বিজেপি: পশ্চিমবঙ্গে দলের শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দেবী দুর্গাকে 'অপমান' করার অভিযোগ তৃণমূলের

দেবী দুর্গার মুখ
ছবির ক্যাপশান, দেবী দুর্গার বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে পশ্চিমবঙ্গে তোপের মুখ বিজেপি নেতা
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা

হিন্দুদের দেবী দুর্গাকে নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বিজেপি নেতার মন্তব্যে পশ্চিমবঙ্গে দলটি সমালোচনার মুখে পড়েছে। রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস দল বলছে এটা রাজ্যের হিন্দুদের ''ধর্মীয় ভাবাবেগে সরাসরি আঘাত''।

তৃণমূলের একজন এমপি বলেছেন ধর্মকে ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসাই বিজেপির একমাত্র লক্ষ্য।

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি ও সংসদ সদস্য দিলীপ ঘোষ একটি আলোচনা সভায় প্রশ্ন তোলেন যে ভগবান রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষদের নাম পাওয়া গেলেও দেবী দুর্গার পূর্বপুরুষদের নাম পাওয়া যায় কি?

রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস বলছে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে ব্যাপকভাবে পূজিত হন যে দেবী দুর্গা, তাকে নিয়ে এমন মন্তব্য করলেন এমন একটি দলের রাজ্য সভাপতি - যে দলটি নিজেদের হিন্দু ধর্মের ধারক-বাহক বলে দাবি করে থাকে।

একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যম আয়োজিত আলোচনাচক্রে শুক্রবার যোগ দিয়েছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। সেখানে আলোচনা হচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে এবং সার্বিকভাবে রাজ্য রাজনীতিতে ধর্মীয় ভাবাবেগকে ব্যবহার করা নিয়ে।

সেই প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে মি. ঘোষ রামচন্দ্র এবং দুর্গার তুলনা টানেন।

পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা যেভাবে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন, ওই রাজ্যে সেভাবে পূজিত নন রামচন্দ্র। সেইদিকে ইঙ্গিত করে আলোচনা সভায় তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন: "ভগবান রাম একজন রাজা ছিলেন। কেউ তাকে অবতার বলেও মানেন। তার পূর্বপুরুষদের ১৪ প্রজন্মের কথাও জানা যায় - কিন্তু দুর্গার ক্ষেত্রে কি সেটা পাওয়া যায়?"

''রামচন্দ্র একজন রাজা ও আদর্শ পুরুষ ছিলেন। গান্ধীজিও রামরাজ্যের কল্পনা দিয়েছেন ভারতবাসীকে। সেখানে দুর্গা আসেন কোথা থেকে?"

বিজেপির রাজ্য সভাপতির বক্তব্যের এই অংশটি শুক্রবার রাতেই ভাইরাল হয়ে গেছে সামাজিক মাধ্যমে।

তৃণমূল কংগ্রেস ওই মন্তব্যের কড়া নিন্দা করেছে।

আরও পড়তে পারেন:

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ (ফাইল ছবি)

শুক্রবারের ওই আলোচনাতে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদারও। সেখানেই তিনি বলেন যে বাঙালি হিন্দুদের পূজিত দেবী দুর্গাকে অপমান করেছেন বিজেপির নেতা।

"একজন ধর্মপ্রাণ দুর্গার উপাসক হিসাবে আমি অত্যন্ত ব্যথিত। অবাক হয়ে শুনলাম যে একটা জাতীয় রাজনৈতিক দলের রাজ্য সভাপতি এভাবে আরাধ্য দেবতাকে অপমান করতে পারলেন! এটা তো ধর্মীয় ভাবাবেগে সরাসরি আঘাত!" বলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার।

তার কথায়, "যে দলটা নিজেদের হিন্দুধর্মের ধারক-বাহক বলে দাবি করে থাকে, তারা কী করে দেবী দুর্গাকে নিয়ে এরকম কথা বলে! আসলে ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসাই বিজেপির একমাত্র লক্ষ্য। তারা নিজেরা যে ধর্মপ্রাণ নয়, তাদের মনের গভীরে যে কথাগুলো ছিল, সেটাই বেরিয়ে এসেছে," মন্তব্য করেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা।

কয়েক মাস পরে রাজ্যে যে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে, তাতে তারা বিপুলভাবে জয়ী হবে বলে দাবি করছে বিজেপি।

কিন্তু ভোটের মুখে এরকম একটা বিতর্কিত মন্তব্য করে কি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালিদের একাংশকে বিরূপ করে দেওয়া হল না?

বিজেপি নেতা অধ্যাপক পঙ্কজ রায় বলছেন, "দুর্গা কোথা থেকে এলেন বলতে উনি ঠিক কী বুঝিয়েছেন সেটা আমি জানি না। তবে এরকম মন্তব্য করাটা উচিত নয় বলেই মনে করি।"

"প্রত্যেক দেব-দেবীর মধ্যেই একটা প্রতীক লুকিয়ে থাকে। সেজন্যই আমরা রামচন্দ্রকে পুরুষোত্তম রাম বলি। অন্যদিকে দুর্গা অশুভ শক্তিকে বিনাশের প্রতীক। প্রতিটার অন্তর্নিহিত অর্থ আলাদা। সেটা বুঝতে হবে," মন্তব্য মি. রায়ের।

পুরাণ বিশারদ নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী বলছেন, যদি বিজেপি নেতা এটা মেনেই নেন যে রামচন্দ্রের বংশপরিচয় জানা যায়, তাহলে তার কথা অনুযায়ীই এটা তাদের মেনে নিতে হবে যে রামচন্দ্র কোনও ভগবান ছিলেন না - তিনি মানুষ ছিলেন আর দুর্গার সেই বংশপরিচয় নেই বলে তিনি ভগবান।

"বংশপরিচয় থাকার জন্যই তো তিনি রামচন্দ্রকে মানুষ বলে মানছেন, ভগবান নন? আর যদি বলেন যে তিনি মনুষ্য রূপে ভগবান, তাহলে দুর্গাও মনুষ্য-রূপে আছেন। তিনিও বাপের বাড়ি আসেন, তারও পিতা পর্বতরাজ হিমালয়, তার সন্তানাদি আছে। দুর্গার বংশপরিচয় নেই কে বলল?" বলছেন পুরাণ বিশেষজ্ঞ নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী।

রামমন্দিরের নকশায় ফুল দিচ্ছেন এক ভক্ত

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস বলছে যে দল নিজেদের হিন্দু ধর্মের ধারক-বাহক বলে দাবি করে থাকে, সেই দলের নেতা ''কী করে দেবী দুর্গাকে নিয়ে এরকম কথা বলেন!"

মি. ভাদুড়ীর কথায় এদের দুজনের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই: ''যদি মানব বা মানবী-কল্পনার কথা ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে দুজনেই ভগবান। এসব বিতর্ক কেন তৈরি করলেন মি. ঘোষ? তিনি রাজনীতি করছেন - সেটাই করুন। তার মধ্যে ভগবান, রামচন্দ্র, দেবী দুর্গা - এঁদের কাউকে না আনাই ভাল," বলেন, মি. ভাদুড়ী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন বিধানসভার ভোটের আগে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মনীষীদের কেন্দ্র করে নানা অনুষ্ঠান পালন করে রাজ্যের মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করেছে - যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা স্বামী বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র বসু অথবা চৈতন্যদেব।

আর এবার রাজনীতির ময়দানে রামচন্দ্র এবং দুর্গাকেও নিয়ে আসা হল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।