৯/১১ হামলা: টুইন-টাওয়ারে স্বামী হারানোর পর বাংলাদেশী নারী মুসলিম হওয়ার জন্য বিদ্বেষের শিকারও হয়েছিলেন

ছবির উৎস, Baraheen Ashrafee
- Author, সাইয়েদা আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বিশ বছর আগে ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে, টুইন টাওয়ারে এক নজীরবিহীন সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছিলেন প্রায় তিন হাজার মানুষ। এদের মধ্যে ১৫ জন ছিলেন বাংলাদেশী-বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক।
তাদেরই একজন ছিলেন ৩৮-বছর বয়সী মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী। কাজ করতেন তিনি টুইন টাওয়ারের একটি টাওয়ার ভবনে অবস্থিত 'উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড' নামের এক নামী রেস্তোরাঁয়।
ওই সন্ত্রাসী হামলায় রেস্তোরাঁর আরও ৮৮জন সহকর্মীর সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছিলেন মি. চৌধুরী।
যাত্রীবাহী বিমান ব্যবহার করে টুইন টাওয়ারে চালানো সন্ত্রাসী হামলাকে আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনাগুলোর একটি বলে মনে করা হয়। ওই ঘটনার পর পুরো পৃথিবীর রাজনীতি এবং চিন্তা-ভাবনাই বদলে গিয়েছিল।
আর সেই সঙ্গে বদলে গিয়েছিল স্বজন হারানো বহু মানুষের জীবন, বহু পরিবারের জীবনধারা।
সা্লাহউদ্দিন চৌধুরীকে হারানোর কষ্ট স্ত্রী বারাহীন আশরাফী গত বিশ বছর ধরে অনেকটা একাই বয়ে বেড়াচ্ছেন - গণমাধ্যম এড়িয়েই চলছিলেন তিনি, তবে কথা বলেছেন বিবিসি বাংলার সঙ্গে।
স্বামী হারানোর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সন্তান জন্ম দেয়া, মুসলিম পরিচয়ের কারণে বিদ্বেষের শিকার হওয়া, সন্তান পালনের জন্য তুলনামূলক কম ব্যস্ত একটি রাজ্যে স্থানান্তরিত হওয়া - গত দুই দশকে এমন নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।
মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী কে ছিলেন?
টুইন টাওয়ারের একটি টাওয়ারের ছিল 'উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড' রেস্তোরাঁ। সেখানে কাজ করতেন মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী। যে ভবনটিতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ছিল, সেই ভবনের ১০৬ ও ১০৭ তলা জুড়ে ছিল রেস্তোরাঁটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করে ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন তিনি।
সেখানে গিয়ে সালাহউদ্দিন চৌধুরী কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশুনা করেন। শুরুতে বাল্টিমোরে পড়াশোনা এবং পরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি নিউইয়র্কে চলে যান।
এরপর এক সময় 'উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড' রেস্তোরাঁয় ওয়েটার হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।
শহরের কুইন্স এলাকার বাড়িতে স্ত্রী বারাহীন আশরাফী আর পাঁচ বছর বয়েসী কন্যাকে নিয়ে ছিল তার সংসার। সেপ্টেম্বরের ওই সময়টায় প্রায় সাড়ে নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন বারাহীন।
যেভাবে ঘটনা ঘটেছিল সেদিন
১১ই সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যায় বারাহীনের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। সন্তান জন্মের আগে ফাইনাল চেকআপ।
সে কারণে সালাহউদ্দিন চৌধুরী সেদিন আরেকজন সহকর্মীর সাথে শিফট বদলে সকালের নিয়েছিলেন।
ঠিক সময়ে যাতে কাজে পৌঁছুতে পারেন, সেজন্য ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলেন।
বারাহীন আশরাফীর মনে আছে, কুইন্সের বাড়িতে ভোররাত সাড়ে চারটার দিকে অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দে স্বামী-স্ত্রী দুইজনেরই ঘুম ভেঙেছিল।
উঠে স্ত্রীকে নিয়ে ফজর নামাজ পড়েন মি. চৌধুরী।

ছবির উৎস, Getty Images
এরপর দ্রুত হালকা নাস্তা করে তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে নেন। বাড়ি থেকে বেরুনোর আগে স্ত্রী আর পাঁচ বছর বয়েসী কন্যার কপালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন সালাহউদ্দিন চৌধুরী।
আর বাড়িতেই সংসারের খুঁটিনাটি কাজ সেরে নিচ্ছিলেন বারাহীন।
সকাল পৌনে দশটা নাগাদ তার বোন প্রথম ফোন করে টুইন টাওয়ারে হামলার খবর দেন তাকে।
"আমার বোন জিজ্ঞেস করলো দুলাভাই কোথায়? আমি বললাম কাজে গেছে। আমার বোন খুবই উত্তেজিত গলায় বললো, তুমি টিভি খোল, টুইন টাওয়ারে হামলা হয়েছে।
"আমি তখনও মাথার ভেতর প্রসেস করতে পারছিলাম না খবরটা। ও তো কাজ করে ১০৬ তলায়। হামলায় বিল্ডিংয়ের লিফট নিশ্চয়ই বিকল হয়ে গিয়েছে। আমি কেবলই মনে হচ্ছিল ও অত উঁচু থেকে নামবে কিভাবে!"
সেদিনের কথা যখন স্মরণ করছিলেন বারাহীন, তখন পুরো সময়টা ধরেই কাঁদছিলেন তিনি। টুইন টাওয়ার ধসে পড়া, আর স্বামীর খোঁজ শুরু -- এই ঘটনাগুলোর বর্ণনা দেয়ার সময় মনে হচ্ছিল তিনি যেন সেই দিনটিতেই ফিরে গেছেন।
কিছুক্ষণ পরপরই তার কান্নাভেজা গলা কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
বারাহীনের বয়স তখন ২৯ বছর।
"টিভি খুলে চ্যানেলের পর চ্যানেল ঘুরছিলাম সর্বশেষ খবরের জন্য। ওর (মি. চৌধুরী) পেজার ছিল, সেখানে মেসেজ দিলাম - অনেকগুলো। কিন্তু কোন উত্তর আসে না।"
আর কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না তিনি।
"আমার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেছে তখন।"
অল্প সময়ের মধ্যে বারাহীনের রক্তচাপ অনেক বেড়ে গেলে তাকে নেয়া হলো ফ্লাশিং হসপিটাল মেডিকেল সেন্টারে। ১৩ই সেপ্টেম্বর একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন তিনি।
টুইন টাওয়ার হামলায় মারা গেছেন, এমন ১০০ জনের বেশি ব্যক্তির স্ত্রী সে সময় অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। কখনও বাবাকে দেখতে না পাওয়া এই শিশুদের 'নাইন-ইলেভেন বেবিস' বলা হয় দেশটিতে।

ছবির উৎস, Getty Images
বারাহীনের পুত্র সন্তানটি ওই ঘটনার পর জন্ম নেয়া শিশুদের প্রথম কয়েক জনের মধ্যে একজন।
"আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না যে আমার সন্তান তার বাবাকে দেখতে পাবে না কোনদিন। আমার বিশ্বাসও হচ্ছিল না আমার স্বামী মারা গেছে," ছেলের জন্মের কথা স্মরণ করছিলেন বারাহীন।
"হাসপাতালে যখন আমাকে আমার ছেলের মুখ দেখানো হয়, আমি মনে পড়ছিল আমার স্বামী অনেক অপেক্ষা করে ছিলেন এই সন্তানটির জন্য। ও বলেছিল 'আমাদের এবার ছেলেই হবে'।"
হিজাব, মুসলমান পরিচয়, রাস্তায় গালিগালাজ
মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী নিয়মিত নামাজ পড়তেন। তার সাথে সাথে বারাহীনও। তবে তিনি হিজাব পরতেন না।
কিন্তু ৯/১১-এর পর, স্বামী যা যা পছন্দ করতেন, তাই করতে শুরু করেন বারাহীন। স্বামীর মৃত্যুর এক মাসের মধ্যেই তিনি হিজাব পরতে শুরু করেন।
আমেরিকা জুড়ে অবশ্য তখন ভিন্ন রকম পরিস্থিতি।
ওই হামলার পর থেকে মুসলমান হলেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখতো অনেকে, এমনকি অনেক বছরের চেনা প্রতিবেশীরাও, বলছিলেন বারাহীন। "মুখে হয়তো কেউ কিছু বলছে না, কিন্তু টের পাওয়া যেত।"
একদিনের ঘটনা স্মরণ করেন তিনি। "নাইন-ইলেভেনের কয়েক মাস পরের ঘটনা। আমি একদিন আমার বাচ্চাদের নিয়ে বিকেলে হেটে বাড়ি ফিরছিলাম, পথে হঠাৎ কয়েকজন তরুণ আমার হিজাব দেখে উত্তেজিতভাবে গালিগালাজ করতে শুরু করে।"
"ওরা বলছিল মুসলমানরাই টুইন টাওয়ারে হামলা করেছে," যোগ করেন তিনি, "মুসলমানদের জন্যই এত মানুষ মারা গেছে। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।"
এরপর এমন গালিগালাজ বা আক্রমণের শিকার আর কখনো হননি বারাহীন, তবে মনের ভেতরে একটা তীব্র শঙ্কা আর ভীতি ঢুকে গিয়েছিল।
'নিউইয়র্কে নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না আর'
স্ত্রীকে নিয়ে সালাহউদ্দিন চৌধুরী যখন বাল্টিমোর থেকে নিউইয়র্কে একেবারে আসেন, তখন তিনি খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন।
বারাহীনকে বারবার বলেছিলেন, "এই শহর কখনও ঘুমায় না, আধুনিক জীবনের সব সুযোগ আছে এখানে - কাজের সুযোগ, জীবনে অগ্রগতির সুযোগ অনেক বেশি।"
কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর তার প্রিয় নিউইয়র্ক শহরের সব উজ্জ্বলতা মিইয়ে গেল বারাহীনের কাছে, প্রাণহীন হয়ে পড়লো বিশাল শহরের উচ্ছ্বলতা।
"খুব বেড়াতে পছন্দ করত ও। প্রতি সপ্তাহে কোথাও না কোথাও নিয়ে যেত আমাদের। যেসব রাস্তায় ওর সঙ্গে হেঁটেছি, যেসব জায়গায় গেছি---সব খানে ওর স্মৃতি ভরা।
"আমি আর ওর প্রিয় শহরে ওকে ছাড়া নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমার দম আটকে আসছিলো।"
তার ওপর রাস্তায় বুলিয়িংয়ের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি নিউইয়র্ক ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে কেবল স্বামী হারানোর শোক নয়, বারাহীনের মাথার ওপর তখন দু'টি ছোট শিশু পালনের বিশাল ভার।
ওকলাহোমায় নতুন জীবন শুরু
দ্বিতীয়বার সন্তান ধারণের আগে পর্যন্ত একটি ব্যাংকে খন্ডকালীন কাজ করতেন বারাহীন, তবে ছোট বাচ্চা রেখে আর কাজে ফেরত যেতে চাননি তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
"যদিও আমি জীবনে খুব উচ্চাভিলাষী ছিলাম না - অল্পতেই খুশি থাকি - কিন্তু তখন ভাবনায় একটাই বিষয়, কীভাবে কী করবো! আমি সন্তানদের এমনভাবে মানুষ করতে চেয়েছিলাম, যেমন করে ওদের বাবা থাকলে করতো।"
সব মিলিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ওকলাহোমায় চলে যাবেন -এমন জায়গা যেখানে জীবন নিউইয়র্কের মত ব্যস্ত না।
"এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাচ্চাদের কথা ভেবেই। ওখানে জীবন একটু স্লো, কিন্তু মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা আছে।"
টুইন টাওয়ার হামলায় নিহত মানুষদের পরিবারগুলোকে মার্কিন সরকার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং পেনশন দিয়েছে। মি. চৌধুরীর পেনশনের টাকার একটি অংশ দিয়ে শুরুতেই ওকলাহোমায় একটি বাড়ি কিনে ফেলেন বারাহীন।
ওই অর্থের বাকি অংশ মাসে মাসে পাবেন এমন একটি বন্দোবস্ত করে নিয়েছেন তিনি, ফলে আর কখনও চাকরির পেছনে ছুটতে হয়নি তাকে।
তবে ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছেন কীভাবে অল্পে খুশী থাকতে হয়। আর অল্প বয়স থেকে তারা নিজেরাও কাজ করে রোজগার করে।
বিয়ে করে নতুন করে জীবন শুরুর প্রস্তাব আসতো অনেক - বাংলাদেশ থেকে, এখানেও। "কিন্তু কখনও রাজি হইনি," জানান বারাহীন।
"ছেলেমেয়েদের সাথে সাথে থাকি সব সময়, ওদের পড়াশুনা, 'এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাকটিভিটি' - সব কিছু সাথে থেকে করি আমি। ওদের জীবনই আমার জীবন।"








