণের কাছে প্রকাশ করতে হবে
  • কন্টেন্ট সরিয়ে নেবার জন্য সরকারগুলোর কাছ থেকে অনুরোধ আসলে সেটা কীভাবে গ্রহণ করা হবে এবং তাতে কীভাবে সাড়া দেয়া হবে সে বিষয়ে একটি প্রক্রিয়ার রূপরেখা নিরূপণ করতে হবে এবংএ ব্যাপারে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে কিনা সেটাও নিশ্চিত করতে হবে
  • তাদের রিপোর্টে আলাদা করে উল্লেখ করতে হবে, কোন কন্টেন্ট সরকারি অনুরোধের কারণে ফেসবুকের মান লংঘন করার দায়ে সরিয়ে নেয়া হল এবং কোন কন্টেন্ট স্থানীয় আইন লংঘনের দায়ে সরিয়ে ফেলা হল। পাশপাশি এটাও বলতে হবে কোন্ সরকারি অনুরোধের পর সেই কন্টেন্ট নিয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।