করোনা ভাইরাস: অধিকৃত এলাকার ফিলিস্তিনিরা কেন টিকা পাচ্ছেন না

কোভিড-১৯ প্রতিরোধী টিকা দেবার ক্ষেত্রে যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি এগিয়ে গেছে তার অন্যতম হচ্ছে ইসরায়েল।

তাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশের বেশি লোককেই ইতোমধ্যে অন্তত এক ডোজ টিকা দেয়া হয়ে গেছে।

কিন্তু ফিলিস্তিনিদের জন্য পরিস্থিতিটা একেবারেই উল্টো।

অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার বাসিন্দা ফিলিস্তিনিরা তাদের প্রথম ভ্যকসিনের চালানটি পেয়েছেন এই শনিবার, তাও তা পরিমাণে খুবই কম।

পাশাপাশি বাস করা দুটি জনগোষ্ঠী - যারা অনেক সময় পাশাপাশি বসে কাজও করে, তাদের মধ্যে যে কতটা অসাম্য বিরাজ করছে তা ফুটে ওঠে এই একটি দৃষ্টান্ত থেকেই - বলছেন বিবিসির সংবাদদাতা ইয়োল্যান্ডে নেল।

তিনি জানাচ্ছেন, পরিস্থিতি বেশ জটিল।

জটিল পরিস্থিতি

বেশ কিছু মানবাধিকার গোষ্ঠী এর মধ্যেই ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা সকল ফিলিস্তিনিকে করোনাভাইরাসের টিকা দেয়।

অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমের সেরা হাসপাতালগুলোর একটি অগাস্টা ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে গিয়েছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা। এই এলাকাটির ওপর ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

সেখানে দেখা যায়, হাসপাতালটির ফিলিস্তিনি ডাক্তার ড. ফাদি আল-আতরাশ এবং অন্য সব চিকিৎসাকর্মীকে টিকা দিচ্ছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু ডা. ফাদির কাছে আসা ফিলিস্তিনি রোগীরা টিকা পাচ্ছেন না।

এই রোগীরা এসেছেন অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং গাজার বিভিন্ন স্থান থেকে।

ডা. ফাদি বলছিলেন, আমি টিকা পেয়েছি কিন্তু তামি স্বস্তি বোধ করছি না। কারণ আমরা আমাদের রোগীদের কাছে বা পশ্চিম তীর ও গাজায় থাকা আমাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে টিকা পৌঁছাতে পারছি না।

"এখানে একটা অসাম্যের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। যখন আপনি দেখবেন যে আপনি টিকা পাচ্ছেন কিন্তু আপনার জনগণের অন্য একটা অংশ পাচ্ছে না তখন আপনি খুশি হতে পারবেন না" - বলেন ডা. ফাদি।

ফিলিস্তিনি অন্য এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা এখন আরো বিপন্ন অবস্থায় আছে।

বিতর্ক: ফিলিস্তিনিদের টিকা দেবে কে?

ফিলিস্তিনিদের করোনাভাইরাসের টিকা দেবার বিষয়টি এক উত্তপ্ত বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেউ বলছেন এটা ইসরায়েলের দায়িত্ব এবং তারা এ ক্ষেত্রে জেনেভা কনভেনশনের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

অধিকৃত এলাকার ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে যেন করোনাভাইরাসের টিকা সরবরাহ করা হয় - তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘও আহ্বান জানিয়েছে।

কিন্তু এ আহ্বান প্রত্যখ্যান করেছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলি স্বাস্থ্য মন্ত্রী ইউলি এডেলস্টাইন বলেছেন, তার দেশ আইনত এটা করতে দায়বদ্ধ নয়।

বিবিসিকে তিনি বলেছেন, অসলোর শান্তি চুক্তি অনুযায়ী ফিলিস্তিনিদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই নেবার কথা।

তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে অসলো চুক্তির চাইতে আন্তর্জাতিক আইনই বেশি প্রযোজ্য হবে।

অনেকেই টিকা নিতে আগ্রহী নয়

ফিলিস্তিনের রামাল্লায় এসে দেখা গেল, অনেকের মুখেই মাস্ক নেই - কিন্তু এখানে সংক্রমণের হার উচ্চ।

এখানকার অনেকে টিকা নিতেও চান না।

ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী মানাল আওয়াদ বলছেন, এটা সুস্পষ্টভাবেই ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, কারণ তারা জীবনের বহু ক্ষেত্রেই ইসরায়েলের সাথে সংযোগ রক্ষা করে চলছে।

"প্রতিদিন ইসরায়েলে কাজ করতে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা । তাদের জীবনের প্রতি ক্ষেত্রই নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরায়েল। কাজেই এটা অন্যায় যে তারা টিকা পাচ্ছে, কিন্তু আমরা পাচ্ছিনা" - বলছেন আওয়াদ।

তবে মানাল আওয়াদ বলছেন, তিনি ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকদের দলে নেই, কিন্তু তবু তিনি নিশ্চিত নন যে তিনি নিজে টিকা নিতে চান কিনা।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলছে, ফিলিস্তিনিদের টিকা দেয়া ইসরায়েলিদের কর্তব্য।

কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তারা ইসরায়েলের কাছে টিকা চাইছে না। ইয়োল্যান্ডে নেল বলছেন, স্পষ্টতই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নিজেদের দুর্বল হিসেবে দেখাতে চায় না - দেখাতে চায় না যে তারা সংকট মোকাবেলায় সক্ষম নয়।

গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাসের অবস্থানও একই রকম। নিয়মানুযায়ী গাজায় টিকা পাঠানোর কথা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের - কিন্তু হামাস টিকা চাইছে কাতারের কাছেও।

কিছু কিছু ইসরায়েলি নিয়োগদাতা - যাদের প্রতিষ্ঠানে ফিলিস্তিনিরা কাজ করছে তারাও আহ্বান জানাচ্ছেন যে তাদের এই কর্মীদের টিকা দেয়া হয়।

একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, ইসরায়েল বিল্ডার্স সমিতির সভাপতি রাউল স্রুগো। তাকে নির্ভর করতে হয় পশ্চিম তীর থেকে আসা ফিলিস্তিনি কর্মীদের ওপর।

তিনি চাইছেন ইসরায়েলই যেন ফিলিস্তিনিদের টিকা দেয়, কারণ দু-দেশের অর্থনীতির জন্যই এটা গুরুত্বপূর্ণ।

"আমরা ৬৫,০০০ ফিলিস্তিনি নির্মাণ শ্রমিকের ওপর নির্ভর করছি। তাদের ছাড়া আমরা কাজ করতে পারবো না। এটা খুবই সহজ যুক্তি যে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি সবাইকেই টিকা দিতে হবে। কারণ তারা আমাদের সাথে কাজ করছে" বলেন রাউল।

"একদিক থেকে এটা মানবিক ব্যাপার, কারণ তারা আমাদের প্রতিবেশী এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব ভালো ন" - বলেন তিনি।

হেব্রন থেকে আসা ফিলিস্তিনি তরুণ মোহাম্মদ আমরো । চাকরি রক্ষার স্বার্থে তিনি কয়েক মাস ধরে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে ইসরায়েলেই থাকছেন।

"আমি টিকা নিতে চাই, অবশ্যই। ভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য আরব ও ইহুদি - সবাই আমরা অপেক্ষা করছি - যাতে আমি আমার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারি" বলেন মোহাম্মদ।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ টিকার জন্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সাথে চুক্তি করেছে।

ইসরায়েল বলছে তারা তাদের নাগরিকদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তবে আরো ফিলিস্তিনিকে টিকা দেবার কথা তারা উড়িয়ে দিচ্ছেনা।

ডা. ফাদি বলছেন, "আমরা একসাথে আছি, এখানে সীমান্ত বলে প্রায় কিছুই নেই। গাজা ও পশ্চিমতীরের ফিলিস্তিনিদের টিকা না দিয়ে শুধু ইসরায়েলিদের দিলে আমরা সংক্রমণ ঠেকাতে পারবো না, মহামারির বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করতে পারবো না।"

করোনাভাইরাস মহামারি একদিকে যেমন ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের পারস্পরিক নির্ভরতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে - তেমনি নগ্নভাবে বেরিয়ে এসেছে তাদের মধ্যকার গভীর বিভক্তিও।

ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, অর্থ এবং বিজ্ঞানের সুখ্যাতি তাদের দ্রুত করোনাভাইরাসের টিকা পেয়ে যাবার ক্ষেত্রে সহায়ক হরয়েছে।

অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র, রাষ্ট্রবিহীন এবং দুর্বলভাবে সংগঠিত ফিলিস্তিনিরা এই মহামারির কারণে পড়েছে বিরাট সমস্যায়।

আরো পড়তে পারেন: