দোহার আফগান শান্তি বৈঠকে যেভাবে ছায়া ফেলছে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ

ছবির উৎস, Dr Abdullah Abdullah/Twitter
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
কাতারের রাজধানী দোহাতে চলমান আফগান শান্তি আলোচনায় ভারতের ভূমিকা ঠিক কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করতে দিল্লি এসেছেন আফগান নেতা ও সে দেশের পিস কাউন্সিলের প্রধান ড: আবদুল্লাহ্ আবদুল্লাহ্।
ভারতের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এই নেতা পাঁচদিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল-সহ অনেকের সঙ্গেই দেখা করবেন।
পাকিস্তানি বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, ড: আবদু্ল্লাহ যদি শান্তি আলোচনায় ভারতের আরও সক্রিয় ভূমিকা আশা করেন - ইসলামাবাদের কাছে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না।
তবে ভারতেও পর্যবেক্ষকরা কেউ কেউ ধারণা করছেন, শান্তি আলোচনার স্বার্থে আফগান ইস্যুতে তিনি দিল্লিকে আপাতত 'লো-প্রোফাইল' বজায় রাখারই অনুরোধ জানাবেন।
প্রসঙ্গত, দোহায় গত ১২ই সেপ্টেম্বর তালেবানের সঙ্গে আফগানিস্তান সরকারের শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছিল বিরাট উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে, কিন্তু মাত্র তিন-চারদিনের মাথাতেই তা কার্যত: থমকে যায়।

ছবির উৎস, US Dept of State/Handout
এরপর গত তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ওই দুপক্ষের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময় প্রায় বন্ধ - আর সেই জট খুলতে ইসলামাবাদ আর দিল্লিতে ছোটাছুটি করছেন ড: আবদুল্লাহ্।
গত সপ্তাহেই তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আর সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে আলোচনা সেরে এসেছেন, আর মঙ্গলবার বিকেলে নেমেছেন দিল্লি বিমানবন্দরে।
কাবুল থেকে রওনা হওয়ার সময় এয়ারপোর্টের টারম্যাকেই তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "আফগানিস্তানের শান্তি প্রক্রিয়ায় ও সে দেশে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারতের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ - কারণ তারা ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার।"
দোহার শান্তি আলোচনার উদ্বোধনী পর্বেও অনেকটা একই রকম বার্তা দিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর।
সেদিন তিনি বলেন, "ভারত ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক হাজার বছরেরও পুরনো - এবং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।"
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
"আজকের আফগানিস্তানেও ভারত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী, সে দেশের পার্লামেন্টে ভবন থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রদেশে স্কুল-হাসপাতাল বানাতেও আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি।"
"আমরা মনে করি, সে দেশে যে কোনও শান্তি আলোচনা পুরোপুরি আফগান নেতৃত্বেই হতে হবে, শুধু আফগানরাই সেটা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করবে।"
মি. জয়শঙ্করের ইঙ্গিত ছিল খুব পরিষ্কার - দোহার আলোচনায় তারা পাকিস্তানের কোনও ভূমিকা মানতে রাজি নন, তালেবানের ওপর যে দেশটির প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হয়।
বস্তুত, আফগান সরকার ভারত-ঘেঁষা আর তালেবান পাকিস্তানপন্থী, সেটাও দোহার সাফল্যের পথে একটা বড় বাধা বলে অনেক পর্যবেক্ষকই মনে করেন।
পাকিস্তানের সিনিয়র সাংবাদিক হারুন রশিদ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, এই পটভূমিতে ড: আবদুল্লাহ যদি ভারতের কাছ থেকে অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা আশা করেন, তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

ছবির উৎস, US Dept of State/Handout
তার কথায়, "ড: আবদুল্লাহ যদি দিল্লিকে এই ধরনের কোনও অনুরোধ করেন পাকিস্তান কিন্তু তা ভালভাবে নেবে না।"
"প্রথম দিন থেকে তারা বলে আসছে আফগানিস্তানে ভারতের কোনও ধরনের হস্তক্ষেপ কাম্য নয় - কারণ সেটা পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।"
"পাশাপাশি, পাকিস্তান খুব সম্ভবত আমেরিকার কাছ থেকে এই আশ্বাসও পেয়েছে যে ভারতকে দোহার আলোচনা থেকে দূরে রাখা হবে - যে কারণে প্রবল উৎসাহ নিয়ে তারা এই আলোচনা সফল করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।"
এখন দোহাতে ভারতের বেশি দৃশ্যমান বা সক্রিয় ভূমিকা আলোচনা আরও বিগড়ে দিতে পারে - এই বাস্তবতা সম্পর্কে ড: আবদুল্লাহ্ও কিন্তু অবহিত, বলছিলেন দিল্লির কূটনৈতিক ভাষ্যকার জ্যোতি মালহোত্রা।
মিস মালহোত্রার কথায়, "এতদিন আফগানিস্তানে ভারতের যেমন সরব উপস্থিতি ছিল, সেটাকে আপাতত একটু খর্ব করতে বা লো-প্রোফাইল রেখে চলতেই ড: আবদুল্লাহ্ এবার ভারতকে অনুরোধ করবেন বলে আমার ধারণা।"

ছবির উৎস, US Dept of State/Handout
"কারণ তা না-হলে দোহার আলোচনাই হয়তো পুরোপুরি ভেস্তে যাবে।"
"এখন সেটা করার ক্ষেত্রে ভারতের একটাই অসুবিধা বা আপত্তি - কারণ তাতে অবধারিতভাবে আফগানিস্তানে সবচেয়ে প্রভাবশালী প্লেয়ার হয়ে উঠবে পাকিস্তান।"
ফলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের সত্তর বছরেরও বেশি পুরনো বিরোধ এখন আফগান শান্তি-আলোচনাতেও ছায়া ফেলছে।
এখন সে দেশে যুদ্ধবিরতি বা শান্তির স্বার্থে দিল্লি ও ইসলামাবাদ শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান নরম করতে রাজি হয় কি না, তার ওপর দোহা আলোচনার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।








