চাল উৎপাদন: রেকর্ড উদ্বৃত্তের আশা অথচ বাজারে দাম বাড়ছে, হচ্ছে আমদানিও

বাজারে চালের দাম বাড়ছে, সরকার বলছে সংকট নেই
ছবির ক্যাপশান, বাজারে চালের দাম বাড়ছে, সরকার বলছে সংকট নেই
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট পাঁচ মাসে আগে আভাস দিয়েছিলো যে এ বছরের শেষে প্রায় সাড়ে ৫৫ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে, অথচ বাজারে সব ধরণের চালের দামই বেড়ে যাছে।

চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলগুলো দাম বাড়িয়ে দেয়ার প্রভাব পড়েছে বাজারে। আর মিল মালিকরা বলছেন, ধানের সরবরাহ কম। তবে এ সংকট সাময়িক কারণ কয়েকদিন পরেই নতুন চাল বাজারে আসবে ।

খাদ্য সচিব ডঃ মোছাম্মৎ নাজমানারা খাতুন বলছেন যে দাম বাড়ার মূল কারণ হলো কৃষকেরা ধান কম বিক্রি করছেন।

"এ মুহূর্তে স্কুল কলেজ বন্ধ। নানা ধরনের সরকারি সাহায্য যাচ্ছে। করোনার জন্য খরচও কমে এসেছে। তাই হয়তো অনেকের ধান বিক্রির তাড়া নেই। সে কারণেই ধান মিলে কম যাচ্ছে। যারা বিক্রি করছেন তারাও একটু লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন। কৃষক টাকাও পাচ্ছে। এখন যে দাম বাড়ছে চালের সেটি কোনোভাবে সংকট জনিত কারণে নয়," বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান।

তাহলে সরকারকে কেন চাল আমদানি করতে হচ্ছে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "নানা কারণে বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য অনেক সময় র‍্যাশনিং বা বিতরণ করতে হয় সরকারকে। সে জন্য মজুদ রাখার দরকার হয়। কৃষকের কাছ থেকে নিলে বাজারে সংকট হতো। তাই সরাসরি আমদানি করা হচ্ছে।"

খাদ্য সচিব জানান, প্রথম চালানের ৫০ হাজার টন ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে। এছাড়া জানুয়ারির মধ্যে আরও অন্তত দেড় লাখ টন চাল বাংলাদেশে আসবে।

"তবে এ আমদানির সাথে বাজারে চালের দামের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ ধান বা চালের কোনা সংকট নেই। যদিও প্রত্যাশার চেয়ে উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে এ বছর। তারপরেও সেটি খুব একটা বেশি নয় বলেই কোনো সংকট তৈরি হয়নি"।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

শুরু হয়েছে চাল আমদানি তবে সরকার বলছে জরুরি প্রয়োজনে বিতরনের জন্য মজুদ বাড়ানো হচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শুরু হয়েছে চাল আমদানি তবে সরকার বলছে জরুরি প্রয়োজনে বিতরনের জন্য মজুদ বাড়ানো হচ্ছে

কিন্তু বাজার পরিস্থিতি আসলে কেমন?

ঢাকার একজন চাল ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন রাজা বলছেন, সব ধরণের চালের দামই বাড়িয়ে দিয়েছে মিলগুলো ।

তিনি জানান, মোটা চাল বস্তা প্রতি একশ টাকা, মিনিকেট বা চিকন চাল দুশো টাকা, নাজিরশাইল ৫/৬শ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

"মিলগুলো বলছে ধানের সরবরাহ কম। প্রতিদিনই কিছু কিছু করে বাড়ছে। এখন সরকারের আমদানি করা চাল আসলে হয়তো বাজার স্থিতিশীল হবে," বলছিলেন তিনি।

যদিও খাদ্য সচিব জানিয়েছেন বাজারের পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন তারা।

"বাজারে কোনো সংকট নেই। ধানও আছে কৃষকের কাছে। মাঝে মধ্যে বাজারে সরবরাহ তারা কমালে একটু প্রভাব পড়ে।"

রাইস মার্চেন্ট এসোসিয়েশনও জানিয়েছে, সামনে বাজারে নতুন চাল আসবে। আর এই নতুন চাল আসার আগে দাম কিছুটা বাড়ে যেটা স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন তারা।

ওদিকে সরকারি হিসেবে ৫ লাখ ৫১ হাজার ২৯০ টন চাল মজুদ আছে, যদিও গত বছর একই সময়ে মজুদ ছিলো প্রায় সাড়ে দশ লাখ টন চাল।

ধান চাষের ওপর জরিপ করে ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট বলছে আগামী জুনে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে

ছবির উৎস, MAJORITY WORLD

ছবির ক্যাপশান, ধান চাষের ওপর জরিপ করে ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট বলছে আগামী জুনে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে

৫৫ লাখ টন উদ্বৃত্তের আভাস ছিল

গত অগাস্টে চালের মজুদ নিয়ে নিজেদের এক সেমিনারে ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট পূর্বাভাস দিয়েছিলো যে চাহিদা মেটানোর পরেও সাড়ে ৫৫ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে।

তখন বলা হয়েছিলো, নভেম্বরের মধ্যে আউশ ও আমনের উৎপাদন যুক্ত হলে খাদ্য ঘাটতির কোনো সম্ভাবনাই থাকবেনা।

আর এখন আবার ইন্সটিউটি বলছে, আগামী জুন নাগাদ উদ্বৃত্ত থাকবে ৩০ লাখ টন।

প্রতিষ্ঠান কৃষি অর্থনীতি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, করোনা বা বন্যা পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন কিছুটা কম হলেও সেটি সংকট তৈরি করার মতো নয়।

"সংকট নেই, উদ্বৃত্তও আছে। কৃষকের হাতে ধান ও মিলারদের হাতে চাল আছে। এখন সেটি বাজারে কতটা আসছে সেটি আমরা বলতে পারবো না। নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো এসব বিষয়ে কাজ করছে," বলছিলেন তিনি।

মি. ইসলাম বলেন, এবারও সারা দেশ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেয়া হয়েছে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে, নেয়া হয়েছে স্যাটেলাইট চিত্রও।

"কোথায় কোন ধান কতটুকু হচ্ছে তার একটি সার্বিক হিসেব আমরা নিয়েছি, পাশাপাশি দেশের মানুষের জন্য কতটুকু ধান দরকার হয় সে হিসেবও আছে। এসব হিসেব নিকেশ করেই আমরা একটা ধারণা দিয়েছি যে কতটা চাল উদ্বৃত্ত থাকবে," বলছিলেন তিনি।

তাহলে সরকারকে আমদানিই না করতে হচ্ছে কেন - এমন প্রশ্নের জবাবে সাইফুল ইসলাম বলেন তারা সবসময়ই সরকারকে দশ থেকে বার লাখ মেট্রিক টন মজুত রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

"মজুত যথাযথ থাকলে বাজার নিয়ে কোনো দুরভিসন্ধির কোনো সুযোগ থাকে না। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে সরকার জনগণের মধ্যে চাল বিতরণ করতে পারে। আবার কৃত্রিম সংকট মোকাবেলাতেও এটি ভূমিকা রাখে। তাই সরকার আমদানি করছে মানে এই নয় যে আমরা যে আভাস দিয়েছিলাম সেটি সত্যি হয়নি বা হবে না।"