ইন্টারনেট: ব্রডব্যান্ডের দাম ঠিক করার পর সেবার মান যেভাবে নিশ্চিত করা হবে বলে জানাচ্ছে সরকার

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, মুন্নী আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার দাম নির্ধারণের পর ইন্টারনেট সেবার গতি বা মান কিভাবে নিশ্চিত করা হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে নেটিজেনদের মাঝে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, দাম পরিশোধ করলেও গুণগত মানসম্পন্ন সেবা তারা পাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেবাদাতারা একই ব্যান্ডউইডথ যুক্তিযুক্ত সংখ্যার চাইতে অধিক গ্রাহকের মধ্যে ভাগাভাগি করার কারণে অনেক সময় সেবার মান সঠিক থাকে না।
মূল্য বেঁধে দেবার পর সরকার এখন বলছে, ভাগাভাগির ব্যান্ডউইডথের ক্ষেত্রে একই আইপি ঠিকানা যাতে ৫ জনের অধিক গ্রাহকের মধ্যে বরাদ্দ না করা হয়, সেটা এখন থেকে নজরে রাখবে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান।
এর আগে রোববার সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার একই দাম নির্ধারণের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন।
সে অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ছাড়াও সারা দেশে একই দামে ইন্টারনেট সংযোগ সরবরাহ করতে হবে।
এই ঘোষণা অনুযায়ী, ৫ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। একইভাবে ১০ এমবিপিএস ৮০০ এবং ২০ এমবিপিএস এর দাম পড়বে ১২০০ টাকা পর্যন্ত।
আরো পড়ুন:
গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া:
ইন্টারনেট সেবার দাম ঘোষণার পর পরই জান্নাতুল নাঈম মনি নামে একজন বিবিসি বাংলার ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, "এই মুহূর্তে আমার এখানে নেট যথেষ্ট স্লো। এটাই বড় সমস্যা। নেট কানেকশন প্রচুর ডিস্টার্ব করে। এই দিকটা খেয়াল রাখা আগে জরুরি।"
আমিনুল ইসলাম নামে একজন লিখেছেন, "কোয়ালিটি ঠিক রাখতে হবে। বর্তমানে ২০ এমবিপিএস স্পিডের কথা বলে ৫ এমবিপিএস দেওয়া হচ্ছে। আগে এসব মনিটর করুন।"
সুমাইয়া রহমান নামে আরেক ফেসবুক ব্যবহারকারী বলেছেন, শুধু দাম নয় বরং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা বহাল রাখতে হলে শহর এবং প্রান্তিক উভয় পর্যায়েই অবকাঠামো বাড়াতে হবে।
তিনি লিখেছেন, "প্রতি জেলায় সংযোগের টাওয়ার এবং নূন্যতম সাধারণ গতির ইন্টারনেট সুবিধা দিতে হবে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যান্ত্রিক গোলযোগ মোকাবেলায় প্রতি পয়েন্টে যন্ত্রাদি ও লোকবল নিশ্চিত করতে হবে।"

ছবির উৎস, Getty Images
করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে লকডাউন চালু হওয়ার কারণে, অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি শিক্ষার বিষয়টিও অনলাইনভিত্তিক হয়ে পড়েছে। যার কারণে ইন্টারনেটের ব্যবহারও বেড়েছে।
বিটিআরসি বলছে, এমন অবস্থায় বড় শহর থেকে শুরু করে একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম একই রাখা হয়েছে।
তাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশের প্রান্তিক এলাকার মানুষের কাছেও যাতে সুলভে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছানো যায়। আর এই উদ্দেশ্য থেকেই 'এক দেশ এক রেট' ট্যারিফ চালু করা হলো।
শেয়ারড ব্যান্ডউইডথে গতি কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়?
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার যে ব্যান্ডউইডথের কথা বলছে, এটা শেয়ারড ব্যান্ডউইডথ। অর্থাৎ একই ব্যান্ডউইডথ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করতে পারবেন।
এ ধরণের শেয়ারড ব্যান্ডউইডথের মাধ্যমে ইন্টারনেটের গতির মান সব সময় নিশ্চিত করা যায় না বলে মত দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শেয়ারড ব্যান্ডউইথের সংযোগে বেশিরভাগ সময়ই গতি অনেক ধীর হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে কলম্বো ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আবু সাঈদ খান বলেন, এই প্যাকেজের ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইডথ যদি ১:৮ অনুপাতে ভাগ করা হয় তার মানে হচ্ছে এক এমবিপিএস ইন্টারনেট আট জন মানুষ ব্যবহার করবে।
তিনি বলেন, এটি একটি শেয়ারড ব্যান্ডউইডথ সংযোগ এবং এর উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এই ঘোষণা অনুযায়ী ইন্টারনেট গতি ১০ এমবিপিএস মানে হচ্ছে, ১০ এমবিপিএস ইন্টারনেট ৮ জনের মধ্যে ভাগ হবে।
মি. খান বলেন, "আমি যদি আগে ব্যান্ডউইডথে ঢুকে যাই এবং ওই প্যাকেজের বেশিরভাগ ব্যান্ডউইথ যদি টানতে থাকি, তাহলে পরে যারা ঢুকবে তারা আর সেই গতি পাবে না। সব মিলিয়ে সবারই ইন্টারনেট স্লো হয়ে যাবে।"
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এই শেয়ারড ব্যান্ডউইডথের ব্যাখ্যাটা জানে না। এটা ব্যাখ্যা করা দরকার ছিল।

মান কিভাবে নিশ্চিত করা হবে?
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেন, বাস্তবিকপক্ষে এটা শেয়ারড ব্যান্ডউইডথ এবং এক্ষেত্রে একটি আইপি অ্যাড্রেস সর্বোচ্চ ৫ জন শেয়ার করতে পারবে। এর বেশি না। যার কারণে মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
"আমরা মনে করি এর ফলে কোয়ালিটি কন্ট্রোল হবে," বলেন মি. জব্বার।
তাঁর মতে, এখন যেমন ইচ্ছামতো আইপি ঠিকানা শেয়ার করা হয়, সেটি হবে না। তার জন্য সর্বোচ্চ শেয়ার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি নিশ্চিত করা হলেই মানও নিশ্চিত করা যাবে।
তবে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি শেয়ার করা হচ্ছে কিনা সেটি কর্তৃপক্ষ নজর রাখবে উল্লেখ করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মি. জব্বার বলেন, "যারা সার্ভিসটা প্রোভাইড করে, ওরা আমাদের লাইসেন্স প্রাপ্ত। আর যারা আমাদের লাইসেন্স প্রাপ্ত তাদেরকে তো আমরাই কন্ট্রোল করবো।"
শেয়ারড ব্যান্ডউইডথের পরিবর্তে ডেডিকেটেড বা একজনের জন্য নিবেদিত ব্যান্ডউইডথ চাইলে সেটার জন্য আরো বেশি খরচ পড়বে বলেও মন্ত্রী জানান।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সার্ভিস প্রোভাইডার নির্দিষ্ট ব্যান্ডউইডথের প্রতিশ্রুতি দিলেও ব্যবহারকারীরা শেষমেশ সেই প্রতিশ্রুত ব্যান্ডউইডথ পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের মহাসচিব ইমদাদুল হক বলেন, যেসব সার্ভিস প্রোভাইডার বিটিআরসির কাছ থেকে কোন ধরণের লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করেন না, সাধারণত তাদের ভোক্তাদের কাছ থেকেই এমন অভিযোগ পাওয়া যায়।
তারা বিটিআরসির কাছ থেকে অনুমোদনপ্রাপ্ত এবং লাইসেন্সধারী হওয়ার কারণে তারা ভোক্তাদের প্রতিশ্রুত ব্যান্ডউইডথই দিয়ে থাকেন বলে দাবি করেছেন মি. হক।
এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে বিটিআরসির লাইসেন্স ছাড়া যারা ব্যবসা করছে তারা বেআইনিভাবে ব্যবসা করছে। যেসব এলাকায় এমন ব্যবসার অভিযোগ পাওয়া যায় সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় তাদের সার্ভিস বন্ধের সব ব্যবস্থা করা হয়।
তবে এসব ব্যবসায়ীর সংখ্যা অনেক হওয়ার কারণে মনিটরিংও ধীরে ধীরে শক্তিশালী করা হচ্ছে। মনিটরিং ব্যবস্থা বাড়লে এ ধরণের অভিযোগ কমতে থাকবে বলে আশা করেন মন্ত্রী।








