নিঅম: সৌদি আরব ভবিষ্যতের যে শহর বানাচ্ছে হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে, যার অংশ হবে দ্যা লাইন নামের আরেক শহর

নিওম প্রকল্পের ওয়েবসাইটে শহরের একটি ধারণা তুলে ধরা হয়েছে

ছবির উৎস, neom.com

ছবির ক্যাপশান, নিঅম প্রকল্পের ওয়েবসাইটে শহরের একটি ধারণা তুলে ধরা হয়েছে

থাকবে কৃত্রিম চাঁদ, উড়ন্ত ট্যাক্সির ব্যবস্থা। বাড়িঘর পরিষ্কারের কাজ করবে রোবট। পুরো শহর হবে কার্বনমুক্ত।

সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষই একে বর্ণনা করেছে বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প হিসাবে।

মেগা এই শহরের নাম 'নিঅম' - দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল এলাকা জুড়ে লোহিত সাগরের তীরে গড়ে তোলা হচ্ছে এটি। সৌদি আরব বলছে, ১৬টি অঞ্চল নিয়ে গঠিত হবে নিঅম, আর ৩৩টি নিউইয়র্কের সমান হবে নতুন এই শহরের আকার।

আর নিঅম প্রকল্পের আওতায় শহরের মধ্যে আরেকটি শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে - ১০০ মাইল লম্বা বিলাসবহুল যে শহরে পরিচিতি হবে দ্যা লাইন নামে।

কার্বনমুক্ত দ্যা লাইনে ১০ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করতে পারবেন। শহরটি চলবে শতভাগ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি দিয়ে।

দু'হাজার আঠারো সালের অক্টোবরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে বলেছিলেন, নিঅম শহরের প্রথম পর্যায়ের কাজ প্রায় শেষের দিকে। তবে শহরটির সব কাজ শেষ হবে ২০২৫ সালে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরটি তৈরি করা হচ্ছে বলে সৌদি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন

ছবির উৎস, neom.com

ছবির ক্যাপশান, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরটি তৈরি করা হচ্ছে বলে সৌদি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন

ভবিষ্যতের শহর

রেড সী বা লোহিত সাগরের তীরে নির্মাণ প্রকল্প 'নিঅমের' আওতায় ২৬,৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা করছে সৌদি সরকার।

নিঅম নামটি নেয়া হয়েছে গ্রিক এবং আরবি থেকে। গ্রিক শব্দ নিও, যার অর্থ নতুন। আর আর আরবি শব্দ মুসতাকবাল, যার অর্থ ভবিষ্যৎ - অর্থাৎ এই দুটো শব্দের সমাহারে শহরের নাম রাখা হয়েছে নিঅম।

যেসব প্রতিষ্ঠান শহরটি নির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ করছে, তাদের গোপনীয় কিছু কাগজপত্র দেখার সুযোগ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

তাবুক প্রদেশে, জর্দান, মিশর আর ইসরায়েলের কাছে, ১০,২৩০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে নিঅম শহরটি তৈরির পেছনে বাজেট ধরা হয়েছে কমপক্ষে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৫০ হাজার কোটি ডলার।

জ্বালানী তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সৌদি সমাজ ও অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনার জন্য যে 'ভিশন ২০৩০' নিয়েছেন দেশটির ভবিষ্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ, তারই অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে নিঅম শহর।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

সৌদি আরবের উত্তর পূর্বাঞ্চলে ১০ হাজার ২৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে শহরটি তৈরি করা হচ্ছে।

ছবির উৎস, neom.com

ছবির ক্যাপশান, সৌদি আরবের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে বিশাল এলাকা জুড়ে শহরটি তৈরি করা হচ্ছে

কী থাকছে এই শহরে

নিঅম-এর ওয়েবসাইটে ঠিক এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে শহরটি সম্পর্কে: 'ভবিষ্যৎ এখানে নতুন ঠিকানা পেয়েছে।'

রাতের বেলায় পুরো এলাকা জুড়ে আকাশে থাকবে বিশাল কৃত্রিম চাঁদ। আসল চাঁদের মতোই তার আলোয় আলোকিত হয়ে থাকবে পুরো এলাকা।

নিঅম প্রকল্পে কৃত্রিম মেঘমালা তৈরি করার প্রযুক্তি থাকবে। এসব মেঘের ফলে মরুভূমিতে আরও বেশি করে বৃষ্টি হবে। শিক্ষার ব্যবস্থায় থাকবে হলোগ্রাফিক শিক্ষক, যেমনটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে দেখা যায়।

নিঅমে জুরাসিক পার্কের মতো একটি দ্বীপও থাকবে, যেখানে রোবট ডাইনোসরের দেখা পাওয়া যাবে।

সৌদি কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষজন সেখানে উড়ন্ত ট্যাক্সিতে চলাফেরা করবেন। কর্মকর্তারা বলছেন, ভবিষ্যতে মানুষজন আনন্দের জন্য গাড়ি চালাবেন, তাদের কাজের প্রয়োজনে গাড়ি চালাতে হবে না। বাড়িঘর পরিষ্কারের কাজ করবে রোবট।

সৌদি যুবরাজ চাইছেন, প্রযুক্তির দিক থেকে শহরটি হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির মতো, বিনোদনের দিক থেকে হলিউডের মতো আর অবসর কাটানোর জন্য ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার মতো।

লোহিত সাগরের সৈকতেও অনেক পরিবর্তন আনা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানকার সৈকতগুলোয় বালু রাতে জ্বলজ্বল করবে।

শহরের 'নিঅম বে' নামে এলাকায় এরই মধ্যে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে গেছে। একে বলা হচ্ছে প্রথম দফার প্রকল্প।

সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্য অনুসারে, নিঅম বে-তে সাদা বালুর সৈকত থাকবে, আবহাওয়া হবে মনোরম আর বিনিয়োগের জন্য চমৎকার পরিবেশ থাকবে। এটা হবে অনেকটা আবাসিক এলাকার মতো।

এর মধ্যেই নিঅম বিমানবন্দরের কার্যক্রম শেষ হয়েছে এবং একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসাবে সেটি স্বীকৃতি পেয়েছে।

এই শহরের নিয়মকানুনও সৌদি আরবের অন্যান্য এলাকার তুলনায় আলাদা থাকবে বলে জানা যাচ্ছে। এখানকার আইনি ব্যবস্থা সরাসরি সৌদি বাদশাহ'র কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।

মরুভূমির এই অংশে তৈরি করা হচ্ছে নিঅম প্রকল্প

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মরুভূমির এই অংশে তৈরি করা হচ্ছে নিঅম প্রকল্প

আবাস হারাবে হুয়াইত গোষ্ঠীর সদস্যরা

ব্রিটেনের দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, যে এলাকায় নিঅম প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে, সেখানে সৌদি হুয়াইত গোষ্ঠীর প্রায় ২০ হাজার সদস্য বসবাস করে। শহর গড়ে তোলার জন্য তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে।

কিন্তু তারা কোথায় যাবেন, তাদের নতুন ঠিকানা কি হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।

বাংলাদেশের জন্য কি নতুন সুযোগ তৈরি করবে?

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, নিঅম প্রকল্প নির্মাণে সৌদি আরবে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী, দ্যা লাইন শহর তৈরির কার্যক্রম শুরু হবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে।

নিওম প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জায়গা। এটাই বিন আল-হয়েইতির আবাসভূমি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিঅম প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জায়গা। এটাই বিন আল-হুয়েইতিদের আবাসভূমি।

বাংলাদেশের যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে থাকে, তাদের আশা এই প্রকল্প বাস্তাবায়নের ফলে সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আরও চাহিদা তৈরি হবে।

বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার সাবেক সভাপতি আবুল বাশার বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যেসব শ্রমিক যায়, তাদের বেশিরভাগই নির্মাণ শ্রমিক বা পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসাবে যায়।

কিন্তু যে মেগা প্রজেক্টটি সৌদি সরকার বানাচ্ছে, সেখানে অনেক টেকনিক্যাল কর্মী দরকার বলে তিনি জানান।

''বাংলাদেশ থেকে কিছু নির্মাণ শ্রমিক সেখানে কাজ করছে। কিন্তু টেকনিক্যাল কাজের বেশি সুযোগ পাচ্ছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্সের লোকজন। তবে আমরা আশা করছি, শহরটি নির্মাণ শেষ হওয়ার পর সেখানে আমাদের শ্রমিকদের কাজের কিছু সুযোগ তৈরি হবে।''