ইতিহাসের সাক্ষী: ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে মদ নিষিদ্ধ করার আন্দোলন করেছিলেন যে নারী

ছবির উৎস, Getty Images
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যে এ্যালকোহল নিষিদ্ধ করার জন্য সফল এক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন পূণ্যবতী শংকরা। কারণ এই মদ্যপানে আসক্তি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার জন্ম দিচ্ছিল, কীভাবে নারীদের চাপের মুখে এ্যালকোহল নিষিদ্ধ করেছিলেন সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী - ইতিহাসের সাক্ষীর এ পর্বে তা শুনিয়েছেন বব হাওয়ার্ড।
"গ্রামাঞ্চলে মদ্যপানের প্রসারের কারণে মেয়েদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। কিছু গ্রামে এমন হয়েছে যে কিছু পুরুষ মাতাল হয়ে তাদের নিজেদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেই সহিংস যৌন আচরণ করতে শুরু করেছিল।"
বলছিলেন অল ইন্ডিয়া উইমেন্স ডেমোক্র্যাটিক এসোসিয়েশনের সম্পদক পূণ্যবতী শংকরা।
তার ৪০ বছর ধরে নারী আন্দোলনে জড়িত তিনি, এবং অন্ধ্রপ্রদেশে দেশী মদ বা বা আরাক-বিরোধী আন্দোলন তার জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায়।
ভারতের নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে অন্ধ্রপ্রদেশে মদ নিষিদ্ধ করাকে এক বড় সাফল্য বলে মনে করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা তখনকার ৬ কোটি জনসংখ্যার রাজ্যটিতে বড় রকমের সামাজিক পরিবর্তনও নিয়ে এসেছিল।
ভারতে এই আরাক হচ্ছে অত্যন্ত কড়া মদগুলোর অন্যতম।
"আরাক একধরণের দেশী মদ। এটাও এ্যালকোহল কিন্তু ওয়াইন বা হুইস্কির মত নয়। এটা তৈরি হয় ভাত থেকে, এবং খুবই নিম্নমানের একটি পানীয়।"
এর মানে হচ্ছে আরাকের দাম তুলনামূলকভাবে সস্তা। তা সত্ত্বেও যারা এটা পান করতে অভ্যস্ত - তাদের অনেকে এত বেশি মদ্যপান করত যে তাদের পারিবারিক আয়ের একটা বড় অংশই এই মদের পেছনে চলে যেত।
অনেক সময়ই পারিবারিক আয়ের ঘাটতি মেটাতে বাড়ির মেয়েদের কাজ করতে হতো। কিন্তু খরা এবং কৃষির প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে অনেক সময়ই মেয়েদের উপার্জন করা কঠিন হয়ে পড়ত।
"বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নারীরা কোন কাজ বা চাকরির সুযোগ পায় না। একটা কারণ খরা, তা ছাড়া কৃষিতে এখন যেরকম নানা যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে - সেটাও একটা কারণ। কাজেই বাধ্য হয়ে তাদেরকে শুধু পুরুষদের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হতো। ফলে পুরুষরা যখন আরাক পানে আসক্ত হয়ে পড়ছিল এবং তাদের সব টাকা মদের পেছনে খরচ করে ফেলছিল - তখন নারীদের জন্য ছেলেমেয়ে ও পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেয়াটা বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।"

ছবির উৎস, Getty Images
"পুরুষরাও দেখা যেতো সব টাকা মদের পেছনে উড়িয়ে দিয়ে তারা ঘরে এসে দাবি করত তাদেরকে মাছ, মুরগি বা খাসির মাংস দিয়ে ভালো করে খাওয়াতে হবে। সেই জন্য নারীদের মধ্যে একটা অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল।"
পুরুষদের অতিরিক্ত মদ্যপান প্রায়ই ঘরের মধ্যে পারিবারিক সহিংসতা, মারধর-নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়াত। অনেক সময় এতে মৃত্যুও ঘটে যেত।
"একজন নারী আত্মহত্যা করে। আরেকজন লোক মাতাল অবস্থায় কুয়াতে ঝাঁপ দেয় এবং মারা যায়। "
অন্ধ্রপ্রদেশে মদ্যপানের কারণে বহু পরিবারে এমন বিপর্যয় নেমে আসায় পূণ্যবতীর সংস্থাটি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে তারা ঠিক করেন যে কিছু একটা করতে হবে।
"আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে এ বিষয়ে আমাদের কাজ করতে হবে এবং মেয়েদের মধ্যে প্রচারণা চালাতে হবে। আমাদের কর্মীরা গ্রামীণ এলাকাগুলোতে গিয়ে মহিলাদের উদ্বুদ্ধ করা, তাদের সঙ্গে কথা বলা, আলোচনা করা - ইত্যাদি কাজে নামলেন"।
পূণ্যবতী যখন এসব কাজ করছেন, প্রায় সেই সময়ই ভারত সরকার বয়স্ক মানুষদের মধ্যে - বিশেষত গ্রামীণ নারীদের মধ্যে - সাক্ষরতা বাড়ানোর এক কর্মসূচি শুরু করেছিল। তাদের যেসব বই পড়তে দেয়া হতো তার মধ্যে একটি গল্প বেশ আগ্রহ সৃষ্টি করল।

ছবির উৎস, NOAH SEELAM
"এর মধ্যে একটি গল্প ছিল সীতাম্মা কথা। এর মানে হচ্ছে সীতার গল্প। এক গ্রামের নারী সীতা । তবে সে শিক্ষিত। গ্রামে মদ্যপানজনিত সমস্যাগুলো দেখে সীতা সেই গ্রামের অন্য নারীদের সংগঠিত করে মদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে এবং গ্রামের মদের দোকানটি নিষিদ্ধ করে দেয়।"
সমস্যা হলো, এ্যালকোহল বিক্রি থেকে রাজ্য সরকার প্রচুর রাজস্ব আয় করে। এর মধ্যে একটা বড় অংকের অর্থ আসে নিলাম প্রক্রিয়া থেকে। রাজ্য সরকার মদ সরবরাহকারীদের লাইসেন্স বিক্রি করে নিলামের মাধ্যমে। এটা ঠেকানোর জন্য গ্রামের মহিলারা একটা পরিকল্পনা করলেন।
"যখন সরকার এই নিলামের দিন ঘোষণা করল, সেখানে ব্যারিকেড এবং পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু গ্রামের মহিলারা সেই ব্যারিকেড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। চেষ্টা করলো নিলাম বন্ধ করে দিতে। এটাই ছিল ওই ইস্যুতে নারীদের প্রথম বিজয়।"
এই বিক্ষোভ যখন অব্যাহতভাবে চলতে লাগল তখন নারীরা একটা বড় সাফল্য পেলেন। ১৯৯৩ সালে আরাক নামের কড়া দেশী মদ নিষিদ্ধ করলো সরকার। পরের বছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে আগে - মহিলারা আরো একটি সাফল্য পাবার প্রয়াস চালালেন। তারা ওই রাজ্যে মদ্যপান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার দাবি জানালেন।
পূণ্যবতী বলছেন, তাদের এ প্রয়াসে সমর্থন যোগালেন তেলুগুদেশম পার্টির নেতা এনটি রামারাও - সাবেক অভিনেতা এবং আর আগের দুই মেয়াদ ধরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তখন তিনি চাইছেন তৃতীয় মেয়াদের জন্য পুননির্বাচিত হতে। এনটি রামারাও বুঝেছিলেন, ভোটে জিততে হলে এই নারীদের সমর্থন পেতে হবে তাকে।

ছবির উৎস, SAM PANTHAKY
"আমি বলবোনা যে তিনি মদ্যপানকে ঘৃণা করতেন। কিন্তু তাকে নির্বাচনে জিততে হলে এই আন্দোলনকে সমর্থন দিতে হবে, সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারী ও যুবসমাজের মন জয় করতে হবে। তখন সময়টা এমন ছিল যে কেউ যদি অন্ধ্রপ্রদেশের রাজনীতিতে টিকতে চায় তাহলে তাকে মদ নিষিদ্ধ করার অঙ্গীকার করতেই হবে।"
তেলুগুদেশম পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট সে নির্বাচনে কংগ্রেসকে সহজেই পরাজিত করে। এর পর ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে এনটি রামারাও তৃতীয়বারের মত মুখমন্ত্রী হন।
হায়দরাবাদে তার অভিষেক অনুষ্ঠানে এনটি রামারাও এক বাক্যে ঘোষণা করলেন, তিনি যে প্রথম সরকারি আদেশটি স্বাক্ষর করবেন সেটি হবে মদ নিষিদ্ধ করা।
পরের বছর জানুয়ারি মাস থেকে অন্ধ্রপ্রদেশে এ্যালকোহল কেনাবেচা নিষিদ্ধ হলো। তবে দুটি ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ছিল।
"একটা হচ্ছে মেডিক্যাল কারণে। যারা উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভোগেন - তাদের জন্য ডাক্তার পরিমিত মদ্যপান অনুমোদন করেন। তাদের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের মদ কিনতে হলে একটি ডাক্তারি সার্টিফিকেট দেখাতে হতো। দু'নম্বর ছিল ধর্মীয় কারণ। কোন কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে - যেমন খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসবে - মদ্য পানের প্রথা আছে।
এ নিষেধাজ্ঞার পর প্রকাশ্যে মদ কেনাবেচা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু গোপনে চোরাই বাজারে কিছু মদ বিক্রি চলতে থাকল।লোকে যেন সরকারি নির্দেশ মেনে চলে সে জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পূণ্যবতী গ্রামে ফিরে গেলেন।
"গ্রামাঞ্চলে কিছু লোক অবৈধভাবে মদ তৈরি এবং বিক্রি শুরু করেছিল। আমরা শুল্ক বিভাগের লোকজন নিয়ে এসব জায়গায় গিয়েছি। এই বেআইনি ব্যবসায়ীদের সাথে আমরা বৈঠকও করেছি। আমরা সরকারকে বলেছি, এই লোকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে। সরকার তাদের ভালো চাকরি দিতে পারলে তারা এসব তৎপরতা বন্ধ করে দেবে বলেই আমরা মনে করতাম।"
পূণ্যবতী বলছেন, এ্যালকোহল নিষিদ্ধ করায় অনেক উপকার পাওয়া গেছে। স্কুল থেকে শিশুদের ঝরে পড়া কমে গেছে। লোকে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পে যে বিনিয়োগ করতো তাও বেড়েছে।
"স্বাভাবিকভাবেই, মানুষ এতে খুশি হয়েছিল। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা।কারণ পুরুষরা যখন আরাক পান করা বন্ধ করলো, তখন তারা পরিবার ও ছেলেমেয়েদের পেছনে বেশি অর্থ খরচ করতে পারছিল। একারণে শিশুরাও খুশি হয়েছিল। লোকের হাতে টাকাপয়সা থাকলে তারা ভালো কাপড়চোপড় কেনে, বাচ্চার জন্য একটা ভালো স্কুল ব্যাগ কিনে দিতে পারে, বাড়িঘর বানাতে পারে। আর এসব ব্যয়ের কারণে সরকারও বেশি ট্যাক্স পেতে পারে।"
তবে অন্ধ্রপ্রদেশের সরকারের আয় হয়তো কিছুটা বেড়েছিল - কিন্তু মনে করা হয় যে সেসময় এ্যালকোহল নিষিদ্ধ হওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয় ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ১৯৯৭ সালে এনটি রামারাওকে সরিয়ে চন্দ্রবাবু নাইডু যখন মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তখন তিনি - বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিতে চাইছিলেন। পূণ্যবতী বলছেন, ঋণের একটা শর্ত ছিল যে প্রদেশ সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। পূণ্যবতীর কথায়, এটি সহ আরো কিছু কারণে চন্দ্রবাবু নাইডু ১৯৯৭ সালে মাত্র দু বছর পর এ্যালকোহলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দিলেন।

ছবির উৎস, AFP
"বিশ্বব্যাংক ছিল একটা কারণ। আরেকটা কারণ ছিল প্রভাবশালী মহল বিশেষ করে হোটেল ইন্ডাস্ট্রির চাপ। এ্যালকোহল ছাড়া তারা দেশ ও বিদেশ থেকে অতিথি আকর্ষণ করতে পারছিল না। তা ছাড়া এই লিকার লবি খুবই শক্তিশালী। তারাও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। তা ছাড়া নারীদের আন্দোলনের গতিও কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছিল । তারা তো আর প্রতিদিন রাস্তায় নামতে পারে না।"
তবে এ্যালকোহলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী নারীরা সহজে হাল ছাড়েন নি।
"রাজ্য বিধানসভার সামনে হাজার হাজার নারী সমবেত হয়ে বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু চন্দ্রবাবু নাইডু তাতে কর্ণপাত করেননি। রাজ্যের নারীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ধীরে ধীরে তিনি এ্যালকোহলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দিলেন।"
অন্ধ্রপ্রদেশে এখন এ্যালকোহল নিষিদ্ধ করার প্রশ্নটি আবার ইস্যু হয়ে উঠেছে। কারণ সরকার এখন ছোট ছোট মদ বিক্রির দোকানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। পূণ্যবতী বলছেন এ্যালকোহলে বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন চলছে।
"আমরা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা চাইছি না। কিন্তু আমরা চাই না যে সরকার মদের ব্যবসাকে একটা রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে দেখুক।"








