মাদক: পুলিশের বিরুদ্ধে মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ যেভাবে সামাল দেয়া হচ্ছে

বাংলাদেশে মাদক গ্রহণের অভিযোগে সোমবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা কুষ্টিয়ায় আটজন পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করার খবর প্রকাশ করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত বিবিসিকে বলেছেন, দেড় বছর আগে জেলার ১২জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য গ্রহণের অভিযোগ ওঠে।

এরপর তাদের ডোপ টেস্ট করানো হয়, এবং তাতে অভিযোগ প্রমাণের পর সোমবার আটজন পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করার তথ্য জানানো হয়।

পুলিশ সুপার মি. আরাফাত বলছিলেন, এই আটজন ছাড়াও আরো দুইজনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

কত পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে?

সাধারণত পুলিশের বিরুদ্ধে তিনভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িত হবার অভিযোগ শোনা যায়---এর মধ্যে মাদক গ্রহণ, মাদকদ্রব্য কেনাবেচা করা এবং মাদক বিক্রিতে সহযোগিতা করা।

বাংলাদেশে গত দেড় বছরে ঢাকা, সিলেট, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, বগুড়া, ঝালকাঠি, বরিশাল এবং মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

আরো পড়তে পারেন:

তবে, ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমন পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ঠিক কত সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি।

নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ডোপ টেস্টে ঢাকা মহানগর পুলিশের ৭৩ জন মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্য শনাক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে ৪৩টি বিভাগীয় মামলা চলছে। এছাড়া সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি হয়েছে ১৮ জনের বিরুদ্ধে।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের মধ্যে মাদক গ্রহণ সমস্যা এমন আকার ধারণ করেছে যে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের মহাপরিদর্শক মাদকের সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন কয়েকবার।

পুলিশের মুখপাত্র সোহেল রানা বিবিসিকে বলেছেন, মাদকের সঙ্গে কোন পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা প্রমাণ হলে তাকে ছাড় দেয়া হবে না, "এ ব্যাপারে 'জিরো-টলারেন্স' নীতি নেয়া হয়েছে।"

তিনি বলেন, "পুলিশের সব পর্যায়ে এমন বার্তা পাঠানো হয়েছে যে বাহিনীর কোন সদস্য মাদক গ্রহণ করবে না, মাদকের ব্যবসার সাথে কোনভাবে সম্পৃক্ত হবে না এবং যারা মাদকের ব্যবসা করেন তাদের সাথে কোনভাবে সংশ্লেষ রাখবেন না বা সহযোগিতা করবেন না।"

এ ব্যাপারে পুলিশের সব ইউনিটে নানা ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

কী ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে?

পুলিশের মুখপাত্র মি. রানা বলেছেন, মাদকের এই সমস্যা সমাধানে ইতিমধ্যেই পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্ট করানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, "যাদের সন্দেহ হচ্ছে এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে তাদের ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে, এবং অভিযোগ প্রমাণিত হবার পর ইতিমধ্যেই অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ নানা ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।"

পুলিশ বাহিনীর মধ্যে যেসব সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়, বা যাদের সন্দেহ হয়, তাদের ডোপ টেস্ট করানোর ব্যবস্থা করা হয় দুই পর্যায়ে।

প্রথম পর্যায়ে পুলিশ হাসপাতালে টেস্ট করানো হয়। যেসব জেলায় পুলিশ হাসপাতাল নেই সেখানকার পুলিশ সদস্যদের নিকটবর্তী জেলা যেখানে পুলিশ হাসপাতাল আছে সেখানে রক্ত ও প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করানো হয়।

এরপর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে দ্বিতীয় দফায় ডোপ-টেস্ট করানো হয়।

এই দুই পরীক্ষায় পজিটিভ হলেই একজন পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয় বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মি. আরাফাত।

ডোপ টেস্টের বাইরে ২০১৯ সাল থেকে পুলিশের উপ-পরিদর্শক এবং কনস্টেবলের মত পদগুলোতে ডোপ-টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

তবে চাকরিরত অবস্থায় এবং উপরের পদগুলোতে কাজ করেন এমন পুলিশ সদস্যদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ডোপ-টেস্টের ব্যবস্থা নেই।

এছাড়া যাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও মাদক কারবারিদের সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

বাংলাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে হেফাজতে মৃত্যুসহ নানা ধরণের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ নতুন নয়।

পুলিশ বলছে বাহিনীর মধ্যে অপরাধ তৎপরতা শূণ্যে নামিয়ে এনে ইমেজ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, সে চেষ্টার দৃশ্যমান ফল দেখা না গেলে বিশ্বাসযোগ্য হবে না পুলিশের এই দাবি।