বর্ষ পরিক্রমা ২০২০ : ফেলে আসা বছরে ভারতের সবচেয়ে বড় পাঁচটি ঘটনা

দিল্লির একটি বাস টার্মিনাসে কোভিড পরীক্ষা। ডিসেম্বর, ২০২০

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির একটি বাস টার্মিনাসে কোভিড পরীক্ষা। ডিসেম্বর, ২০২০
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

বছরের শেষ প্রান্তে এসে ফিরে তাকানো যাক পেছনে ফেলে আসা ২০২০ সালে ভারতের ঘটনা পরম্পরার দিকে।

বাকি দুনিয়ার মতো ভারতেও করোনাভাইরাস মহামারি এবছর বাকি সব কিছু তছনছ করে দিয়েছে।

বস্তুত গোটা দুনিয়ায় এখনও পর্যন্ত ভারতেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক কোভিড রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

এর পাশাপাশি বছরের শুরুতে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা বছরের শেষে কৃষক আন্দোলনেও উত্তাল হয়েছে ভারত।

ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় রক্তাক্ত হয়েছে রাজধানী দিল্লি, ভারতীয় সেনাদের রক্ত ঝরেছে লাদাখের চীন-ভারত সীমান্তেও।

এই প্রতিবেদনে নজর দেওয়া হয়েছে মহামারি-সহ বছরের এমনই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার দিকে।

মুম্বাইতে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে জমায়েত। জানুয়ারি, ২০২০

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মুম্বাইতে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে জমায়েত। জানুয়ারি, ২০২০

নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

করোনাভাইরাসের সঙ্গে তখনও ভারতের পরিচয় হয়নি - এদেশে ২০২০ সাল শুরু হয়েছিল তখন সদ্য পাস-হওয়া নাগরিকত্ব আইন আর প্রস্তাবিত এনআরসি-র বিরুদ্ধে দেশব্যাপী উত্তাল প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে।

এই উদ্যোগকে অনেকেই দেখেছিলেন সমাজের একটা শ্রেণীকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা হিসেবে - যারা শপথ নিচ্ছিলেন কিছুতেই সরকারের কাছে নিজেদের পরিচয়ের নথিপত্র পেশ করবেন না, কাগজ দেখাবেন না!

দিল্লির শাহীনবাগ হয়ে উঠেছিল নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এপিসেন্টার।

আট থেকে আশি বছর বয়সী মুসলিম নারীরাই সে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আইকন হয়ে উঠেছিল দিল্লির শাহীন বাগ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আইকন হয়ে উঠেছিল দিল্লির শাহীন বাগ

তারা বলছিলেন, "আমাদের দেশদ্রোহী বা পাকিস্তানি বলে চিহ্নিত করার হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও ভারতীয়রা কিন্তু সেই চেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।"

জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ছাত্রী তবাসসুম বিবিসিকে বলছিলেন, "কাশ্মীরের অবরোধ, এনআরসি-র ঘোষণা বা মুসলিমদের পিটিয়ে মারার ঘটনা যখন ঘটেছে তখন কিন্তু দেশ পথে নামেনি।"

"আজ অবশেষে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে সারা দেশের সঙ্গে দিল্লি রাজপথে নেমে এসেছে - আমি এখন কীভাবে ঘরে আটকে থাকতে পারি?"

দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা

ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে এই বিক্ষোভকারীরাই যখন উত্তর-পূর্ব দিল্লির জাফরাবাদে পথ অবরোধ করে অবস্থান বিক্ষোভে বসলেন, পরিস্থিতি দ্রুত অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল।

বিজেপির বিতর্কিত নেতা কপিল মিশ্র পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে দাঁড়িয়েই হুমকি দিলেন, ভালোয় ভালোয় রাস্তা খালি না-করা হলে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না এবং পরিণতির জন্যও দায়ী থাকবেন না।

জাফরাবাদে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে পথ অবরোধ তোলার চেষ্টা থেকে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে দিল্লিতে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জাফরাবাদে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে পথ অবরোধ তোলার চেষ্টা থেকে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে দিল্লিতে

পরবর্তী প্রায় চারদিন ধরে রাজধানীর এক বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে যে সাম্প্রদায়িক তান্ডব চলল, তাতে কম করে ৫৩জন নিহত হলেন - যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ছিলেন মুসলিম।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন দিল্লি সফরে, এরই মধ্যে জ্বালিয়ে দেওয়া হল শহরের অসংখ্য মসজিদ। নালা থেকে উদ্ধার হল দাঙ্গায় নিহতদের লাশ।

মুস্তাফাবাদে ভস্মীভূত ফারুকিয়া মসজিদে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা সেদিন বিবিসিকে বলছিলেন, আরএসএসের গুন্ডারা কীভাবে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে আর লুঠতরাজ করেছে।

তাদের অভিযোগ ছিল, "হামলার সময় দিল্লি পুলিশ ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায়। আর এই হামলা থেকে রেহাই পায়নি মাদ্রাসার ছোট ছোট ছাত্ররাও।"

সম্পন্ন একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর বাসার ড্রয়িংরুমে সেদিন আশ্রয় নিয়েছিলেন শত শত মুসলিম নারী-শিশু-পুরুষ, ভয়ার্ত সেই মানুষগুলোকে প্রশাসন দেখতেও আসেনি।

দিল্লির মুস্তাফাবাদে একটি ভস্মীভূত মসজিদের ভেতরটি দেখছেন মুসলিম নারীরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির মুস্তাফাবাদে একটি ভস্মীভূত মসজিদের ভেতরটি দেখছেন মুসলিম নারীরা

মাসকয়েক পরে দিল্লি পুলিশ যখন এই দাঙ্গার চার্জশিট জমা দিল, তারা কিন্তু দায়ী করল নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে যারা বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন, তাদেরই।

তবে লেখক ও চিন্তাবিদ তিলোত্তমা মজুমদার বলছিলেন, তিনি কিন্তু মনে করেন না দাঙ্গা আর প্রতিবাদের রসায়নটা কখনও একই রকম হতে পারে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, "চরিত্রগতভাবেই প্রতিবাদ আর দাঙ্গা দুটো কিন্তু আলাদা জিনিস।"

"একটা দাঙ্গার পেছনে সামাজিক বা রাজনৈতিক নানা রকম উসকানি থাকতে পারে। ব্যক্তিগত কোনও উদ্দেশ্যও থাকতে পারে দাঙ্গা লাগানোর।"

"তবু আমি বলব, দিল্লির দাঙ্গা যে সারা দেশে ছড়ায়নি সেটা প্রমাণ করে যে মানুষের শুভ বোধ এখনও জাগ্রত আছে। বেশির ভাগ ভারতীয় যে দাঙ্গা চান না সেই বিশ্বাসটাই তাতে জোরালো হয়।"

উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে দাঙ্গায় পুড়ে ছাই হওয়া দোকানের সামনে বসে একজন ব্যবসায়ী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে দাঙ্গায় পুড়ে ছাই হওয়া দোকানের সামনে বসে একজন ব্যবসায়ী

"অন্যদিকে যে মানুষের আন্দোলনগুলো - সেটা কখনও কোনও নতুন আইনের বিরুদ্ধে, কখনও সরকারি কোনও প্রকল্প বা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে - গণতন্ত্রে কিন্তু তার গুরুত্বই আলাদা।"

"যে কোনও সার্থক গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল বিরুদ্ধ মতকেও স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার জায়গাটা থাকা, সাহসটা থাকা।"

"এবছর প্রমাণ হয়েছে যে ভারতে এখনও সেই প্রতিবাদের স্পেসটা আছে এবং এ দেশের গণতন্ত্র নিয়ে এখনও ভরসাটুকু হারিয়ে যায়নি", বলছিলেন তিলোত্তমা মজুমদার।

মহামারি, লকডাউন, টিকা

দিল্লি দাঙ্গার রেশ না থিতোতেই দেশ পড়ল ভয়াবহ মহামারির কবলে। পুলিশ জোর করে উঠিয়ে দিল শাহীনবাগের বিক্ষোভ। আর একশো তিরিশ কোটি মানুষের বিশাল দেশ রাতারাতি পড়ল কঠোর লকডাউনের কবলে।

২৪শে মার্চ রাতে মাত্র তিন ঘন্টার নোটিশে সারা দেশে লকডাউন জারির কথা ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

মোবাইল ফোনে, টিভিতে প্রধানমন্ত্রীর সে দিনের ভাষণ শোনেন কোটি কোটি ভারতীয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মোবাইল ফোনে, টিভিতে প্রধানমন্ত্রীর সে দিনের ভাষণ শোনেন কোটি কোটি ভারতীয়

বললেন, "দেশের প্রতিটি পরিবারকে বাঁচানোর জন্যই এই পদক্ষেপ - ঘর থেকে বেরোনোও পুরোপুরি নিষেধ।"

পরবর্তী কয়েকদিনে দেখা গেল হাজার হাজার দরিদ্র অভিবাসী শ্রমিক গ্রামে ফেরার মরিয়া চেষ্টায় পথে নেমে এসেছেন, জাতীয় সড়ক বেয়ে শত শত মাইল হাঁটতেও শুরু করে দিয়েছেন।

কোলের শিশুকে শহরে কিছু খাওয়াতে না-পেরে গ্রামের পথে হাঁটা ছাড়া যে কোনও উপায় নেই, কাজকর্ম হারিয়ে সে কথাই বলছিলেন শ্রমিক বধূরা।

বিহারের ট্রেনের টিকিটের ভাড়া আড়াই হাজার রুপি করে, দুজনের ভাড়া কীভাবে জোগাড় করবেন অসহায়ভাবে সে প্রশ্ন তুলছিলেন চম্পারন থেকে দিল্লিতে কাজ করতে আসা মজদুর রাজেন রাম।

লকডাউনে জাতীয় সড়ক বেয়ে চলতে শুরু করেন হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লকডাউনে জাতীয় সড়ক বেয়ে চলতে শুরু করেন হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক

"এই পরিযায়ী শ্রমিকরাও তো ভারতেরই নাগরিক, বিদেশে প্লেন পাঠিয়ে যদি আটকে পড়া ভারতীয়দের ফিরিয়ে আনা যায় তাহলে এই গরিব মেহনতি মানুষগুলোকে কেন সরকার ঘরে ফেরানোর ব্যবস্থা করবে না?", সে প্রশ্নও তুললেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।

ওদিকে ভাইরাসের বিস্তার ক্রমশ বাড়তে থাকায় হিমশিম খেতে শুরু করল ভারতের স্বাস্থ্য অবকাঠামো।

মুম্বাইয়ের এক হাসপাতালে চিকিৎসকরা বিবিসিকে বলছিলেন, কী অসম্ভব কঠিন এক যুদ্ধ তাদের লড়তে হচ্ছে - রোগী, ডাক্তার, নার্স সবাই এক অচেনা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

কোভিড টেস্ট করানো কিংবা হাসপাতালে বেড পাওয়ার সমস্যা তো ছিলই, গ্রামীণ ভারতেও সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি একটা পর্যায়ে প্রায় হাতের বাইরেই চলে গিয়েছিল।

বহু মানুষ তখন প্রায় বিনা চিকিৎসায় প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। কোভিড-আক্রান্ত মা কীভাবে হাসপাতাল থেকে চিরতরে চোখের আড়ালে চলে গেলেন, বাচ্চা ছেলেকে তার কোনও জবাব দিতে পারেননি অসহায় বাবা।

দিল্লিতে গড়ে তোলা একটি অস্থায়ী কোভিড হাসপাতাল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লিতে গড়ে তোলা একটি অস্থায়ী কোভিড হাসপাতাল

তিলোত্তমা মজুমদার বলছিলেন, ভারতবর্ষ যে পথে এই সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে সেই রাস্তাটা কিন্তু একটা চরম অপ্রস্তুতির পরিচয় দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অবকাঠামোর দিক থেকে আমরা যে এই পরিস্থিতির জন্য বিন্দুমাত্র তৈরি ছিলাম না সেটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে।

পাশাপাশি অসংখ্য পরিযায়ী শ্রমিককে এই লকাডাউনে যে করুণ পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাতেও পরিষ্কার যে খেটে-খাওয়া, দরিদ্র মেহনতি মানুষগুলোর জন্য আমাদের ন্যূনতম পরিকল্পনাও ছিল না।

অথচ সারা দেশে যখন আধার কার্ডের মতো জাতীয় পরিচয়পত্র চালু হল, তখন বলা হয়েছিল এই একটা নম্বর দিয়েই ভারতীয়রা বিভিন্ন আধুনিক দেশের নাগরিকদের মতো সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

সেই বড় বড় প্রতিজ্ঞাগুলো যে কত বড় মিথ্যা ও কত অন্ত:সারশূন্য, লকডাউনের সময় ভারতের মানুষ কিন্তু তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন।

লেখক তিলোত্তমা মজুমদার

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান, লেখক তিলোত্তমা মজুমদার

বছরশেষে কিছুটা আশার আলো অবশ্য দেখিয়েছে অচিরেই করোনা ভ্যাকসিন মেলার খবর - এবং বিশ্বের ভ্যাকসিন উৎপাদনে ভারতও সম্ভবত একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠতে চলেছে।

পুনের সিরাম ইনস্টিটিউটের সিইও আদার পুনাওয়ালার কথায়, "যেহেতু বিশ্বের মোট ভ্যাকসিন উৎপাদন সামর্থ্যের ৭০ শতাংশই ভারতে তাই অবশ্যই এখানে ভারতের বড় ভূমিকা থাকবে।"

"কিন্তু এটা সেরা ভ্যাকসিন হবে কি না আমরা সত্যিই জানি না - কারণ যেখানে একটা নতুন টিকা উদ্ভাবনে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগে, সেই জায়গায় আমাদের এখানে খুবই তাড়াহুড়ো করতে হচ্ছে।"

মহামারির প্রকোপ হয়তো একদিন থিতোবে, কিন্তু ভারতীয়দের রোজকার অর্থনীতিতে তা কত বড় আঘাত দিয়ে গেল সেই হিসেব কিন্তু এখনও কষাই শুরু হয়নি - বলছিলেন লেখিকা তিলোত্তমা মজুমদার।

ভারতে সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান আদার পুনাওয়ালা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতে সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান আদার পুনাওয়ালা

তার কথায়, "লকডাউনে কত লোককে যে কত কোম্পানি ছাঁটাই করেছে, কত লোক যে গত সাত-আটমাস ধরে অর্ধেক বেতনে বা কম বেতনে কাজ করছে তার কোনও পরিসংখ্যান কিন্তু এখনও নেই।"

"এগুলো পেলেই হয়তো একদিন বোঝা যাবে মহামারি আর লকডাউন কী বিরাট আঘাত হেনে গেল!"

লাদাখে ভারত-চীন সংঘর্ষ

মহামারি যখন তুঙ্গে, তখনই জুন মাসের মাঝামাঝি খবর এল লাদাখ সীমান্তে গালওয়ান উপত্যকায় চীনা সৈন্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে ভারতের অন্তত বিশজন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।

গত পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে সেই প্রথম চীন-ভারত সীমান্তে রক্তপাতের ঘটনা ঘটল।

দেশের নানা প্রান্তে নিহত সৈন্যদের শেষ বিদায় জানানো হল সামরিক মর্যাদায়।

লাদাখের এই প্যাংগং লেকেও ভারত ও চীনের সেনারা রয়েছে মুখোমুখি অবস্থানে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লাদাখের এই প্যাংগং লেকেও ভারত ও চীনের সেনারা রয়েছে মুখোমুখি অবস্থানে

লাদাখে বাড়তি সেনা মোতায়েন করে আর একগুচ্ছ চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করে পাল্টা পদক্ষেপ নিল ভারত।

চীনের সঙ্গে পরবর্তী কয়েক দফা শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও স্বীকার করলেন, "সীমান্তে শান্তি যখন একবার বিঘ্নিত হয়েছে তখন দুদেশের সম্পর্ক আগের মতোই থাকবে সেটা আর আশা করা যায় না।"

তিলোত্তমা মজুমদার মনে করছেন, চীন-ভারত সীমান্ত বিতর্কের নিষ্পত্তি না-হওয়াই এই সংঘাতের মূলে।

বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, "যেভাবে কাশ্মীর ইস্যুটাকে বছরের পর বছর ধরে অমীমাংসিত রাখা হয়েছে, আমার ধারণা চীন-ভারত সীমান্ত প্রশ্নটাও সেভাবেই বহু বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

"দুদেশের সীমান্তই এখনও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত নয়, কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা কোনও সরকার বা প্রধানমন্ত্রীকেই দেখিনি এই বিষয়টার একটা নিষ্পত্তি করে ছাড়বেন সেই অঙ্গীকারের জায়গায় পৌঁছতে পেরেছেন।"

গালওয়ান উপত্যকায় নিহত ভারতীয় সেনা সতনাম সিংকে শেষ বিদায়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গালওয়ান উপত্যকায় নিহত ভারতীয় সেনা সতনাম সিংকে শেষ বিদায়

"ফলে এই পরিণতি বোধহয় অনিবার্যই ছিল। তবে অনেক সময় আবার এটাও মনে হয় রাজনীতি বোধহয় এই ধরনের পরিস্থিতিগুলোকে ব্যবহারও করে।"

"যেমন মহামারিতে যখন অর্থনীতির বিপর্যস্ত দশা, ঠিক তখনই কিন্তু আমরা দেখলাম লাদাখে চীনের সঙ্গে সাঙ্ঘাতিক গন্ডগোল শুরু হয়ে গেল।"

"ব্যাস, সারা দেশে সঙ্গে সঙ্গে দেশাত্মবোধের ঝড় বইতে লাগল। হুকুম এল, অমুক অমুক চাইনিজ অ্যাপ ব্যবহার করা যাবে না - কেন না চীন এখন আমাদের শত্রু হয়ে গেছে।"

"তাহলে এগুলোকে সরকার এতদিন অ্যালাও করেছিল কীভাবে, আমার প্রশ্ন সেটাই!"

গত ২৬ নভেম্বর থেকে দিল্লির সীমান্তে অবস্থান করছেন হাজার হাজার কৃষক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গত ২৬ নভেম্বর থেকে দিল্লির সীমান্তে অবস্থান করছেন হাজার হাজার কৃষক

বছর শেষে কৃষক আন্দোলন

এদিকে চীন সীমান্তে উত্তেজনা আর অশান্তির ঘনঘটার মধ্যেই নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজধানী দিল্লি অবরুদ্ধ করে ফেললেন পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে আসা হাজার হাজার কৃষক।

তাদের দাবি, সম্প্রতি পাস হওয়া তিনটি কৃষি আইন - যা ভারতে কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত, চুক্তিবদ্ধ চাষের পথ প্রশস্ত করবে বলে বলা হচ্ছে সেগুলো বাতিল করতে হবে এবং মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের গ্যারান্টি দিতে হবে।

দাবি আদায়ে চাপ দিতে তারা যে বেশ কয়েক মাসের রসদ নিয়েই দিল্লি এসেছেন সে কথাও জানিয়ে দেন পাঞ্জাবের এই কৃষকরা।

পাঞ্জাবের কৃষকরা বলছেন দীর্ঘ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েই তারা দিল্লিতে এসেছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পাঞ্জাবের কৃষকরা বলছেন দীর্ঘ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েই তারা দিল্লিতে এসেছেন

এর মধ্যে সরকারের সঙ্গে কৃষক নেতাদের বেশ কয়েক দফা বৈঠক হলেও কোনও সমাধান বেরোয়নি।

বড়দিনের মুখেও তারা দিল্লির সিঙ্ঘু ও টিকরি, এই দুটি সীমান্ত অবরোধ করে রেখেছেন।

ফলে দিল্লিতে বছর শুরু হয়েছিল শাহীনবাগ দিয়ে, আর শেষ হচ্ছে সিঙ্ঘুতে - যার মাঝখানে পুরো সময়টা জুড়িয়ে জাঁকিয়ে রইল করোনাভাইরাস মহামারি।