রোজিনা ইসলাম: আলোচিত ঘটনায় অডিও-ভিডিও ফাঁস কী প্রভাব ফেলে?

ছবির উৎস, BARCROFT MEDIA/GETTY IMAGES
বাংলাদেশের প্রথম আলো পত্রিকার সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তারের পর সচিবালয়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এডিট করা এই ভিডিওতে সেদিনের ঘটনার কয়েকটি খণ্ড চিত্রের সিসিটিভি ফুটেজ দেখিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং চৌর্যবৃত্তি এক কিনা?
এই ঘটনায় তার একজন সহকর্মীর বাবার সঙ্গে টেলিফোন আলাপও সামাজিক মাধ্যমে অজ্ঞাত সূত্র থেকে ছড়িয়ে পড়েছে।
রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সিসি ক্যামেরার এসব ভিডিও বা অডিও এমন সময় সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে, যখন রোজিনা ইসলাম কারাগারে রয়েছেন এবং থানায় এই সংক্রান্ত একটি মামলা করা হয়েছে।
এর আগেও দেখা গেছে মামলা, গ্রেপ্তার বা অন্য কোন কারণে কোন ব্যক্তি আলোচনা-বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসার পরই কিছু গোপন ভিডিও, ব্যক্তিগত টেলিফোন আলাপ বা সিসিটিভির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে - যেসব তথ্য শুধুমাত্র কর্তৃপক্ষের কাছে থাকার কথা।
সাধারণ কোন মানুষের পক্ষে এসব তথ্য চাইলেও পাওয়া, সংগ্রহ করা সম্ভব নয়।
এসব তথ্য, ভিডিও বা ফোনালাপ সবসময়েই অজ্ঞাত উৎস থেকে প্রচার করা হয়ে থাকে। কোন ব্যক্তি, সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ এর দায়িত্ব স্বীকার করে না।
কিন্তু সেইসব ঘটনা বা মামলা বা বিচারের ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলে এসব অডিও বা ভিডিও ?

ছবির উৎস, Getty Images
'তাদের একটা কৌশল থাকে অন্য পক্ষকে একদম ক্লান্ত করে ফেলা'
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলছেন, ''যদি এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়, সেটা তদন্তের স্বার্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এসব তথ্য যদি বেআইনিভাবে সংগ্রহ করা হয়, তখন তো আর বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেগুলো ব্যবহার করা যাবে না। তাহলে সেটা পুরো বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অবশ্যই এটা বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলবে। ''
''এই ধরনের যে বিষয়গুলো যে প্রচার হচ্ছে, অডিও বা ভিডিও হোক, সেগুলো কীভাবে কারা তৈরি করছেন, যারা পাচ্ছেন, যারা এগুলো ছড়াচ্ছেন, তারা কোন সূত্র থেকে পাচ্ছেন, সেটা প্রথমে তদন্ত করা উচিত। কারণ এগুলো অপরাধ হিসাবে গণ্য করা উচিত'' - তিনি বলছেন।
তিনি জানান, কারো সম্মতি ছাড়া তার অডিও বা ভিডিও প্রচার করা আইন বহির্ভূত। সেক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ব্যক্তি পাল্টা মামলা করতে পারেন অথবা পুলিশ নিজেরাও মামলা করতে পারে। তবে বাংলাদেশে এই ধরনের ক্ষেত্রে কোন ভুক্তভোগী প্রতিকার চেয়েছেন বলে তার জানা নেই।
''এটাও একটা বড় প্রশ্ন, যেখানে আমাদের এতগুলো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, তারা কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?"
"যেখানে ফেসবুকে কারো বক্তব্য ধরে পুলিশ মামলা বা গ্রেপ্তার করে, সেখানে কেন পুলিশ নিজে থেকে এ ধরনের ঘটনায় পদক্ষেপ নেয় না?'' প্রশ্ন তুলছেন ব্যারিস্টার হোসেন।
''এই ধরনের প্রচারণা করে জনসাধারণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নানানভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে, মানহানি করা হচ্ছে। সেটার জন্যও ব্যবস্থা নেয়া যায়। সেই ব্যবস্থাও কাউকে নিতে দেখিনি।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলছেন, ''তবে একটা বাস্তবতা হলো, যাদের এই ধরনের মামলায় ফেলা হয়, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস হেফাজতে রাখা হয়, জামিন দেয়া হয়না, তখন তাদের ফোকাস হয়ে যায় কীভাবে জামিন পাবেন, মুক্তি লাভ করবেন। তখন অন্যান্য আর বিষয়গুলো, জবাবদিহিতার পরিবেশ বা সুযোগ থাকে না।''
''যারা এই ধরনের ঘটনা ঘটান বা মামলা করেন, তাদের একটা কৌশল থাকে অন্য পক্ষকে একদম ক্লান্ত করে ফেলা, যাতে তার নিজস্ব আইনগত অধিকার দাবী করার মতো অবস্থান থাকে না। অনেক কেসে এই অবস্থা আমরা দেখেছি। তাদেরকে, তাদের স্বজনদের নানান হুমকিও দেয়া হয়, যাতে তারা বিচার না চান।'''
আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও এ ধরনের অডিও-ভিডিওর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করার জন্য তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, JIBON AHMED
'ঘোলা জলে মাছ শিকারের চেষ্টা'
তবে শুধু আইনি দিক দিয়েই নয়, এই ধরনের ঘটনার শিকার যারা হন, তারা সামাজিকভাবে নানা হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন।
সমাজবিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা ওয়াহিদ বলছেন, যখন ঘটনাগুলো ঘটে যায়, তখন কাউকে টার্গেট করে, যিনি ভিকটিম, তাকে টার্গেট করে প্রতিপক্ষ সক্রিয় হয়ে যায়।
''সেই গ্রুপটি তখন নানা ধরনের তথ্য-উপাত্ত, মিথ্যাচার, রঙের মিশেল, নানা ধরনের ভিকটিম বা ওই ব্যক্তিকে সম্মানহানি করার জন্য, তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বা তিনি যে আসলে একজন ভিলেন চরিত্র, ভিলেন হিসাবে তার ইমেজ গড়ে তোলার জন্য যেন একটা কৌশল শুরু হয়ে যায়'- তিনি বলছেন।
শুধুমাত্র রোজিনা ইসলামের ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশে অনেক ঘটনার ক্ষেত্রেই এইরকম ঘটতে দেখা গেছে বলে তার পর্যবেক্ষণ। কিছুদিন আগে যে মেয়েটির আত্মহত্যার পর বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সেই মেয়েটির বিরুদ্ধে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন ঘটনার ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা গেছে বলে তিনি জানান।
''আগে শুধুমাত্র প্রতিপক্ষ পত্রিকায় সেটা করা হতো। কিন্তু এখন যেহেতু ফেসবুক- সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের হাতের মুঠোয়, ফলে এটাকে খুব সূক্ষ্মভাবে, খুব তাড়াতাড়ি ব্যবহার করা হয়। এর ফলে তাড়াতাড়ি লাখ লাখ মানুষের কাছে ঘটনার বিকৃত ব্যাখ্যা, ভিকটিমকে অন্য ইমেজে তুলে ধরা সহজ হয়।
ড. জিনাত হুদা বলছেন, এর মাধ্যমে আসলে মূল ঘটনা থেকে মানুষের নজর সরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পুরো কাজটা করা হয় অত্যন্ত কৌশলে, সূক্ষ্মভাবে।
''পরিষ্কার হয়ে যায়, আসলে এখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, ব্যক্তির চরিত্র হননের জন্য, ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য, ব্যক্তির পরিবারকে বিব্রত করার জন্য করা হয়েছে। আসলে এটার ভেতর দিয়ে একধরনের ঘোলা জলে মাছ শিকারের চেষ্টা করা হয়। ফলে হরহামেশা আমরা এই ধরনের ঘটনাগুলো দেখেই যাচ্ছি।'' তিনি বলছেন।








