'লাভ জিহাদ': কোন প্রমাণ নেই, তবুও ভারতের ৪টি রাজ্যে কঠোর আইন আনার ঘোষণা

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
ভারতের চারটি বিজেপি শাসিত রাজ্য ঘোষণা করেছে যে তথাকথিত লাভ জিহাদ রুখতে তারা কঠোর আইন আনবে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা এবং কর্নাটকে এই আইন আনা হবে বলে সেখানকার সরকার জানিয়েছে।
হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করছে যে এক শ্রেণির মুসলমান যুবক হিন্দু নারীদের কাছে প্রেমের অভিনয় করে এবং ধর্ম পরিবর্তন করিয়ে বিয়ে করে।
তাদের কথায়, লাভ বা প্রেমের মাধ্যমে ''জিহাদ'' করা হচ্ছে এভাবে।
যদিও এর আগে একাধিক এরকম অভিযোগের তদন্ত করেও তথাকথিত লাভ জিহাদের অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি বলেই ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এখন সেই কথিত লাভ জিহাদ বন্ধ করতে আইন তৈরীর উদ্যোগ শুরু হয়েছে ভারতের চারটি রাজ্যে।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের যে রায়ের পর থেকে বিজেপি শাসিত একাধিক রাজ্য কথিত লাভ জিহাদ বন্ধ করতে আইন আনার কথা বলছে, সেই মামলাটি ছিল এক মুসলিম নারীর হিন্দু এক যুবককে বিয়ে করা নিয়ে। আদালত বলেছিল শুধুমাত্র বিয়ে করার জন্য ধর্ম পরিবর্তন গ্রাহ্য করা হবে না।
ওই মামলার রায় বেরনোর পরেই কথিত লাভ জিহাদ বন্ধ করার আইন করার ঘোষণা করা হচ্ছে।
হিন্দুত্ববাদীরা ফোনে হুঁশিয়ারি বার্তাও ছড়াচ্ছে ।

ছবির উৎস, Getty Images
কয়েকদিন আগে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এক জনসভায় ঘোষণা করেন, "সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে লাভ জিহাদ কড়া হাতে বন্ধ করা হবে। এমন এক কঠোর আইন আনা হবে যাতে কেউ ছদ্মবেশে বা পরিচয় গোপন করে নারীদের ইজ্জত নিয়ে খেলা করার কথা না ভাবে। তাদের আগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছি, তারা যদি শুধরে না যায় তাহলে 'রাম নাম সত হ্যায়'এর যাত্রা শুরু হবে।"
''রাম নাম সত হ্যায়'' উত্তরভারতে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময়ে বলা হয়ে থাকে।
ভারতের একাধিক ইংরেজি সংবাদমাধ্যম গত কয়েক দিনে এই বিষয়ে সম্পাদকীয় লিখেছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে এর অর্থ কি ধর্ম পরিবর্তন করে কেউ বিয়ে করলে সেই যুবকের মৃত্যু অবধারিত?
এটাও বলা হয়েছে, যে লাভ জিহাদের অস্তিত্বই নেই, তা রুখতে কেন আইন আনা হচ্ছে? এটা কি কোনও একটি ধর্মের যুবকদের হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে?
অল ইন্ডিয়া মুসলি মহিলা ল বোর্ডের চেয়ারপার্সন শায়িস্তা আম্বার অবশ্য মনে করেন যে এরকম অনেক ঘটনাই তার কাছে আসে, যেখানে প্রতারণা করে ধর্ম পরিবর্তন করিয়ে বিয়ে করছে একশ্রেণীর যুবক। কিন্তু তাকে কোনও ধরণের জিহাদ বলতে আপত্তি আছে মিসেস আম্বারের।
আরও পড়তে পারেন:

মিসেস আম্বারের কথায়, "কেউ যদি অন্য ধর্মের কোনও নারীকে বিয়ে করার জন্য প্রতারণা করে ধর্ম পরিবর্তন করায়, সেটা অন্যায়। এরকম যে একেবারেই হয় না, তা নয়। আমার কাছেও এরকম অনেক ঘটনা এসেছে। কিন্তু এটাকে জিহাদ বলা যায় না। জিহাদ শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।"
"আবার যদি দুই ভিন্ন ধর্মের নারী পুরুষ একে অপরকে পছন্দ করে বিয়ে করতে চায়, তাতে আপত্তির কী আছে? এরকম অনেক উদাহরণ আমার চেনাশোনার মধ্যেই আছে, যেখানে হিন্দু - মুসলিম নারী পুরুষ একে অপরকে পছন্দ করে বিয়ে করেছে। ভারতের সংবিধানই তো এই অধিকার দিয়েছে," বলছিলেন মিসেস আম্বার।
"কিন্তু এই বিষয় নিয়ে এখন যেটা হচ্ছে, তা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি।''
উত্তরপ্রদেশের পরে আরও তিনটি রাজ্য একই ঘোষণা দিয়েছে যে তারাও কথিত লাভ জিহাদ বন্ধ করতে আইন আনার কথা গুরুত্ব দিয়েই ভাবছে।
মধ্যপ্রদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নরোত্তম মিশ্র যেমন বলেছেন যে মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের নির্দেশে তারা এই নিয়ে আইন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আবার হরিয়ানা এবং কর্ণাটকও একই ঘোষণা করেছে।
নারী আন্দোলনের কর্মী, অধ্যাপিকা শাশ্বতী ঘোষ অবশ্য বলছিলেন হিন্দুরা নয়, লাভ জিহাদের প্রসঙ্গ প্রথম তোলেন কেরালার খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা।
"৮-১০ বছর আগে কেরালার খ্রিস্টান গোষ্ঠীগুলি প্রথম বিষয়টা সামনে আনে যে তাদের ধর্মের মেয়েদের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের যুবকরা প্রতারণা করে বিয়ে করছে। হিন্দু গোষ্ঠীগুলি কিন্তু পরে এই ব্যাপারটা নিয়ে প্রচারে এসেছে।
"একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল এই আইন আনার কথা বলছে বলে যেমন আমার আপত্তি আছে, তার থেকেই বেশি আপত্তি বিয়ের জন্য ধর্ম পরিবর্তন করার ব্যাপারটা নিয়েই। দুই ধর্মের নারী-পুরুষ যখন স্বেচ্ছায় বিয়ে করে, তখন ধর্ম কেন বদলাতে হবে?" বলছিলেন মিসেস ঘোষ।

ছবির উৎস, Getty Images
"আর তার থেকেও বড় কথা ধর্ম পাল্টাতে হয় কিন্তু মেয়েটিকেই। যেখানে বিয়ের পূর্বশর্ত হয় ধর্ম পরিবর্তন, সেই সম্পর্কের মধ্যে প্রেম ভালবাসার থেকেও দখলদারির মনোভাব বেশি ফুটে ওঠে," মন্তব্য শাশ্বতী ঘোষের।
ভারতে বিশেষ বিবাহ আইন অনুযায়ী এক ধর্মের নারী-পুরুষ অন্য ধর্মাবলম্বীকে বিয়ে করতেই পারেন।
তাই যে আইন আনার কথা বলা হচ্ছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি থেকে, সেই আইনকে কেউ সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করলে আইন নাকচ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।








