কোহলি বনাম স্মিথ: প্রজন্ম সেরা দুই ব্যাটসম্যানের পাঁচটি আলোচনার বিষয়

    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা

অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মধ্যকার একটি সিরিজ চলমান। যেখানে দুই দলের ব্যাটসম্যানদের লড়াই বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে, এবং অবধারিতভাবেই আলোচনায়, কে সেরা-স্টিভ স্মিথ নাকি ভিরাট কোহলি?

২০১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকেই ভিরাট কোহলির বড় মঞ্চে চাপ নেয়ার ক্ষমতা এবং অধিনায়কত্ব নিয়ে উঠেছে ক্রিকেট মহলে নানা প্রশ্ন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে চলতি সিরিজের ওয়ানডে ফরম্যাটেও কোহলি ঠিক ব্যাটে বলে এক করতে পারছিলেন না দলকে, প্রথম ম্যাচে খানিকটা মেজাজ হারিয়েই শট খেলতে গিয়ে আউট হন ভারতের এই অধিনায়ক।

তবে এই আপাত খারাপ সময়েও ভিরাট কোহলির ব্যাট থেকে এসেছে একটি ৬৩ ও একটি ৮৯ রানের ইনিংস।

অন্যদিকে একই সিরিজে স্টিভ স্মিথ ৩ ম্যাচে তুলেছেন ২১৬ রান যার মধ্যে দুটো সেঞ্চুরি। আর ৬২ বলে করা এই দুটো সেঞ্চুরিই সিরিজের হাইলাইটস ছিল মূলত।

টেস্ট ক্রিকেটে স্টিভ স্মিথ এগিয়ে

টেস্ট ক্রিকেটে সংখ্যা বলছে স্টিভ স্মিথ কোহলির চেয়ে এগিয়ে আছেন।

কোহলির চেয়ে ১৩টি টেস্ট কম খেলে ২৫ রান বেশি করেছেন এই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান।

টেস্টে কোহলির গড় প্রায় ৫৪।

স্মিথের প্রায় ৬৩। যা কমপক্ষে ১০০টি ইনিংস খেলেছেন এমন ক্রিকেটারদের মধ্যে বিশ্বে সর্বোচ্চ।

ঘরের মাটিতে ও ঘরের বাইরে টেস্ট পরিসংখ্যানও স্টিভ স্মিথের পক্ষে, দেশের বাইরে স্মিথের টেস্ট ব্যাটিং গড় ৬০, কোহলির ৪৬।

তবে কোহলি স্টিভ স্মিথের চেয়ে একটি সেঞ্চুরি বেশি করেছেন।

স্টিভ স্মিথ অবশ্য সাতটি অর্ধশতক বেশি করেছেন কোহলির চেয়ে।

একটি বিষয়ে স্টিভ স্মিথের এগিয়ে থাকার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের বর্তমান টেস্ট ব্যাটসম্যান র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে আছেন স্টিভ স্মিথ দুই নম্বরে আছেন কোহলি।

তবে আইসিসির যে সর্বকালের টেস্ট ব্যাটসম্যান র‍্যাঙ্কিং সেখানে ডন ব্র্যাডম্যানের পরেই আছে স্টিভ স্মিথের নাম। এই তালিকার সেরা দশে যারা আছেন তাদের মধ্যে বর্তমানে খেলা খেলোয়াড় একমাত্র স্টিভ স্মিথ।

ওয়ানডেতে কোহলি এগিয়ে

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন ডিসেম্বর মাসের ২ তারিখ টুইট করেছেন, "কোনো প্রশ্ন ছাড়াই, আমার দেখা সেরা ওয়ানডে ব্যাটসম্যান কোহলি।"

ভিরাট কোহলির পরিসংখ্যানও এই বক্তব্যের পক্ষে কথা বলবে।

২৫১ ম্যাচে কোহলি ১২ হাজার ৪০ রান তুলেছেন, এই সময়ে ৪৩টি সেঞ্চুরি করেছেন কোহলি।

স্টিভ স্মিথ ১২৮টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে রান তুলেছেন পাঁচ হাজারের কাছাকাছি, ১১টি সেঞ্চুরি এবং ২৫টি ফিফটি এসেছে তার ব্যাট ধরে।

তবে মূলত প্রশ্নটি উঠেছে এমন এক সময়ে যখন কোহলির ব্যাটে ১২ ম্যাচ সেঞ্চুরি নেই, আর কোহলির বিপক্ষে মাঠে নেমে স্মিথ টানা দুটি দুর্দান্ত সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন।

তবে টি টোয়েন্টি ফরম্যাটে বেশ পিছিয়ে আছেন স্টিভ স্মিথ। মাত্র ৭২৪ রান তুলেছেন তিনি এই ফর‍ম্যাটে।

নিয়মিত টি টোয়েন্টি দলে খেলেনও না তিনি।

ভারতের তিন ফরম্যাটের অধিনায়ক ভিরাট কোহলি ৫০ এর বেশি গড়ে ২৮০৩ রান করেছেন টি টোয়েন্টিতে।

ব্যাটিংয়ের ধরনে আকাশ-পাতাল ফারাক

ভিরাট কোহলিকে 'কপিবুক' ব্যাটসম্যান বলছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার ও সাংবাদিক মাজহার উদ্দিন অমি।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, খেলাটির সৌন্দর্য্যের জন্যই দুজনের বিশেষ অবদান আছে। একদিকে কোহলি যিনি কপিবুক ব্যাটসম্যান অন্যদিকে স্টিভ স্মিথ যিনি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে ব্যাট করেন।

মি. অমি বলেন, "আপনি যদি তরুণ কাউকে খেলা শেখাতে চান সেক্ষেত্রে ভিরাট কোহলি আদর্শ, স্মিথের মতো ব্যাট আপনি চাইলেই করতে পারবেন না।"

তবে কেউ যদি ছোটবেলা থেকেই আন-অর্থোডক্স ব্যাট করে থাকেন তাহলে তাকে বাধা দেয়াও উচিৎ নয় বলে মনে করেন এই ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার।

চাপ নিয়ে ব্যাটিং

দ্বিপাক্ষিক সিরিজে কোহলি যতটা ভালো বড় মঞ্চে ততটা উজ্জ্বল নন তিনি এমন সমালোচনা হরহামেশাই শোনা যায়।

বিশেষত ২০১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে তিনি ৪৪২ রান করলেও আশানুরুপ ছিল না দলের প্রয়োজনে। কোনো সেঞ্চুরিও পাননি তিনি।

এখন পর্যন্ত মোট ২২টি বিশ্বকাপ ম্যাচে কোহলির রান ১০২৯। যদিও সংখ্যার দিক থেকে কোহলি ভালো অবস্থানে আছেন কিন্তু বড় ম্যাচে তাঁর ব্যাটে রান নেই।

২০১৫ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৩ বলে ১ রান করে সমালোচিত হয়েছিলেন।

২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে কোহলি ছিলেন অধিনায়ক, পাকিস্তানের করা ৩৩৮ তাড়া করতে গিয়ে ব্যাট করতে নেমে ৯ বলে ৫ রান তুলে মোহাম্মদ আমিরের বলে আউট হয়ে যান কোহলি।

২০১১ বিশ্বকাপের ফাইনালে শ্রীলঙ্কার সাথে করেন ৩৫ রান, সেমিফাইনালে পাকিস্তানের সাথে করেন ৯ রান এবং কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে করেন ২৪ রান।

২০১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে ব্যাটিং নিয়ে ভুগেছেন স্টিভ স্মিথও। তবে মোট হিসাবে কোহলির সমান ৪৬ গড় নিয়ে ১৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন স্টিভ স্মিথ।

২০১৫ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষেই সেমিফাইনালে স্টিভ স্মিথ রান তোলেন ৯৩ বলে ১০৫। এই ম্যাচে ম্যাচ সেরার পুরষ্কারও পান তিনি।

তবে চাপ মাথায় নিয়ে স্টিভ স্মিথ সবচেয়ে মনে রাখার মতো ব্যাট করেছেন ২০১৯ সালের অ্যাশেজে।

বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে শাস্তি পেয়ে ফেরার পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৭ ইনিংসে স্মিথ করেন ৭৭৪ রান।

১৪৪, ১৪২, ৯২, ২১১, ৮২, ৮০ এবং ২৩। এই সাতটি ইনিংস খেলে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে নাম লেখান স্মিথ।

১১০ গড়ে ব্যাট করেন তিনি।

ক্রিকেটের জন্য সুখবর

"একটা সময় ছিল লারা-টেন্ডুলকার, ফুটবলে মেসি-রোনালদো, এখন কোহলি-স্মিথ। এটা ক্রিকেটের জন্য এই ধরনের একটা ব্যাপার অসাধারণ।"

গত ৮-১০ বছরে এই দুজনের প্রতিযোগিতা ছিল দেখার মতো, বলছেন মাজহার উদ্দিন অমি।

ভিরাট কোহলি ভারতের হয়ে অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ জয়ের পরেই তাকে নিয়ে ছিল মাতামাতি, সেই মাতামাতি যে যুক্তিযুক্ত সেই প্রমাণও তিনি মাঠে দিয়েছেন।

ওদিকে স্টিভ স্মিথ একজন লেগস্পিনিং অলরাউন্ডার থেকে ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে অবশ্য নিজেরা নিজেদের প্রতি স্পোর্টসম্যানশিপ বজায় রেখে চলেছেন কোহলি ও স্মিথ।

২০১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ম্যাচে স্মিথের দিকে ধেয়ে আসছিল ভারতীয় ভক্তদের দুয়োধ্বনি। কোহলি ব্যাট হাতে এগিয়ে গিয়ে ভক্তদের শান্ত হয়ে স্মিথের দিকে দুয়োধ্বনি না দেয়ার অনুরোধ করেন।

চলতি সিরিজে সামনে টেস্ট ম্যাচে দুজনের মধ্যে হয়তো এই তুলনাটা আবারো আসবে।

তবে ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে একই প্রজন্মে কোহলি, স্মিথদের দেখার পাশাপাশি কেন উইলিয়ামসন, জো রুট, বাবর আজমদের ব্যাটিং দেখাটাও কম বিনোদনের নয়।

আরো পড়ুন: