আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইসরায়েলি আরব: পুলিশের নিস্ক্রিয়তার কারণেই কি দেশটিতে আরবদের হত্যার বিচার হয় না?
- Author, ইয়োল্যান্ডে নেল
- Role, বিবিসি নিউজ, জেরুসালেম
ইসরায়েলের জনসংখ্যার মাত্র প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সংখ্যালঘু আরব জনগোষ্ঠী। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক বছরে দেশটিতে হত্যার বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে এই আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যেই।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ২০২০ সালে ইসরায়েলে অপরাধের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৯৭ জন আরব নাগরিক। সেই অনুপাতে ইহুদি জনগোষ্ঠীর মানুষ মারা গেছে এর অর্ধেকেরও কম।
অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভ গ্রুপ নামে একটি ইহুদি আরব সংগঠনের জরিপে এই পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে এই সংগঠন।
তাদের জরিপে দেখা যাচ্ছে এ বছরেও ইতোমধ্যেই ৬০ জন ইসরায়েলি আরব অপরাধে প্রাণ হারিয়েছে।
নিহতেদের বেশির ভাগই তরুণ। কিন্তু অন্য বয়সের মানুষও নানা ধরনের অপরাধের শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে। এসব অপরাধ অবৈধ বন্দুকের ব্যবহার, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সংগঠিত অপরাধ চক্রের কার্যকলাপের সাথে জড়িত।
"এই পরিসংখ্যান স্তম্ভিত হওয়ার মত...আগে আমরা ভাবতাম এধরনের অপরাধীরা নারী এবং শিশুদের গায়ে হাত দেয় না,'' বলছেন মাদার্স ফর লাইফ নামে একটি সংস্থার অধিকার কর্মী মাইসাম জালজুলি। ''কিন্তু এখন আর ওরা কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।"
মাইসাম থাকেন টিরা নামে একটি শহরে। সেখানে তার বিউটি পার্লারের দরজায় বিশাল একটা তালা ঝুলছে। পার্লারটি চালাতেন তার ৩৮ বছর বয়সী বান্ধবী সুহা মনসুর।
আরও পড়ুন সম্পর্কিত খবর :
তিন সন্তানের মা সুহা এপ্রিল মাসে কাজ করছিলেন পার্লারে। ভেতরে দুজন খদ্দেরও ছিলেন। মাথায় হুড লাগানো এক হামলাকারী খুব কাছ থেকে সুহাকে লক্ষ্য করে পাঁচ বার গুলি চালায়। এখনও পর্যন্ত তার হত্যার জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
"পুলিশ নিরাপত্তা (সিসি) ক্যামেরার ফিল্ম নিয়ে গেছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত পুলিশ জানে না আততায়ী কে ছিল, বা বলা যায় তারা দাবি করছে তারা জানে না," মাইসাম আমাকে বলছিলেন।
"আমার ধারণা বিষয়টা এরকম: 'এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী লাভ? ওরা তো আরব, ওরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে মরুক'।"
বৈষম্যের কলঙ্ক
শুনতে খুব নেতিবাচক হলেও মাইসাম বিষয়টি যেভাবে দেখছেন, বেশির ভাগ ইসরায়েলি আরবের মনোভাবও ঠিক একইরকম।
ইসরায়েলে আরব সম্প্রদায়ের যেসব মানুষ বাস করেন- যারা নিজেদের 'ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক' হিসাবে পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করেন, তত্ত্বগতভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রে তাদের এবং দেশটির ইহুদি নাগরিকদের সমান অধিকার পাবার কথা। কিন্তু তারা নিয়মিতভাবেই বৈষম্যের অভিযোগ করেন।
নিহতদের শোকাহত পরিবারগুলো এবং আরব কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলো সহিংসতায় জর্জরিত হয়ে ওঠার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হল পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা।
"আমি শোকে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমাকেই কেউ খুন করেছে, বা আমার চোখ উপড়ে নিয়েছে। ওরা আমার ছেলেকে খুন করেছে। সে ছিল আমার একমাত্র ছেলে," বলছিলেন ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের এক শহরের বাসিন্দা এক আরব মা।
তার দৃঢ় বিশ্বাস তার শ্বশুর বাড়ির পরিবারের সদস্যরা তার ছেলেকে গুলি করে মেরেছে, কিন্তু পুলিশ বলছে তিনি যাকে সন্দেহ করছেন তাকে অভিযুক্ত করার পক্ষে কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই।
"পুলিশ কিছুই করছে না। আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে এধরনের ঘটনা ঘটলে তারা গায়ে মাখে না," তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন।
হারেৎয সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, এ বছর যত হত্যার ঘটনা ঘটেছে, পুলিশ তার মধ্যে আরবদের হত্যার মাত্র ২৩% ঘটনায় পদক্ষেপ নিয়েছে বা হত্যার কিনারা করেছে। সে তুলনায় ইহুদিদের হত্যার ৭১% ঘটনা পুলিশ সমাধান করেছে।
পুলিশ এই পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেনি, এবং জোর দিয়ে বলেছে তাদের ক্ষমা চাওয়ার মত কিছু ঘটেনি।
"আমি এই বৈষম্যের কলঙ্ক ঘোচাতে চাই," বলছেন কমান্ডার ইয়াগাল এজরা। তিনি আরব অধ্যুষিত এলাকার অপরাধ দমন বিভাগের নতুন প্রধান। "আরব সম্প্রদায়ের জন্য পুলিশ অনেক অর্থ বিনিয়োগ করছে।"
মি. এজরা বলছেন সাম্প্রতিক কয়েক বছরে প্রায় ৭০০ মুসলিম পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে এবং আরব অধ্যুষিত শহরগুলোতে আরও বেশি পুলিশ স্টেশন তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু আরব সম্প্রদায়ের মানুষদের হত্যার ঘটনা এবং ইহুদিদের হত্যার ঘটনায় আসামীকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করার ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়েছে এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য কী- বিষয়টির ওপর আমি জোর দিতে তিনি বললেন, তিনি এবং তার সহকর্মীদের প্রায়ই এমন একটা পরিবেশে কাজ করতে হয়, যেখানে আরবদের মধ্যে রয়েছে পুলিশের প্রতি অবিশ্বাস এবং সে কারণে সহযোগিতার অভাব।
"আরব মহল্লায় একটা হত্যার ঘটনা ঘটলে আপনি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছবেন দেখবেন মানুষ হয়ত রক্ত ধুয়ে মুছে ফেলেছে বা বুলেট লুকিয়ে ফেলেছে বা হত্যাকারীকে লুকিয়ে রেখেছে," বলেন কমান্ডার এজরা।
"কেউ হয়ত ভিডিও তুলেছে ঘটনার। কিন্তু ঘটনার সাথে জড়াতে চায় না বলে সেটা সে হয়ত গোপন রাখে।"
কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার দাবি
গত বছর আরব সম্প্রদায়ের মানুষ পরপর গণ বিক্ষোভ করেছেন। মাদার্স ফর লাইফ সংস্থা হাইফা থেকে জেরুসালেম পর্যন্ত ছয়দিনের মিছিল নিয়ে গেছে। কিন্তু তারপরেও কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা আগের মতই থেকে গেছে।
জালজুলিয়ায় সিহাম আদেস-এর বসবার ঘরটাকে দেখে মনে হবে যেন একটা মাজার। তার ১৪ বছরের কিশোর ছেলে মুহাম্মদ এ-লেভেল ছাত্র ছিল। মার্চ মাসে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মুহাম্মদ বাসার বাইরে এক বন্ধুর সাথে বসে পিৎসা খাচ্ছিল। তখন তাকে গুলি করা হয়। সে গুরুতর আহত হয়েছিল।
"বাসা থেকে তারা বেরনর মাত্র পনের মিনিট পর গুলির আওয়াজ শুনে দৌড়ে বাইরে গিয়ে দেখি রক্তের মধ্যে (ওর বন্ধু) মুস্তাফার দেহ মাটিতে পড়ে রয়েছে। মুহাম্মদকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। আমি চিৎকার শুরু করলাম," সেদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করছিলেন সিহাম আদেস।
বিবিসি বাংলার আরও খবর:
উম্ম আল-ফাহম শহরে গিয়ে শুনলাম সেখানে একজন আরব ডাক্তার তার স্ত্রী ও সদ্যোজাত শিশুকে হাসপাতাল থেকে গাড়ি করে যখন বাসায় নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন কীভাবে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ডাক্তার গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
গ্যালিলি শহরে এক পুরুষ, নারী ও তাদের কিশোরী মেয়েকে বাড়ির আঙিনায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাদের নয় বছরের আরেকটি মেয়ে গুলির ঘটনায় আহত হয়।
আরব এলাকা অপরাধীদের নতুন ঘাঁটি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত প্রায় এক দশক ধরে পুলিশ ইহুদি ইসরায়েলি কুখ্যাত গুণ্ডা আর অপরাধীদের বিরুদ্ধে বড়ধরনের দমন অভিযান চালিয়েছে। আর এরপর থেকেই সংগঠিত অপরাধ চক্রগুলোর কার্যকলাপ আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় বহু গুণ বেড়ে গেছে। তাদের মতে এরা আরব এলাকায় তাদের নতুন ঘাঁটি গেড়েছে।
তারা বলছেন, ভারী অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে গ্যাংগুলো এখন আরব এলাকাগুলোয় সুরক্ষার নামে গুণ্ডামি, চাঁদাবাজি করছে, তারা সেখানে দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে নানাধরনের মহাজনি কারবার এবং অর্থ লেনদেনের একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তুলেছে, মানুষজনকে হুমকি দিচ্ছে এবং লোকদের ব্ল্যাকমেইল করছে।
ইসরায়েলের বর্তমান জোট সরকারে এই প্রথম বারের মত একটি ইসলামপন্থী আরব পার্টিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সরকার পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
নতুন সরকার আরব মহল্লাগুলোয় অপরাধ দমনের জন্য বাজেটে একশ কোটি শেকেলের (৩১ কোটি ডলার) নতুন একটি পরিকল্পনা বরাদ্দ করেছে।
অনেকেই বলছেন ইসরায়েলের আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে দারিদ্রের হার তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। সেটিও পরিকল্পনার আওতায় আনা উচিত।
"ইসরায়েলি সরকার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক দিকটাতেও নজর দিতে হবে। এই সংগঠিত চক্রগুলোর অর্থনীতির মূলে আঘাত করতে হবে, তারা অপরাধী কর্মকাণ্ডের জন্য যে অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ভিত গড়ে তুলেছে সেটাকে ধ্বংস করতে না পারলে, কিছুই বদলাবে না," বলছেন আইডা তৌমা সুলেইমান, যিনি সংসদে বিরোধী দলীয় একজন ইসরায়েলি আরব সদস্য।
'একযোগে কাজ করতে হবে'
রাজনীতিকরা বলছেন সংস্কার পরিকল্পনার কথা, অধিকার কর্মীরা নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছেন আর পুলিশ বলছে তাদের সাথে আরও সহযোগিতা করা দরকার। এর মধ্যে ইসরায়েলের আরব জনগোষ্ঠীর জন্য অপরাধের এই ঢেউ একটা বিরাট সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
গত মে মাসে গাযা ভূখন্ডে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন করে সহিংসতা শুরু হলে বৈষম্যের পরিবেশ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলি আরবদের সমর্থনের কারণে আরব পাড়ায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা মাথা চাড়া দেয়।
ইসরায়েলের যেসব শহরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে, সেসব এলাকায় আরব এবং ইহুদি চরমপন্থীরা সেসময় ব্যাপক সহিংসতা ও ভাঙচুর করে।
মানুষকে ধরে গণহারে পেটানো হয়েছে, মানুষের আবাসিক ভবন এবং ধর্মীয় স্থানগুলোতে ভাঙচুর করা হয়েছে। কেউ কেউ এমনকি গৃহ যু্দ্ধ তৈরি হবার আশংকাও প্রকাশ করেছেন।
নিহত সুহা মনসুরের বান্ধবী মাইসাম জালজুলি বলছেন, ইসরায়েলে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে আন্তঃসাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যের পরিবেশ যেহেতু সবসময়ই একটা হুমকির মুখে থাকে, তাই আরব এলাকায় এই অপরাধ ও হত্যার ঢেউ বন্ধ করতে হলে দুই সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করতে হবে।
"একই দেশের ভেতর আরব সমাজ আর ইহুদি সমাজকে আলাদা করে দেখলে তো চলবে না। এই সমস্যা তো গোটা ইসরায়েলের সমস্যা," তিনি বলছেন।
"পুরো ইসরায়েল সমাজকে সার্বিকভাবে এই সমস্যা সমাধানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি সবসময় বলি - ও এটা ইসরায়েলে বসবাসরত আরবদের সমস্যা বা ফিলিস্তিনি সমাজের সমস্যা তাহলে সেটা ভুল হবে। এই সমস্যা যে ইহুদি সমাজেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে না তা কি বলা যাবে?"