ধর্ষণ ও নির্যাতন: পুলিশের ‘নজিরবিহীন’ সাড়ে সাত হাজার সমাবেশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ

ছবির উৎস, DMP NEWS

ছবির ক্যাপশান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের পুলিশ ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সারাদেশে 'নজিরবিহীন' সমাবেশ করার পর মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, পুলিশ ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোই ঘটতো না।

সিলেটের এমসি কলেজে এক নারীকে ধর্ষণ ও নোয়াখালীতে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনাসহ সাম্প্রতিক কিছু নারী নির্যাতনের ঘটনায় প্রতিদিনই ক্ষোভ প্রকাশ করে নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এমন প্রেক্ষাপটে পুলিশ শনিবার সারা বাংলাদেশে প্রায় সাত হাজার সমাবেশ আয়োজন করে, যাতে লাখ লাখ সাধারণ মানুষও যোগদান করে বলে দাবি করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাটি।

ইতোমধ্যেই সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করে আইন সংশোধন করেছে।

আবার নারী নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলোতে প্রায়শই ঠিক মতো অভিযোগ না নেয়া, অনেক সময় অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অভিযোগ গ্রহণে ঢিলেমি বা সমঝোতার চেষ্টা করানো, কিংবা ঠিকমতো তদন্ত করে অপরাধ প্রমাণে ব্যর্থতার জন্য পুলিশকে দায়ী করে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

যদিও আলোচিত এসব ঘটনায় সমালোচনার সঙ্গে প্রতিবাদ বিক্ষোভ যখন তুঙ্গে তখন পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিলো দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা ও শান্তি নিশ্চিত-কল্পে ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাত‌নের প্র‌তি‌টি ঘটনায় স‌র্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে কাজ কর‌ছে বাংলা‌দেশ পু‌লিশ।

প্রসঙ্গত পুলিশের হিসেবেই ২০১৯ সালে ৫,৪০০ নারী এবং ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি এবং নারী ধর্ষণের মামলা ছিল ৩,৯০০টি।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ

ছবির উৎস, DMP NEWS

ছবির ক্যাপশান, সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ

দেশটিতে নারী নির্যাতনের এমন পরিস্থিতি আর সবশেষে কিছু আলোচিত ঘটনা আর পুলিশের বিরুদ্ধে এমন নানা অভিযোগের মধ্যেই শনিবার দেশজুড়ে ধর্ষণ ও নিপীড়ন বিরোধী প্রায় ৬,৯১২টি সমাবেশ হয়েছে পুলিশের উদ্যোগে, মানবাধিকার সংগঠনগুলো যাকে ‌'নজিরবিহীন‌' বলে বর্ণনা করেছে।

এসব সমাবেশগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের হাতে দেখা গেছে নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা নিপীড়ন বিরোধী নানা ধরণের ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার শাহ মোহাম্মদ আবিদ হোসাইন বলছেন, এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিলো সমাজে প্রতিটি ক্ষেত্রের মানুষকে নারী নির্যাতন বা নিপীড়ন নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করানো।

যদিও মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র উপপরিচালক নীনা গোস্বামী বলছেন, ফেনীর আলোচিত নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর জানা গিয়েছিলো যে পুলিশের কাছে অভিযোগ নিয়ে আগে গেলেও তারা অভিযোগ ঠিক মতো লিপিবদ্ধ না করে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে।

"পুলিশের বরং এগুলো আগে দেখা উচিত। বাংলাদেশে একজন নারী নিপীড়নের শিকার হলে তিনি কি থানাগুলোতে নির্ভয়ে গিয়ে অভিযোগ করতে পারেন? আবার অভিযোগ হলেও তা যে ঠিকমতো তদন্ত হবে তার কোনো নিশ্চয়তা আছে? বেগমগঞ্জের ঘটনা তাহলে এতো পড়ে জনসমক্ষে এলো কেনো? এগুলো ঠিক করলেই তো সমাজে সচেতনতা বেড়ে যেতো," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, সমাবেশের অধিকার সবার আগে কিন্তু পুলিশ যে সমাবেশ করেছে তা নজিরবিহীন।

বরং পুলিশ তার দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করলে নারী নির্যাতনের এমন পরিস্থিতিই তো তৈরি হতো না বলে মনে করেন তিনি।

ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড দাবি করে বিক্ষোভ

ছবির উৎস, NURPHOTO

ছবির ক্যাপশান, ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড দাবি করে বিক্ষোভ

আরেকজন মানবাধিকার সংগঠন নুর খান লিটন বলছেন, পুলিশের বরং আগে উচিৎ ভিকটিম যাতে নির্ভয়ে অভিযোগ করতে তাদের কাছে যেতে পারে সেটি নিশ্চিত করা এবং অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই সেগুলোর প্রমাণ সংগ্রহ করে অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করানোর দক্ষতা অর্জন করা।

তবে পুলিশ কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আবিদ হোসেন বলছেন, সব দায়িত্ব পুলিশের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা আছে কিন্তু তারা মনে করে পুলিশ তার কাজ ঠিক মতোই করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সবার দায়িত্ব নিতে হবে। অপরাধ হলে পুলিশ তা নিয়ে কাজ করবে। আবার প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও পুলিশ নিচ্ছে।

"গত জানুয়ারি থেকে ঢাকায় যত ঘটনা ঘটেছে তার কোনোটিই অনুদঘাটিত নেই। কিন্তু তদন্ত করে দিলাম কিন্তু বিচার হচ্ছে কি-না সেটিও দেখতে হবে। দশ বছর আগের মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি এমন উদাহরণ কিন্তু অনেক," বলছিলেন তিনি।

নুর খান লিটন ও নীনা গোস্বামী মনে করেন, অন্যদের মধ্যে সচেতনতার চেয়ে বরং পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করলে পুলিশ সত্যিকারভাবেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে - জনমনে এ বিশ্বাস তৈরি করাটাই পুলিশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।