কিশোয়ার চৌধুরী: মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশে প্রচলিত রান্না নিয়ে ভিন্ন চমক আনলেন যে নারী

    • Author, আফরোজা নীলা
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

সম্প্রতি ফেসবুক-টুইটার-ইনস্টাগ্রামসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়ে বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত - এবং একই সঙ্গে প্রচণ্ড জনপ্রিয় - কয়েক পদের রান্নার ভিডিও, আর সঙ্গে পরিচিতি পেয়ে যান এসবের রাঁধুনি।

লাউ চিংড়ি, বেগুন ভর্তা, খিচুড়ি, মাছ ভাজা, আমের টক, খাসির রেজালা - মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় একের পর এক এমন মুখরোচক খাবার রান্না করে বিচারকসহ বিভিন্ন ভাষাভাষীর দর্শকের নজর কাড়েন এই শেফ।

তিনি কিশোয়ার চৌধুরী।

রান্নাবিষয়ক জনপ্রিয় টেলিভিশন রিয়েলিটি শো মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ তিনে এখন জায়গা করে নিয়েছেন কিশোয়ার চৌধুরী। তবে তিনি মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার খেতাব জিতবেন কি-না, সেটাও হয়তো কয়েক দিনের মধ্যে সবাই জেনে যাবেন।

ইতোমধ্যেই অবশ্য অনেকের মন জয় করে নিয়েছেন তিনি - তাদের কাছে কিশোয়ারই সেরা।

অনেকের মতে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশে প্রচলিত নানা ধরনের খাবারকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার কারণেই ৩৮ বছর বয়সী এই শেফকে অন্যসব প্রতিযোগী থেকে আলাদা করেছে।

রান্নাবান্নার প্রতি ঝোঁক এলো যেভাবে

কিশোয়ার চৌধুরী একজন বিজনেস ডেভেলপার, পারিবারিক প্রিন্টিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন তিনি।

তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা অস্ট্রেলিয়ায় হলেও তাঁর পারিবারিক আবহটা সবসময়ই ছিল বাঙালিয়ানা। কথায় কথায় জানালেন, তাঁর বাবার বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরের আর মা কলকাতার বর্ধমানের। তাঁরা দুজনে প্রায় ৫০ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান।

তবে বিদেশে বসবাস করলেও নিজের দেশের ভাষা, সংস্কৃতি চর্চা সবকিছুই বজায় রেখেছেন কিশোয়ারের বাবা-মা, আর সেটা তারা নিজের সন্তানদেরও ধারণ করতে উৎসাহিত করেছেন।

"আমাদের বাসার ভেতরে শুধু রান্না না, বাজারটা কোথা থেকে আসে, কোন ইনগ্রেডিয়েন্ট কোথা থেকে কিনি, সেগুলোও সব সময় দেখানো হয়েছে আমাদের," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

"আমাদের বাগানে হার্বস থেকে শুরু করে শাকসবজি মরিচ-লাউ সব কিছুই আমরা নিজেরা উৎপাদন করি। ছোটবেলা থেকে আমাদের বাবা-মা এসব কাজে আমাদের সম্পৃক্ত করেছেন"।

কিশোয়ারের কখনও মনে হয়নি যে হঠাৎ করে তিনি রান্না শুরু করেছেন।

"যেগুলো সব সময় দেখে আসছি, করে আসছি, সেগুলোই রান্না করেছি। আমার বাবা মাছ ধরতে পছন্দ করেন, ছোটবেলায় তার সাথে মাছ ধরতে যেতাম। ওই যে ফ্রেশ মাছটা নিয়ে রান্না করা, সেটা দেখে বড় হয়েছি। আসলে এই পরিবেশটা সবসময় বাসার মধ্যেই ছিল" - আলাপকালে এভাবেই বলছিলেন কিশোয়ার।

রান্নার হাতেখড়ি

ঠিক কোন বয়স থেকে রান্না শুরু করেছিলেন, সেই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না দিতে পারলেও প্রথম স্মৃতিই তার রান্নাকে ঘিরেই।

আর সেই স্মৃতি হলো, ৩/৪ বছর বয়সের কিশোয়ারকে পাশে নিয়ে তার মা কেক বানাচ্ছেন।

শাকসবজি কুটে দেয়া, পেঁয়াজ ছিলে দেয়া, মাছ কোটা, মুরগী কেটে দেয়ার ট্রেনিং ছোটবেলা থেকেই ছিল তার।

অনেক সময়তার ও তার বোনদের ওপর রান্নার দায়িত্ব দিতেন কিশোয়ারের মা। কখনও পাস্তা, কখনও নুডলস।

মোট কথা বাবা-মায়ের কাছ থেকেই রান্নার হাতেখড়ি কিশোয়ারের।

যত ধরনের রান্নাই হোক না কেন, বাসায় এক বেলা বিশেষ করে রাতের খাবারের মেন্যু হতো সবসময় বাঙালি খাবারের মেন্যু।

মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ায় যাত্রা

চিন্তাটা দুই সন্তানের মা কিশোয়ারের মাথায় আসে ২০২০ সালে সারা দুনিয়ার মতো অস্ট্রেলিয়াতেও করোনাভাইরাস পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর।

"গত বছরেই একটা বিষয় বারবার মনে হচ্ছিল যে আমার বাবা-মা যে রকম করে তাদের সংস্কৃতি, খাবার-দাবার সবকিছু আমাদের মধ্যে ইনস্টল করেছেন, আমি সেটা সন্তানদের মধ্যে করে দিতে পারবো কি-না।

এটা শুধু আমার না, আমার মনে হয় দেশের বাইরে যেসব বাবা-মায়েরা থাকেন, সবার মধ্যেই এই চিন্তাটা থাকে"।

আর এমন চিন্তা থেকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা বই লেখার পরিকল্পনা করেন কিশোয়ার।

"আমার ছেলের বয়স এখন ১২, এ রকম একটা বয়সে নিজের সংস্কৃতি, পূর্ব-পুরুষ এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি সবসময় ভাবতাম ওদের জন্য কী রেখে যাওয়া যায়।"

তবে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ায় আবেদন করার কোন ইচ্ছাই কখনো ছিল না কিশোয়ারের। তার ভাষায়, "এটা আমার ছেলের স্বপ্ন ছিল। সে আমাকে প্রায়ই বলতো মা তুমি এটা পারবা। তুমি অ্যাপ্লাই করো না কেন।

"আমার ছেলেকে আমি জুনিয়র মাস্টারশেফের জন্য চেষ্টা করতে বলছিলাম, কারণ সেও ভালো রান্না পারে। তারপর সে যখন বলছিল আমাকে অ্যাপ্লাই করতে, তখন ভাবলাম তাদের কাছে এক্সামপাল সেট করতে - একটা চেষ্টা করে আমি দেখতেই পারি।"

চার বছর বয়সী শিশুকন্যা সেরাফিনা ও বারো বছর বয়সী পুত্র মিকাইলের কথা ভেবে কিশোয়ারের এই চেষ্টায় যেন আরো গতি আসে। আর পাশে সবসময় ছিলেন তাঁর পরিবার ও জীবনসঙ্গী এহতেশাম নেওয়াজ।

চ্যালেঞ্জ কতটা ছিল?

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশি খাবার উপস্থাপন করাটা কিশোয়ারের জন্য ছিল যেমন চ্যালেঞ্জের, তেমনি ছিল আনন্দেরও।

"আমি সব সময় পরিবার আর সন্তানদের জন্য রান্না করেছি। বন্ধু-বান্ধবরাও পছন্দ করে আমার রান্না। কিন্তু সেই রান্না এ রকম একটা প্রতিযোগিতায় কতটা কাজে দেবে, তা নিয়ে একটা ভাবনা তো ছিলই"।

তবে তাঁর আত্মবিশ্বাস ও রান্নার দক্ষতা তাঁকে শীর্ষ ২৪ থেকে এরই মধ্যে সেরা তিনজনের মধ্যে নিয়ে এসেছে। মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ায় অন্যতম একজন ফাইনালিস্ট তিনি।

কিশোয়ার সব সময় চেয়েছেন ভিন্ন সব বাঙালি খাবারের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার মানুষের পরিচিতি ঘটাতে, আর তিনি মনে করেন তাতে তিনি সফলও হয়েছেন। "বাঙালি রান্না নিয়ে তারা যথেষ্ট আগ্রহী ছিল, কী হবে কেমন হবে এসব প্রশ্ন তাদের ছিল"।

আর আমের টক থেকে শুরু করে খাসির রেজালা যে বিচারকদের মন-প্রাণ জুড়িয়েছে, তার প্রমাণ ইতোমধ্যেই তাদের মন্তব্যে মিলেছে।

তবে কিশোয়ার কি কারি বা বাঙালি খাবার ছাড়া আর অন্য কিছু রান্না পারেন না? - এমন প্রশ্নের উত্তরও কিন্তু দর্শক আর বিচারকেরা পেয়ে গেছেন।

প্রতিযোগিতায় বাঙালি রান্না ছাড়াও অন্য রান্নাও করেছেন তিনি।

"আমি যখন বাঙালি খাবার রান্না করেছি তখন সেটাই রান্না করেছি। আর যখন পাস্তা রান্না করছি, সেটা পাস্তার মতোই রেঁধেছি। ইটালির একটা অথেনটিক পাস্তা রেঁধেছিলাম। আর ওখানে লুকানোরও জায়গা নাই, জক হাফ ইটালিয়ান" বলতে বলতে হাসছিলেন কিশোয়ার।

"আমি যেটাই রান্না করছি সেটাই খুব অথেনটিকলি স্পেসিফিক এরিয়া থেকে রাঁধছি। আমি ফিউশন আইডিয়াটা কোনদিন ইনট্রোডিউস করি নাই, ওইটা আসলে আমার স্টাইল না।"

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে প্রতিযোগীদের।

'অস্ট্রেলিয়ান ন্যাটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট' দিয়ে রান্না করার সময়ও কিশোয়ারের কখনও মনে হয়নি ফিউশন খাবার তৈরি করছেন তিনি। তাঁর ভাষায় "এটা দিয়ে আমি যে টেকনিক ব্যবহার করে খাবার তৈরি করছি তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট আমার ইনগ্রেডিয়েন্ট। ইট বিলংস ইন আওয়ার কিচেন"।

"আমরা কিন্তু সব সময় একটা প্রেশারে থাকতাম। আজকে ডেজার্ট হতে পারে, বা যে কোন জিনিস হতে পারে। আমাদের একটা স্টাইল ডেভেলপ করতে হয়েছিল। আমরা সেটা ডেভেলপ করেছি। তবে আমরা জানতাম না রান্নাঘরে কী রান্না হবে। এক্সাইটিংও ছিল, নার্ভব্রেকিংও ছিল বিষয়টা।"

বাংলাদেশি রান্না উপস্থাপন করলেন কেন?

"অস্ট্রেলিয়া, লন্ডন-সহ বিদেশের নানা জায়গায় প্রচুর বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট আছে, কিন্তু সেখানে বাঙালি খাবার খুব একটা দেখা যায় না। বেশিরভাগই হয় ইন্ডিয়ান। বাংলাদেশি মালিক হলেও সেভাবে বাংলাদেশি খাবার দেখা যায় না," বলছিলেন কিশোয়ার।

তার ইচ্ছা ছিল 'বাঙালি ফুড আইডেনটিটি' তুলে ধরা। আর সেটাই তিনি পূরণ করেছেন মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ায়।

"আমার মা যেহেতু কলকাতার, বর্ধমানের, তাই আমি হাফ ইন্ডিয়ানও। ওয়েস্ট বেঙ্গল, বাংলাদেশ - আমার নিজের দুইটা আইডেনটিটি মিলে এটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে এই এলাকার মানে ইস্ট বেঙ্গলের খাবার যে আলাদা সেটা তুলে ধরা। এটার সুন্দর ফুড আইডেনটিটি আছে এবং ডেফিনিটলি তা সেলিব্রেট করা উচিত"।

প্রতিযোগিতায় মজার কোন স্মৃতি?

মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিভিন্ন আইটেম দিয়ে রান্না করতে হয়েছে প্রতিযোগীদের।

তবে 'ন্যাটিভ অস্ট্রেলিয়ানদের ফুড হেরিটেজে'র সাথে বাংলাদেশের রান্নার টেকনিক সমন্বয় করে কীভাবে একটা 'কুইজিন' বানানো যায়, সেটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ও আনন্দের মুহূর্ত ছিল কিশোয়ারের কাছে।

'হারিয়ালি চিকেন' রান্না করে তাকও লাগিয়ে দেন তিনি।

আলাপকালে জানা গেল রান্নার আগে প্রচুর গবেষণা করেন কিশোয়ার। কোন খাবার কোন এলাকা থেকে আসছে, কীভাবে আসছে অর্থাৎ প্রত্যেকটা 'কুইজিন' এর ইতিহাস নিয়ে পড়তেন কিশোয়ার।

আর সেগুলো নিয়ে নতুন করে 'কুইজিন' তৈরি করেন কিশোয়ার।

কোন রেস্টুরেন্ট খোলার পরিকল্পনা আছে?

না, আপাতত নিজের কোন রেস্টুরেন্ট খোলার পরিকল্পনা নেই তার।

তবে ভবিষ্যতে এমন কিছু করতেও পারেন এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়ানদের মন জয় করা মনে-প্রাণে বাঙালি কিশোয়ার চৌধুরী।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: